ইতিহাসের চীন, চীনের করোনা, ঈশ্বরভক্তি ভুলে মৃত্যুর অস্থিরতা

March 12, 2020, 3:44 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

বিশ্বের ইতিহাসে চীন সবসময় একটি মৌলিক দেশ। খেয়াল করে দেখুন তাদের সবকিছু আলাদা। তাদের চালচলন, খ্যাদ্যভাস, পড়াশুনা, অক্ষর কোনো কিছুর সাথে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কোনো মিল নেই। চীনারা নিজেদের এতটাই আলাদা জাতি ভাবত যে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য বিশাল প্রাচীর গড়ে তোলে যা গ্রেটওয়াল নামে খ্যাত।

দীর্ঘদিন ধরে চৈনিক সভ্যতার মানুষ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। বিচ্ছিন্ন ছিলো বললে ভুল হবে তারা নিজেদের এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করতো যে, নিজেদের আলাদা করে রাখে। বিশ্বের বেশিরভাগ লিখন পদ্ধতির বর্ণমালা নির্দিষ্ট কিন্তু চীনাদের সব প্রতীক এবং সেগুলো হাজারেরও বেশি। বৈশ্বিক অর্থনীতির চালকের আসন নিতে গত তিন দশকে চীন সবকিছুর যোগানদাতায় পরিণত হলো। যার যেমন প্রয়োজন। মানুষ মজা করে বলে, ভালোবাসা মনে হয় চীনাদের তৈরী তার গ্যারান্টিও নেই ওয়ারেন্টিও নেই।

সেই চীন থেকে বৈশ্বিক ভয়ংকর রোগ করোনার উৎপত্তি। এই জাতি উৎপাদনের এমন কৌশল রপ্ত করে যে সবকিছু দ্রুত নকল করতে পারে। তেমনি করেনাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। নকল পণ্যের যেমন স্থায়ীত্ব কম তেমনি করোনা ভাইরাসের জীবৎকাল খুব অল্প। এখন পর্যন্ত এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি নয়।

ইতিহাসের অসুখ, ধর্মের বাঁধা ডিঙিয়ে মানুষের রোগ জয়
৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোমের রাজা কনস্টান্টিপল দেখলো, বিশ্বজুড়ে যে অরাজকতা চলছে এর থেকে মানবজাতিকে বাঁচাতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন একজন মহানপুরুষ নির্দেশিত ধর্ম। যে ধর্ম মানুষকে ইশ্বরের পথে, কল্যাণের পথে, মহানুভবতার পথে আহ্বান করবে। খ্রিস্টান ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মেও স্বীকৃতি দিলো রাজা। কনস্টানটানিপলকে করলো তার রাজধানী। তুরস্কের বর্তমান রাজধানী কনস্টান্টিপোল। যেখান থেকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করলো যিশুর ধর্ম।

৫০০ অব্দে বেদুঈন মরুভুমির অঞ্চল আরবে আরেক মহাপুরুষের আগমণ ঘটে যার নাম মুহাম্মদ। বিশৃঙ্খল আরবকে তিনি শৃঙ্খলায় ফেরাতে চাইলেন। তখন আরব জুড়ে মুসার বংশধর ইহুদিরা শক্তিশালী। যিশুর অনুসারী খ্রিস্টানরাও ফেলনা নয়। মরুভূমি অঞ্চলে প্রচণ্ড গরম। দীর্ঘপথ তারা উটে চড়ে পাড়ি হয়। বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের পর গড়ে উঠে সরাইখানা। মানুষে মানুষে যোগাযোগের, আড্ডার জন্য সরাইখানা হয়ে ওঠে একমাত্র কেন্দ্রস্থল। আড্ডা মানেই গল্প। এইসব সরাইখানার মানুষের মুখে মুখে তাদের পূর্ব পুরুষদের বিভিন্ন ধরণের গল্প খুব জনপ্রিয়তা পায়। সেখানে আদ, সামুদ, ইহুদি, নাসারা, সোলায়মান, বিলকিস আরো কত গল্পের পসরা। ছোটবেলা থেকে বিশ্বাসী হিসেবে কুরাইশ জাতির মধ্যে পরিচিতি পান মুহাম্মদ। কিন্তু নেতৃত্ব দাবি করলেই বাঁধে বিরোধ। সমস্যা সমাধানে কোন উপায়ন্তর না দেখে গুহায় গিয়ে ধ্যানে বসেন। ধ্যান থেকে বের হন এক মহাশক্তিধর ঈশ্বরের বানী নিয়ে। মুহাম্মদ প্রথম ইশ্বরের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছেন এমন নয়। ইহুদিরা দাবি করলো, আমাদের নবী মুসাতো আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলতেন । তবে তোমাকে কেনো মানবো? মুহাম্মদ অনুসারীদের সাথে তাই সবচেয়ে বেশি বিরোধ ইহুদিদের। কুরআনেও যে জাতির সমালোচনা সেটি ইহুদি। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদের জয় হয়েছিলো। ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। সবচেয়ে আধুনিকতম ধর্ম হওয়ায় কুরআনের বাখ্যাগুলো এমন সেটির নানা ধরনের ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে। আবার কুরআন তার শুরুতেই বলে দেয়, এটি এমন এক গ্রন্থ যেখানে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। মূর্খরা কুরআন থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে সেটি বলা যায় না। আচারনিষ্ট মূর্খরা ইসলামের এই ঐশীবানী থেকে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে দৃশ্যমান ধার্মিকতায় ব্যস্ত।

রোগের ইতিহাস বলতে গিয়ে ধর্মের ইতিহাস পাঠে অনেকে ধান ভাঙ্গতে শিবের গীত গাইছি মনে করতে পারেন। ধর্মের এই প্রতিযোগতায় পুরো মধ্যযুগ জুড়ে পাদ্রী আর মোল্লাতন্ত্রের দোর্দণ্ড প্রতাপ। একটি স্থবির, জড়, সৃষ্টিহীন সময় চলে ১৪’শ শতক পর্যন্ত। তারপর রেনেসার যুগ। এই প্রথম ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলো মানুষ। বললো, তোমার সৃষ্টি পূর্ণাঙ্গ নয়। তোমার সৃষ্ট মানুষের মুখ সুন্দর তো, নাক বোচা, নাক সুন্দর তো কান ছোট, কান সুন্দর তো চোখ বেঢপ। শিল্পী মাইকেল এঞ্জেলো তৈরী করলেন এক ভাস্কর্য। নাম দিলেন অ্যাডম। তারপর একের পর চ্যালেঞ্জ কোপারনিকাস, জিওর্দানো ব্রুনো, গ্যালিলিও’র। সাহসী মানুষেরা নিজেদের সৃষ্টির উন্মাদনায় মোল্লাতন্ত্রের কাছে বীরত্বের সাথে আত্মহুতি দিলো। ইতিহাস দুঃসাহসীদের পক্ষেই রায় দেয়। গ্যালিলিও’র যারা বিচার করেছিলো, যে পাদ্রী তার শাস্তি দিয়েছিলো তার নাম কেউ মনে রাখেনি। উল্টো তার অনুসারি পাদ্রি সাম্প্রতিককালে স্বীকার করে ভুল বিচারে গ্যালিলিও’র শাস্তি হয়েছিলো।

মধ্যযুগের ধর্মতান্ত্রিকতার সময়ে বিশ্বজুড়ে এক রোগ ছড়িয়ে পড়েছিলো। তার নাম প্লেগ। এই রোগ এতটাই ভয়ঙ্কর ছিলো মাত্র ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যেতো। মৃত্যুকালে অন্য ব্যক্তির শরীরে রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়তো। প্রায় ৪০০ বছর এই রোগ দোর্দণ্ড প্রতাপে মানুষকে অসহায় করে দেয়। রেঁনেসা যুগে এসে মানুষ কালো মৃত্যুও এই রোগের প্রতিষেধক আবিস্কার করে। মানুষ যখন প্রশ্ন করা শিখলো তখন প্লেগের প্রতিষেধকও আবিস্কার করলো। আমাদের উপমহাদেশেও জাহাজে চড়ে ১৮’শ শতকে প্লেগ এসেছিলো। পরবর্তীতে প্লেগের মতো আরো অনেক মরণব্যাধি হানা দেয়। ইংরেজ আমলে কলেরায় মানুষ মারা গিয়ে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেতো। তখনও এটিকে ইশ্বরের অভিশাপ বলা হতো। কলেরাও মানুষ জয় করে। তাই করোনাও নতুন নয়, নতুন নয় রোগে ভুগে মৃত্যুর ইতিহাসও। আর মৃত্যু তো প্রতিদিনের মতো একমাত্র সত্য ও নিয়তি নির্দিষ্ট।

চীনের করোনা, মার্কো পোলোর ফিরে আসা, অসহায় ইতালি
শুরুতেই বলেছিলাম। সবসময় বিচ্ছিন্ন থাকতে পছন্দ করেছে চৈনিকরা। বিশ্বায়নের এই যুগেও বিভিন্ন দেশে তাই গড়ে উঠে চায়না টাউন। চীনের গ্রেট ওয়াল টপকে ১৩ শতকে চীনে গিয়ে হাজির হয়েছিলো ইতালিয় পর্যটক মার্কো পোলো। দীর্ঘদিন পোলো চীনে মঙ্গোলীয় রাজ দরবারের অতিথি ছিলো। চিনে ১৭ বছর থেকে ভারতবর্ষ ঘুরে আবারো নিজ দেশ ইতালিতে ফিরে যায় পোলো। চীনারা এতটাই বৈচিত্রময় যে তাদের খাবারের প্রকারভেদের শেষ নেই। তাদের খাবার তালিকায় এমন বস্তু আছে যার খোঁজও পায় না বাকি বিশ্ব। মার্কো পোলো চীন থেকে ইতালি ফিরে গিয়েছিলো। চীন সবকিছু নিয়ে নুডুলস তৈরী করে। ইতালির জনপ্রিয় খাবারের অন্যতম পাস্তা ও নুডুলস। ইতিহাসের কি নির্মম পুনরাবৃত্তি। করোনা ভাইরাস চীনের পরে সবচেয়ে বেশি যে দেশে ছড়াচ্ছে সেটিও ইতালি। ভারত ও বাংলাদেশে যাদের করোনা সনাক্ত হয়েছে তাদেরও উৎস ইতালি।

ঈশ্বর ছেড়ে করোনায় সিজদা, দু:সাহসী মুমিনের খোঁজে
ব্যাপারটি এমন নয় যে এই প্রথম করোনা ভাইরাসে ভর করে আজরাইল হাজির হয়েছে। নানা রূপে নানা কায়দায় মৃত্যুর দূত আমাদের দুয়ারে হানা দেয়, কখনো সার্স, কখনো ডেঙ্গু, কখনো চিকনগুনিয়া কখনো সড়ক দূর্ঘটনা অথবা কোন কিছু ছাড়ায় হঠাৎ করে মৃত্যু। করোনা আসার পর মানুষের বেশিরভাগ মানুষের অস্থিরতায় মনে হচ্ছে এই প্রথম করোনা অচেনা অজানা মৃত্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। মানুষ ঈশ্বরও ভুলে যাচ্ছে। সে দিনে যতবার ইশ্বরের নাম নিচ্ছে তার চেয়ে বেশি করোনার নাম নিচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো সৌদি আরবে কাবা শরীফ তওয়াফ করতে মানুষের আগ্রহ নেই ভাটার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জাগতিক জীবনের উন্নতির জন্য আচারনিষ্ট ধার্মিকরা ধর্ম পালনে জোর জবরদস্তি করে। অথচ করোনায় ঈশ্বরের উপর ভরসা ছেড়ে করোনা করোনা করছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছে, এবার হজ্জ্ব করতে সবচেয়ে কম রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। কেউ হজ্জ্ব করতে যেতে না চাইলে তার টাকা ফেরতেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবখানে এক আলোচনা করোনা করোনা। মানুষ ঈশ্বরের নাম ভুলে করোনার তসবিহ যপছে। কি অদ্ভুত।
সাম্যবাদী করোনা ও মানুষের আরেকটি জয়ের অপেক্ষা

এটি অস্বীকার করার কোন জো নেই করোনা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানার সম্ভাবনা আছে। ভোগের প্রতিযোগিতায় থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এটি সত্যিই এক চ্যালেঞ্জ। নিজেদের বিলাসীতার সীমার লাগাম না টেনে টাকা উৎপাদনকে ঈশ্বর জ্ঞান করেছিলো মানুষ। কোন মহৎ উদ্দেশ্য নেই, কোন কল্যানকর শুভবোধ নেই, মানবকল্যানে কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেই, শুধু বিলাসিতার জন্য টাকার পেছনে ছোটা মানুষকে যেনো করোনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। টাকা তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এবার নগদে টাকা ভক্ষণ করেও বাঁচার উপায় নেই।। বাংলাদেশে প্রাইভেট হাসপাতালগুলো জ্বর, হাচি, সর্দির রোগী ভর্তি নিচ্ছে না। এবার টাকাওয়ালাদেরও সবার সাথে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে।

করোনাকিছুদিন পূর্বে বাংলাদেশে ডেঙ্গু দারুণ ভীতি ছড়িয়েছিলো। ডেঙ্গু ধনী-নির্ধন কাউকে ছাড়েনি। করোনারও সাম্যবাদী তেমন এক রূপ দেখা যাচ্ছে। সাম্যের পৃথিবীকে যখন মানুষ লোভের আগুনে অসাম্য এক বিশ্বে পরিণত করলো তখন সাম্য প্রতিষ্ঠায় করোনা যেন সাম্যবাদী ঈশ্বর হয়ে আবির্ভূত হলো লোভের লকলকে জিহ্বায় বেড়ি পরাতে?

পাদটীকা: দু:সাহসী মানুষেরা প্লেগ জয় করেছে। জয় করবে করোনাও। জয় হোক মানুষের।