ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি নিষিদ্ধ হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ, নিবন্ধন ফি কমানো ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে নতুন আমদানি নীতির খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। তিন বছর মেয়াদি (২০১৮-২১) এ প্রস্তাবিত আমদানি নীতিতে নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় বহুল আলোচিত ক্যাসিনো সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। দেশের নিরাপত্তাজনিত কারণে ড্রোন আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীসহ সংশ্নিষ্ট অংশীজনের মতামত নিয়ে বর্াণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রণীত এ আমদানি নীতির (আইপি) খসড়া শিগগিরই অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে পাস হওয়ার পর এটিকে গেজেট আকারে প্রকাশ করে তা কার্যকর করা হবে। তিন বছর পর পর বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ বাণিজ্য নীতি হয়েছে ২০১৫ সালে। শীর্ষ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাণিজ্য নীতি হতে হবে আধুনিক ও যুগোপযোগী। তা ছাড়া বাণিজ্য এবং রফতানি উভয় নীতিই হতে হবে অভিন্ন। কিন্তু বাংলাদেশে এ দুটি নীতিই সবসময় পৃথক ও গতানুগতিকভাবে করা হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে পদ্ধতিগত জটিলতা দেখা দেয়।

সম্প্রতি দেশজুড়ে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের আলোচনায়ও উঠে এসেছে। সাংবিধানিকভাবে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ হলেও বর্তমান আমদানি নীতিতে এ বিষয়ের পরিস্কার উল্লেখ না থাকায় বৈধ পথেই ক্যাসিনোসামগ্রী আনা হচ্ছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষও এসব পণ্য খালাস করছে। কেউ কেউ মিথ্যা ঘোষণা দিয়েও আমদানি করছে। সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানের মৌখিক নির্দেশে এসবের খালাস বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এক চিঠি দিয়ে আমদানিনিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় ক্যাসিনো সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীনকে অনুরোধ করেন। এনবিআরের এ প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিদ্যমান আমদানি নীতিতে নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় ১২টি পণ্য রয়েছে। এ নীতির খসড়ায় এই তালিকায় ক্যাসিনো সরঞ্জাম ও ড্রোন যুক্ত করার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্নিষ্টদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।

সম্প্রতি দেশে অনেক ড্রোন অবৈধ উপায়ে দেশে আসছে। ব্যাগেজ পার্টি বিমানে করে এসব পণ্য চীন ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ে আসছে। অভিযোগ, এর সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাসহ একটি সিন্ডিকেট চক্রও জড়িত। কাস্টমসের গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কিছু ড্রোন সাত থেকে আট কেজি ওজনের বিস্ম্ফোরক বহন করার ক্ষমতা রাখে। আবার কিছু ড্রোন আছে যেগুলো স্পর্শকাতর গোপন ছবি তুলতে পারদর্শী। এসব কারণে ড্রোন দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক, ঢাকা পশ্চিম ভ্যাটের বর্তমান কমিশনার ড. মঈনুল খান বলেন, ড্রোনের অপব্যবহারের কারণে এনবিআর থেকে এটি আনা বন্ধের প্রস্তাব করা হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। ফলে খসড়া নীতিতে এটি আমদানি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।

খসড়া বাণিজ্য নীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ আরও উন্নত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে আমদানি-রফতানি ও শিল্পের নিবন্ধন ফি বর্তমানের চেয়ে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম জানান, তারা চান ব্যবসা সহজ করতে, ব্যবসার প্রারম্ভিক ধাপ ও খরচ কমাতে। নতুন বাণিজ্য নীতিতে এর প্রতিফলন থাকতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে নিত্যনতুন পরিবর্তন আসছে। প্রস্তাবিত বাণিজ্য নীতিতে এর প্রতিফলন ঘটতে হবে। তিনি মনে করেন, আমদানি-রফতানি, বাণিজ্য ও আয়করসহ যেসব নীতি আছে, সেগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে নীতি প্রণয়নের আগে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে তা সংঘর্ষিক না হয়। সাবেক এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশে দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। সুতরাং আমদানি নীতিতে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির উপদেষ্টা মঞ্জুর আহমেদ বলেন, বাণিজ্য নীতিকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হলে ১৯৫০ সালের আইন পরিবর্তন করতে হবে। তিনি মনে করেন, আমদানি-রফতানি দুটো পলিসি অভিন্ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি আরও বাড়বে। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ অনেক দেশে অভিন্ন নীতি চালু রয়েছে এবং তারা এর সুফল পেয়েছে বলেও জানান তিনি।

বর্তমানে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা সমমূল্যের পণ্যের স্যাম্পল বিনা ট্যাক্সে আনা যায়। এই সীমা বাড়িয়ে নতুন নীতিতে আট লাখ টাকার বেশি নির্ধারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে স্যাম্পল হিসেবে ১২ ক্যাটাগরির ৭০০ পণ্য আনা যায় বিনা টা্যক্সে। খসড়ায় ১৫ ক্যাটাগরির ১৫০০ পণ্য আনার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। এখন শিল্পে ব্যবহূত মেশিনারি যন্ত্রাংশ মেরামত করার জন্য প্রয়োজনে দেশের বাইরে যেতে হয়। এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নিয়ন্ত্রকের অফিস এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিড়ম্বনা কমাতে খসড়ায় অনুমোদনের ক্ষমতা এক ধাপ কমিয়ে শুধু কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করতে বলা হয়েছে।

বর্তমানে বন্ড লাইসেন্সের আওতায় আনা পোশাক খাতে ব্যবহূত কাঁচামালের প্রয়োজনীয় প্রাপ্যতার (ইউডি) সনদ শুধু বিজিএমইএর হাতে ন্যস্ত। খসড়া নীতিতে এ ক্ষমতা বিকেএমইকে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এখন ভোজ্যতেল আমদানির পর খালাস প্রক্রিয়া বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন নীতিতে এই খালাসের ব্যবস্থা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। হেলিকপ্টার বা এয়ারক্রাফট আমদানির বিষয়ে বর্তমান আমদানি নীতিতে কোনো উল্লেখ নেই। খসড়ায় এটি আমদানিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বহুল আলোচিত ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক আমদানির বিষয়ে বলা হয়, জীবন-জীবিকার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তা ছাড়া এর অনেক যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি হয়। তাই ইজিবাইক আমদানি বন্ধ করা ঠিক হবে না। তবে এই যানবাহন চলাচল বৈধ করতে বিআরটিএ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে।