চট্টগ্রাম বন্দর: বিরোধী অবস্থানে আইসিডি মালিক-স্টেকহোল্ডার

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে বেসরকারি আইসিডির (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) চার্জ বাড়ানো নিয়ে আইসিডি মালিক ও স্টেকহোল্ডাররা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে।

দু’পক্ষের মধ্যস্থতা বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান ১০ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির মৌখিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কিন্তু তা মানতে নারাজ স্টেকহোল্ডাররা। তারা বলছেন, এতে করে আমদানি-রফতানি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে।

যা এ মুহূর্তে দেয়া ব্যবহারকারীদের পক্ষে সম্ভব নয়। ট্যারিফ কমিটি রিপোর্ট দেয়ার আগে চার্জ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তারা (ব্যবহারকারীরা) ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এদিকে বন্দর চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত মেনে ১ অক্টোবর থেকে বর্ধিত হারে চার্জ আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট ১৯ আইসিডির মালিক। স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, ইকুইপমেন্ট সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি আইসিডিগুলো প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না।

এরপরও তারা কিছুদিন পর পরই নানা অজুহাতে চার্জ বাড়িয়ে চলেছে। ট্যারিফ কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া চার্জ বাড়ানো যাবে না বলে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা মানছেন না আইসিডি মালিকরা। এ মুহূর্তে চার্জ বাড়লে আমদানি-রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন স্টেকহোল্ডাররা।

অপরদিকে আইসিডি মালিকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে তাদের অপারেশনাল ব্যয় অনেক বেড়েছে। এখাতে তাদের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। এ অবস্থায় টিকে থাকতে হলে চার্জ বৃদ্ধি ছাড়া কোনো উপায় নেই।

চট্টগ্রাম বন্দরের আশপাশে ১৯টি বেসরকারি আইসিডি রয়েছে। বন্দরের ওপর চাপ কমাতে বেসরকারি পর্যায়ে এসব আইসিডি প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। বন্দর ইয়ার্ডের মতোই এসব প্রতিষ্ঠানে কনটেইনার স্টাফিং-আনস্টাফিং করা হয়। এছাড়া কনটেইনার জাহাজীকরণ এবং ডেলিভারিও আইসিডি কর্তৃপক্ষ করে থাকে।

বিকডার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়, তার ৯০ শতাংশ এবং আমদানি পণ্যের ২১ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় এ ১৯টি আইসিডির মাধ্যমে।

আইসিডিগুলো প্রতি বছর ৩ লাখ টিইইউএস আমদানি কনটেইনার, ৬ লাখ টিইইউএস রফতানি কনটেইনার এবং ৮ লাখ খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। প্রতি বছর স্টেকহোল্ডাররা এ বাবদ আইসিডিগুলোকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা চার্জ দিচ্ছে। ১০ শতাংশ হারে বাড়লে বছরে তাদের ৮৫ কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১ আগস্ট থেকে ২৫ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছিল আইসিডি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)। এর আগেও তারা কয়েক দফায় চার্জ বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু প্রতিবারই বন্দর ব্যবহারকারীদের বিরোধিতার মুখে ব্যর্থ হয়। ১ আগস্ট থেকে বর্ধিত চার্জ কার্যকরের চেষ্টা করা হলে বন্দর ব্যবহারকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের সচিব বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিকডা ও বন্দর ব্যবহারকারীদের নিয়ে বৈঠক করেন।

ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ট্যারিফ কমিটি কর্তৃক প্রতিবেদন দাখিল না করা পর্যন্ত বিকডার মাশুল প্রস্তাবনা কার্যকর হবে না। ট্যারিফ কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। মন্ত্রণালয় থেকে এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি।

এরই মধ্যে হঠাৎ ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে কার্যকর শুরু করেন আইসিডি মালিকরা। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আবারও তাদের বিরোধ দেখা দিলে নিরসনে এগিয়ে আসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

রোববার বিকডা ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ। আলোচনা শেষে বন্দর চেয়ারম্যান ১ অক্টোবর থেকে বেসরকারি আইসিডি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে ১০ শতাংশ চার্জ বাড়ানোর মৌখিক সিদ্ধান্ত দেন।

ওই বৈঠকেই বন্দর ব্যবহারকারীরা এর বিরোধিতা করেন। তারা এমন সিদ্ধান্ত মানা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। এ অবস্থায় আইসিডি মালিক ও বন্দর ব্যবহারকারী তথা স্টেকহোল্ডাররা আবারও পরস্পরবিরোধী অবস্থানে চলে গেছেন।

আইসিডির প্রধান ব্যবহারকারী তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা। তারা রোববারের বৈঠকে বন্দর চেয়ারম্যানের ১০ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিচেনার দাবি জানিয়েছেন।

বিজিএমইএ চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সহ-সভাপতি এএম চৌধুরী সেলিম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, বন্দর চেয়ারম্যান আইসিডির ১০ শতাংশ চার্জ বাড়ানোর কথা বলেছেন। আমরা তাকে বলেছি এ মুহূর্তে কোনো ধরনের বাড়তি চার্জ দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

গার্মেন্ট সেক্টরে শ্রমিকদের নতুন পেস্কেল হয়েছে। আমাদের অর্ডার কমে গেছে। প্রাইসও আগের চেয়ে কম পাচ্ছি। এছাড়া নানা কারণে আগে থেকেই ব্যবসা ব্যয় বেড়ে গেছে। সব কিছু মিলিয়ে আমাদের বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ১০ শতাংশ চার্জ বাড়ানো হলে ব্যবসা ব্যয় আরও বাড়বে। বর্ধিত চার্জ দেয়ার সক্ষমতা আমাদের নেই। তাই আমরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছি।’

বিকডা সচিব রুহুল আমিন সিকদার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা বন্দর চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। যদিও স্টেকহোল্ডারদের এ বিষয়ে আপত্তি আছে বলে মনে হচ্ছে। আমরা বন্দর বা মন্ত্রণালয়ের লিখিত চিঠির জন্য অপেক্ষা করছি। চিঠি পেলে ১ অক্টোবর থেকে ১০ শতাংশ বর্ধিত চার্জ কার্যকর করা হবে।’

ট্যারিফ কমিটির সিদ্ধান্ত আসার আগেই কেন চার্জ বাড়ানো হল- এমন প্রশ্নের উত্তরে বিকডা সচিব বলেন, ‘এ নিয়ে মন্ত্রণালয় একটি এবং বন্দর দুটি ট্যারিফ কমিটি করেছে। কিন্তু কোনো কমিটিই এখনও পর্যন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি। এদিকে দিন দিন অপারেশনাল ব্যয় বাড়ছে। লোকসান দিয়ে তো আর ব্যবসা করা সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি আইসিডির অপারেশনাল ব্যয় সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা নেই ট্যারিফ কমিটির। তাই ট্যারিফ নির্ধারণের জন্য কনসালটেন্সি ফার্মকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। বন্দরের বড় বড় প্রকল্পে কনসালটেন্সি ফার্ম নিয়োগ করা হয়। এখানে সেই উদ্যোগ নিতে বাধা কোথায়।’