জলবায়ুর টাকায় নদীর সর্বনাশ

April 3, 2018, 5:01 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

অব্যাহত দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়া প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীর বুকে এবার নির্মিত হচ্ছে বাঁধ। বলা হচ্ছে, জলবায়ু তহবিলের টাকায় নির্মিত এই বাঁধ রক্ষা করবে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলা শহরকে। তবে স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, দখলদারদের সুযোগ করে দিতেই পাড় থেকে নদীর ২৫০-৩০০ ফুট ভেতরে এই বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে নদীটি আরও সংকুচিত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

এলাকার লোকজন বলছেন, গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে বানারীপাড়া বন্দরের সন্ধ্যা নদীর পূর্ব পাড় থেকে ২৫০-৩০০ মিটার দূরত্বে কাঠ-টিনের বেড়া দিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বাঁধের ভেতরে বিশাল চর বিভিন্ন ব্যক্তি দখলে নিয়ে সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী এই জমি ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দখল করছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বানারীপাড়া কার্যালয়।

এলজিইডি সূত্র জানায়, বানারীপাড়া বন্দরের দক্ষিণে খাজুরা এলাকা থেকে উত্তরে আবাসন পর্যন্ত ১ দশমিক ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল বাঁধটি নির্মাণে অর্থায়ন করছে।

পরিবেশবিদেরা বলছেন, জলবায়ু তহবিলের অর্থ মূলত জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা ও পরিবেশ সংরক্ষণ-সংক্রান্ত প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই 
প্রকল্প পরিবেশ সংরক্ষণ-প্রক্রিয়াকে আরও হুমকিতে ফেলবে। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন প্রথম আলোকে বলেন, একটি প্রবহমান নদী সংকোচন করে এমন বাঁধ নির্মাণ নদীর জন্য মরণঘাতী। কারণ, এই নদীর সঙ্গে এলাকার পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং হাজার হাজার মানুষের যোগাযোগ ও জীবিকা জড়িত।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় মাঝনদীতে দুই সারিতে মোটা কেওড়াগাছের গুঁড়ি পুঁতে বেড়া দেওয়া হয়েছে। তীর থেকে বাঁধের দূরত্ব ২৫০ থেকে ৩০০ মিটার। এই জমি নদীর চর। এসব চরে কেউ ভরাট করে স্থাপনা তুলছেন, কেউ নিজেদের দখল বুঝে নিতে কাঠ-বাঁশ পুঁতে সীমানা নির্ধারণ করে রেখেছেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০১৩ সালের দিকেই পাড় থেকে ৫০০ মিটার নদী দখল হয়। সেখানে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা গড়ে ওঠে। এখন ওই অংশটি বানারীপাড়া বাজারের অংশে পরিণত হয়েছে।

 

উচ্চ আদালতের ৭ দফা নির্দেশনা

সন্ধ্যা নদী ভরাট করে আবাসন প্রকল্প তৈরি হলে ২০১৪ সালে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। হাইকোর্ট তিন মাসের মধ্যে জরিপ করে অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে চার মাসের মধ্যে নদীর জায়গায় মাটি ভরাট, দখল ও স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। যারা মাটি ভরাটকাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এ ছাড়া সন্ধ্যা নদীর প্রকৃত সীমানা সংরক্ষণ এবং নদী রক্ষায় তদারক কমিটি করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে স্থান নির্ধারণে সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে বানারীপাড়া পৌরসভার মেয়র সুভাষ চন্দ্র শীল বলেন, ‘স্থান নির্ধারণ করেছে এলজিইডি। আমার সেখানে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং বাঁধের মধ্যের কিছু জমি দখল হয়েছিল, আমি সেগুলো উদ্ধার করেছি।’

বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের সাংসদ তালুকদার মো. ইউনুস  বলেন, বাঁধ হচ্ছে বানারীপাড়া শহরকে রক্ষার জন্য। 
যেখানে বাঁধ হচ্ছে সেটি চর। এতে নদীর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা নেই। আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কে যেন আমাকে এ রকম কিছু বলেছিল। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র আমরা পাইনি।’