পেঁয়াজ ছাড়া মাংস ও ভোট ছাড়া নির্বাচন

December 5, 2019, 2:25 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গরাজ্য ও বর্তমান রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্র আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে, অকার্যকর আন্তর্জাতিক সংস্থা ন্যাম (জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন) সম্মেলনে যোগদান শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর রুটিন মাফিক সাংবাদিক সম্মেলনে সমর্থক সাংবাদিকদের প্রশ্নে ন্যাম সম্মেলনের চেয়ে মেনন সাহেবের সাক্ষ্য, পেঁয়াজের ঝাঁজ এবং ১১ বছরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিচালতি শুদ্ধি অভিযান বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর উত্তর টিভির টকারদের কয়েকদিনের আলোচনার খোরাক জোগালেও তাতে জনগণের উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। ৩০ ডিসেম্বর জিরো আওয়ারের ভোট সম্পর্কে দুইবারের সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সাক্ষ্য দানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সাথে একজোট হয়ে বিএনপির সমর্থক বুদ্ধিজীবী মহল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, আইনবিদ, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, কবি, লেখক, গায়ক ও অভিনয়শিল্পী, ব্যবসায়ীরা সমাজসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, কৃষিবিদ, প্রকৌশলীসহ সরকারি-বেসরকারি সব পেশার ভোটার ৩০ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ১৪ দলের পক্ষে ভোট দানের কারণেই কাস্টিং ভোটে ‘৯৭ শতাংশ’ পেয়ে ১৪ দলের ২৯২ জন প্রার্থী এক লাখ থেকে চার লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। এই ফলাফল সরকার বিরোধী ঐক্যফ্রন্টের আন্দোলনের আগুনে পানি ঢেলে দেয়ায় নেতারা চুপসে গেছেন।

 

জনগণ মনে করে, এই ‘ব্যাপক’ সমর্থনের জন্য ওইসব গোষ্ঠীকে ভোটের পর এক ধরনের প্রতিদান দেয়ার পালা চলছে। পেঁয়াজ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা প্রতি টন ৮৫০ ডলার মূল্যে কোনো পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি না করেই জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে টন প্রতি ২৫০ ডলার মূল্যে আমদানি করা পেঁয়াজ, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ভারতে রফতানি মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়েছেন। ফলে প্রতি টন ৯০০ ডলার দেয়ায় পেঁয়াজের ঝাঁজ ২০১৫ ও ২০১৭ সালের রেকর্ড ওয়ান+হাফ সেঞ্চুরি ছুঁই ছুঁই করছে। ভারত পেঁয়াজের রফতানি মূল্য ৮৫০ ডলার নির্ধারণের তিন-চার দিন পরই মোদি সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করে। তখন ২০১৫ ও ২০১৭ সালে পেঁয়াজের ঝাঁজ বৃদ্ধিতে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের মজুতকৃত ভারতীয় পেঁয়াজ টন প্রতি ৯০ হাজার টাকায় এবং দেশী পেঁয়াজ টনপ্রতি এক লাখ টাকা দরে বিক্রি করে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এই তিন মাসে ছয় লাখ টন বা ৬০ কোটি কেজি পেঁয়াজে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছেন কেজিতে ন্যূনতম ৫০ টাকা হিসাবে তিন হাজার কোটি টাকা। মে-জুন-জুলাই মাসে ধানের মূল্য হ্রাস পেয়ে টনপ্রতি ১৩-১৪ হাজার টাকায় নামায় কৃষকরা ধানের লোকসান এড়াতে প্রয়োজনের তাগিদেই টনপ্রতি ২০-২২ হাজার টাকা দরে তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তা ২০১৫ ও ২০১৭ সালের ‘অভিজ্ঞ’ ব্যবসায়ীরা কিনে মজুত করেছিলেন। কারণ, দেশী পেঁয়াজ সহজে পচে না, তা ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ভালো থাকে। যে সব চাষির পেঁয়াজ ছিল না, তারা সরকারি ক্রয়মূল্যে এক হাজার ৮০ টাকা মণ দরে তাদের ধান সরকারি গুদামে সরবরাহ করতে গিয়ে ধান ক্রয়কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ ও ‘মাদার’ লীগের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের কারসাজির দরুণ এতে ব্যর্থ হন এবং ৫০০ টাকা মণ দরে তাদের কাছেই ধান বিক্রি করে ঈদুল ফিতর ও ঈদু আজহার ব্যয় বহন করেছিলেন। সিন্ডিকেট ওই ধান এক হাজার ৮০ টাকা মণ দরে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে মুনাফার একটি অংশ ক্রয় কর্মকর্তাদের দেয়ার পরও প্রচুর মুনাফা লুটে নেয়। মানুষ বলছে, ধান, চাল ও পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা নির্বাচনী সমর্থন দানের বিনিময়ে সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন।

 

ঋণখেলাপি, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুটকারীদের ঋণগুলো ২০৩০ সাল পর্যন্ত পুনঃতফসিল করার মাধ্যমে কার্যত নির্বাচনে সমর্থন দানের প্রতিদান দেয়া হয়েছে। দূরদর্শী এক ঋণখেলাপি ও শেয়ারবাজার লুটকারী খেলাপি ঋণ ২০১৫ সালেই ১৫ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করে নেয়ায় তিনি এমপি হতে পেরেছেন। ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুটের টাকা ব্যাংক থেকে কে নগদ উত্তোলন করে কাকে দিয়েছেন কিংবা ওই টাকা কোথায় পাচার হয়েছে, তার সন্ধান দুদক হদিস করতে না পারায় তাদের বাদ দিয়েই মামলার চার্জশিট দিতে হয়েছে। ফলে এক ধরনের দায়মুক্তি পেয়ে ক্ষমতার আশেপাশেই ঘুর ঘুর করতে পারছেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৪ দলের নেতাকর্মী ও সমর্থক কোটি কোটি ভোটার পেঁয়াজ ছাড়া মাছ-মাংস রান্নার এস্তেমাল করতে পারলে এর ঘাটতি পড়বে না বিধায় পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে না। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে। ফন্দিবাজরা তা পাচার করে বিদেশে বাড়ি করা ও বিদেশী ব্যাংকে টাকা জমা রাখার কাজে ব্যবহার করতে পারবে।

পদোন্নতির জন্য একটি পদও খালি না থাকা সত্ত্বেও বছরে দুইবার করে পদোন্নতি দেয়ার মাধ্যমে পদসংখ্যার চেয়ে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের সংখ্যা তিনগুণ বেশি হয়ে গেছে। অভিযোগ, তা করা হয়েছে ‘নির্বাচনে সাহায্য করা’র পারিশ্রমিক হিসেবে। গাড়ি ক্রয়ের জন্য বিনাসুদে ৩০ লাখ টাকা ঋণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকাও দেয়া হচ্ছে। একটি গাড়িতে না পোষায় স্ত্রীর জন্য সরকারি পরিবহন পুল হলে গাড়ি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বাবদ ৫০ হাজার পাওয়ার পরও কেউ কেউ সন্তুষ্ট নয় বিধায় পুত্র ও কন্যার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাধীনে অধীনস্থ কার্যালয় থেকে দুটি গাড়ি ও জ্বালানি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানা যায়।

রাজনীতিতে ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ অবস্থায় থাকা প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ৩০ ডিসেম্বর কেউ ভোট দিতে পারেনি মর্মে দলীয় সভায় সাক্ষ্য দানের ঘটনায় রাজনীতির শান্ত চায়ের কাপে সাগরের ঢেউ খেলে গেলে মেনন সাহেবের মিডিয়ার উপরে দোষ চাপিয়ে আত্মরক্ষামূলক বক্তব্য ১৪ দলের মনঃপুত না হওয়ায় ঝড়ের গতিতে ব্যাখ্যা চাওয়া হলো। মেনন সাহেব ইন্টারনেটের গতিতে এর জবাব দেয়ার মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়ায় জোট মুখপাত্র মোবাইল ফোনের গতিতে ক্ষমা মঞ্জুরের ঘোষণা ও সন্তোষ প্রকাশের ব্যাপারে জনগণের বলার থাকলেও প্রকাশ করছে না মেনন সাহেবের হাল-হকিকত দেখে।

 

৩০ ডিসেম্বর জিরো আওয়ারের নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি, বলে মেনন সাক্ষ্য দিতে গিয়েও দিতে পারলেন না। এ ক্ষেত্রে গ্রাম্য এক সালিশে সাক্ষীর বয়ানের সাথে অদ্ভুত মিল পরিলক্ষিত হচ্ছে। ‘চাচার সামনে যুবক ভাতিজা প্রতিবেশী দুর্বল এক যুবককে অন্যায়ভাবে প্রহার করেছিল, রাতে সালিশে বাদির জবানবন্দী শোনার পর মাতব্বররা চাচা কী দেখেছেন তা বলতে বলায় সহজ সরল চাচা অনেকক্ষণ ঘাড় নিচু করে চুপ থাকেন। মাতব্বররা চাপাচাপি করায় চাচা বললেন, ‘আমি বাড়িতে থাকতে পারব না’। মাতব্বররা বললেন, তোমার সাক্ষ্য হয়ে গেছে। আর কিছু বলতে হবে না। সালিশে উপস্থিত সাক্ষীর বড় ভাই ও বিবাদীর বাবা, নিজের ছেলেকে দুই থাপ্পড় মারার পর সে দৌড়ে পালাল। এভাবে বিচার ‘হয়ে গেল।’ মেনন সাহেবের অবস্থা হয়েছে সেরকম। এবার গত শতকের ৫০ এর দশকের সালিশে ক্ষমা চাওয়ার একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। ‘ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় ছেলে নিজস্ব জমানো টাকায় এক বিঘা ধানী জমি ইজারা রেখেছিল। ওই জমির কাটা ধান বাড়িতে উঠিয়ে রাখালদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বাড়ির ধানের সাথে মিশিয়ে মাড়াই করতে রাখালদের বাধ্য করেছিল। সন্ধ্যার পর উঠানে অন্ধকারের মধ্যে সালিশ বসেছে। মাতব্বররা প্রেসিডেন্টের ছেলেকে বাপের কাছে ক্ষমা চাওয়ার রায় ঘোষণা দেয়ায় ছেলে বাপের পা স্পর্শ করার সাথে সাথে বাপ ক্ষমা করে দিলেন। ছেলে উঠে বাড়ির ভেতর মায়ের কাছে চলে যাওয়ার পর মাতব্বররা প্রেসিডেন্ট সাহেবের কাছে জানতে চান, ছেলের কর্মকাণ্ডে তোমার এত ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে তাকে মাফ করে দিলে কেন? প্রেসিডেন্ট সাহেব রসিক লোক ছিলেন। তিনি বললেন, ‘ ও এমনভাবে আমার পা চেপে ধরেছিল যে, ক্ষমা করার কথা বলতে কয়েক সেকেন্ড বিলম্ব হলে আমার পা-ই ভেঙে যেত।’ শুনে হাসির রোল পড়ে গেল। ১৪ দলের দ্রুতগতিতে ক্ষমা করার ঘোষণার কারণও হয়তো অনুরূপ।

শুদ্ধি অভিযানে বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজসহ সবাই আশার আলো দেখতে পেলেও ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন আমজনতার চোখে তেমন কোনো আলো দৃশ্যমান হচ্ছে না। কারণ, ক্যাসিনো বাজিকর, টেন্ডার বাজিকর, চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও কমিশন বাজিকরদের ১১ বছরে ভোজবাজির মতো হাজার হাজার কোটি টাকা, হাজার হাজার বাড়ি ও হাজার হাজার গাড়ির মালিক বনে গেলেও এবং বিদেশে শত শত সেকেন্ড হোম তৈরি করা ও বিদেশী ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা জমা রাখার জন্য দেশ থেকে সাত লক্ষাধিক টাকা পাচার করা হলেও ইন্টারনেট ও ফেসবুকের গতির যুগেও তা নজরে আসতে তিন হাজার ৯৯৮ দিন লাগায় জনগণ হতবাক। বাজিকর দুই প্রকার- দলীয় বেসরকারি বাজিকর এবং সরকারি বাজিকর। বাজিকরদের সংখ্যা ও অবৈধভাবে উপার্জিত ধনরাশির পরিমাণ এবং গত দু’ মাসে পরিচালিত অভিযানের সংখ্যার নিরিখে আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে অভিযানের ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হবে কি-না সে ব্যাপারে সন্দিহান হওয়া স্বাভাবিক। ২০১৪ সাল থেকে যে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং ২০১৮ সালে যা পূর্ণতা পেয়েছে, তাতে আগামী ২০২৩ ও ২০২৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের জয় অবশ্যম্ভাবী বিধায় এই অভিযানও ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলতে পারে বলে জনগণ মনে করে।