পথে ওত পেতে থাকা হিংস্রতা

April 1, 2018, 1:28 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

রিকশা কিছুদূর যাওয়ার পর দেখি, একটি মোটরসাইকেল দ্রুত আমার পাশ দিয়ে গেল। মোটরসাইকেলে সেই ছেলেটি বসা। যাওয়ার সময় ছেলেটি আমার হাঁটুতে স্পর্শ করে যায়। পর মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারি, ওই ছেলেটি আমার হাঁটুতে ব্লেড দিয়ে পোঁচ দিয়ে গেছে।’ কয়েক দিন আগে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার কথা  জানিয়েছেন এক নারী।বাসে করে বাসায় ফিরছিলেন আরেক নারী। হঠাৎ খেয়াল করেন, পেছনের আসনের এক লোক বারবার তাঁর কাছাকাছি আসছেন। তিনি বিরক্তি নিয়ে কিছুটা সরে যান। বাসে নিয়মিত যাতায়াত করার কারণে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার প্রায়ই হতে হয়। তবে সেদিনের ঘটনায় তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েন। বাস থেকে নামার পর তিনি টের পান, ব্লেড দিয়ে তাঁর সালোয়ার–কামিজ কেটে দেওয়া হয়েছে। ওই অবস্থায় কোনো রকমে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন।

এর আগে এক সাংবাদিক অফিস থেকে রাতে বাসায় ফেরার সময় পথে নিগ্রহের শিকার হন। এক যুবক যখন তাঁকে হয়রানি করছিলেন, তখন আশপাশে অনেক লোক দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি। প্রতিবাদও করেননি। একপর্যায়ে অপমানে তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকেন।

এই তিনজনই তাঁদের এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। তাঁরা বলেছেন, চলার পথে এমন নিপীড়ন, নিগ্রহ থেকে অন্য নারীদের সতর্ক করতেই তাঁরা জনসমক্ষে তা তুলে ধরেছেন। পোস্টগুলোও ‘পাবলিক’ রেখেছেন যাতে সবাই তা জানতে পারে। ‘কমেন্ট ও শেয়ার’ অপশনও খোলা রেখেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নারীকে আক্রমণের ধরনগুলো হিংস্র হয়ে উঠেছে। ব্লেড দিয়ে পোশাক কেটে দেওয়া ও শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করা, গায়ে জ্বলন্ত সিগারেট ফেলা, পানি ঢেলে দেওয়া, হাঁটার সময় শরীর স্পর্শ করার ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে হিংস্র ও বিকৃত আনন্দ প্রকাশের ঘটনা ঘটছে। আর ফেসবুকে এসব অভিজ্ঞতা জানানোর ফলও যে ইতিবাচক হচ্ছে তা নয়। অনেক নারী এরপর সাইবার বুলিংয়ের (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে হেনস্তা করা, আপত্তিকর ছবি ও পোস্ট কোনো নারীর পেজে পোস্ট করা) শিকার হচ্ছেন। গত ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের দিনটিকে উদ্‌যাপন করতে রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বড় সমাবেশের আয়োজন করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ওই সমাবেশে যোগ দেওয়া তরুণদের হাতে জায়গায় জায়গায় ছাত্রীসহ কয়েক তরুণীকে নিগ্রহের ঘটনার কথা উঠে আসে ফেসবুকে। নিপীড়নের কথা জানিয়ে এরপর সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন তাঁরা। যে কয়জন ওই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকেই ফেসবুক থেকে পোস্ট সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।

নারীর ওপর আক্রমণের ধরন হিংস্র হয়ে উঠছে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন  বলেন, জনপরিসরে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এর সংখ্যাগত ও মাত্রাগত পরিবর্তন হয়েছে। নারীকে আক্রমণের ধরন হিংস্র হয়ে উঠেছে। ব্লেড দিয়ে পোশাক কেটে দেওয়া বা গায়ে জ্বলন্ত সিগারেট ফেলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পাচ্ছে।

ড. গীতি আরা নাসরীন বলেন, জনপরিসরে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আগে সাধারণ ধারণা ছিল যে শুধু বিশেষ প্রকৃতির, বিকৃতির বা বিশেষ মতাদর্শের মানুষই নারীকে নির্যাতন করে। নারীকে নির্যাতন করা যদি সহজ হয়, তবে নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রকাশ বা বিকৃত আনন্দ লাভের সুযোগ অনেকেই নিতে পারে। এটা বন্ধ না করলে এই নির্যাতনের সংস্কৃতি গেড়ে বসবে। নারী নির্যাতন করে পার পাওয়া বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যাঁরা আছেন, এটি তাঁদের অবশ্যকর্তব্য। অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করা, দ্রুত বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নারী নির্যাতনকারীকে চিহ্নিত করে ঘৃণার পাত্র করে তুলতে হবে। নির্যাতনের শিকার নারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে যৌন নিপীড়কের আচরণকে বৈধতা দেওয়া নিপীড়ক মনোবৃত্তিরই নামান্তর।