কালিন্দী রানীকে আশাই বাঁচিয়ে রেখেছে

April 2, 2018, 2:43 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

 স্বজনদের কোনো সান্ত্বনা এখন আর বিশ্বাস করেন না কালিন্দী রানী চাকমা। দুই সপ্তাহ ধরে খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। অসুস্থ হয়ে পড়া এই নারীর দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে কেঁদে। মেয়ে ফিরে আসবে, এই আশাই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। গত ১৮ মার্চ থেকে তাঁর মেয়ে দয়াসোনা চাকমার খোঁজ নেই। সেদিন সকালে রঙামাটি সদর উপজেলা কুতুকছড়ি ইউনিয়নের একটি বাড়ি থেকে অস্ত্রের মুখে দয়াসোনাসহ আরও এক পাহাড়ি তরুণীকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। যে বাড়িতে তাঁরা অবস্থান করছিলেন, সেটিও পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দয়াসোনা। তাঁর সঙ্গে অপহৃত হওয়া মন্টি চাকমা সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) সহযোগী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন।

১৮ মার্চ সকালে ঢাকা থেকে বাসে করে রাঙামাটি এসে কুতুকছড়ির ওই বাড়িতে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছিলেন পাহাড়ি দুই নেত্রী। দুপুরের খাবার খেয়ে যে যাঁর মতো করে বাড়িতে চলে যাওয়ার কথা ছিল। তাঁদের সঙ্গে আরও দুজন ছিলেন। তাঁরা হলেন যুব ফোরামের রাঙামাটি শাখার সভাপতি ধর্মসিং চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি শাখার সভাপতি কুনেন্টু চাকমা। সকাল ৯টার দিকে ৮-১০ দুর্বৃত্ত বাড়িটি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এ সময় ধর্মসিং চাকমা ও কুনেন্টু চাকমা পালিয়ে যান। পালানোর পথে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন ধর্মসিং।

দয়াসোনার বাড়ি রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের হাজাছড়ি গ্রামে। উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে গ্রামের একটি কুঁড়েঘরে থাকে দরিদ্র এই পরিবার। কাউখালী কলেজের ছাত্রী দয়াসোনার আজ থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা। গত বছর তিনটি বিষয়ে খারাপ করেছিলেন তিনি। ওই তিনটি বিষয়েই এবার পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তিনি বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়েই সংশয়ে রয়েছে পরিবার। চার ভাইবোনের মধ্যে দয়াসোনা সবার বড়।

অপহরণের ঘটনায় দয়াসোনার বাবা বৃষধন চাকমা বাদী হয়ে রাঙামাটির কোতোয়ালি থানায় ১৯ জনকে আসামি করে মামলা করেন। আসামিদের মধ্যে নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাও রয়েছেন। অবশ্য শক্তিমানের দাবি, তিনি অপহরণের ঘটনায় জড়িত নন। ইউপিডিএফের দুই পক্ষের ঝামেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে অপহরণের দুই সপ্তাহ পরও দুই নেত্রীর খোঁজ পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তার করা হয়নি মামলার কোনো আসামিকেও। এ বিষয়ে রাঙামাটির পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবির  বলেন, অপহরণকারীদের ধরতে এবং দুই তরুণীকে উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। মামলার আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

বৃষধন চাকমা  বলেন, মামলা করার পর তাঁকে মুঠোফোনে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

দয়াসোনা চাকমার মা কালিন্দী রানী চাকমা  বলেন, অভাবের কারণে চার ছেলেমেয়ের মধ্যে শুধু দয়াসোনা ও ছোট ছেলেকে পড়ালেখা করাতে পারছেন। মেয়ের এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা। তিনি বলেন, কয়েক দিন পর উৎসব বৈসাবি। মেয়েকে ছাড়া এই উৎসব কেমন করে করবেন তিনি।

অপহৃত হওয়া হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমার বাড়ি রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি গ্রামে। তাঁর মা কমলা দেবী চাকমা  বলেন, কিছুদিন আগে মুঠোফোনে এক ব্যক্তি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মন্টি চাকমাকে ছাড়িয়ে আনতে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। কিন্তু এরপর ওই নম্বর বন্ধ পান তাঁরা। মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন কী করবেন, কিছুই বুঝতে পারছেন না তাঁরা। উদ্ধারে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, মন্টি বেঁচে আছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে এত দিনে দুই নেত্রীকে উদ্ধার করতে পারত বলে মন্তব্য করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নিরুপা চাকমা। দ্রুত দুই নেত্রীকে উদ্ধার ও অপহরণকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।