এক মাসের মধ্যে বিমা নিষ্পত্তি : নিহত প্রত্যেকের পরিবার পাবে ২ লাখ ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

মন্ট্রিয়াল চুক্তিতে নেপাল স্বাক্ষর না করায় আন্তর্জাতিক বিমার আওতায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়ে পড়তে পারে। তবে দেশীয় বিমা প্রতিষ্ঠান সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি আগামী এক মাসের মধ্যেই বিমা দাবি নিষ্পত্তির ব্যাপারে আশাবাদী। এভিয়েশন বিমার আওতায় ইউএস-বাংলার যাত্রীসহ সম্পদের সব ঝুঁকি বিমা করা আছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্সে। আর আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বিমা করা হয়েছে কে এম দাস্তুর নামে একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানিতে।

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্র জানায়, নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতরা বিমা ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ পেতে পারেন, যা দেশীয় টাকায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার মতো। আহতদের ক্ষতিপূরণের অর্থ এর চেয়ে কম। ইউএস-বাংলার মোট লায়াবিলিটি (দায়) ১০ কোটি মার্কিন ডলার। দেশীয় টাকায় যা প্রায় ৮২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে উড়োজাহাজের জন্য বিমা ৭০ লাখ ডলার। আর বিমান, যাত্রী ও পাইলটদের আলাদা মূল্য নির্ধারণ করে বিমা করা হয়েছে। ইউএস-বাংলার ক্ষেত্রে পাইলটের ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং যাত্রীদের ২ লাখ ডলারের বিমা রয়েছে।

জানা গেছে, যাত্রীদের দ্রুত বিমা দাবি পরিশোধের লক্ষ্যে দুর্ঘটনার দিনই কাঠমান্ডু যান কোম্পানিগুলোর লস অ্যাডজাস্টার বা সার্ভেয়ারের কর্মকর্তারা। এরপর গত বুধবার আইডিআরএর সঙ্গে দেশি বিমা কোম্পানি সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স, সাধারণ বিমা করপোরেশন (এসবিসি) ও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান কে এম দাস্তুর কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিমা দাবি নিষ্পত্তির বিষয়ে কাজ করতে কর্মপন্থা নির্ধারণ করেন। বৈঠকে বলা হয়, তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার ১ মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। এ বিষয়ে এসবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ শাহরিয়ার আহসান বলেন, দ্রুত বিমা দাবি পরিশোধের জন্য আমরা কাজ করছি। সার্ভেয়ারের রিপোর্ট পেলেই সে অনুযায়ী দাবি পরিশোধের কাজ শুরু হবে। তিনি জানান, প্রথমে নিহতদের স্বজনদের বিমা দাবি পরিশোধ করা হবে। এরপর আহতদের ও বিমানের ক্ষতিরপূরণ দেয়া হবে।

এদিকে নেপালের গণমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট গত শুক্রবার জানায়, এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে বিমাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতা হচ্ছে মন্ট্র্রিয়াল চুক্তি। এ চুক্তি অনুযায়ী যে কোনো যাত্রীর হতাহতের জন্য বিমান কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকে। ১৯৯৯ সালের ২৮ মে বাংলাদেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেনি। নেপাল এখনো স্বাক্ষরই করেনি। ২০১০ সালে উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত সই করেনি তারা। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু ভারত, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বিমার দাবি নিষ্পত্তিতে জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে জানায় তারা।

পোস্ট জানায়, মন্ট্রিয়াল চুক্তির ২১নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিহত যাত্রীদের প্রত্যেকের জন্য এয়ারলাইন্স ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫২৬ ডলার দেবে। সব এয়ারলাইন্সই এই ক্ষতিপূরণের জন্য কোম্পানির কাছে বিমা করে থাকে। যাত্রী ও তাদের পরিবারকে এই ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কে আগেই জানাতে হয়। তবে নেপাল ওয়ারস কনভেনশনে স্বাক্ষর করায় এয়ারলাইন্সকে এখন যাত্রীর জন্য ২০ হাজার ডলার দিতে হবে। দেশটির বিমা প্রতিষ্ঠান সাগমাথার কর্মকর্তা সুভাষ দিক্ষিত বলেন, এমন দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে দুরকম নীতির মধ্যে পড়তে হবে নেপালকে।

নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এই সমঝোতায় স্বাক্ষর করার বিষয়টিকে কখনোই গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বর্তমানে এর একটি কপি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে এটি মন্ত্রিসভায় যাবে। এরপর আলোচনা হবে পার্লামেন্টে। এই সমঝোতা বাস্তবায়নে নতুন আইন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নেপালি স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যেন সমান না হয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেন, আমরা মনে করি যাত্রীরা যেখানেই ভ্রমণ করুন, তারা সবাই সমান। নেপালের ক্ষেত্রে আমরা ১৯২৯ সাল থেকে ওয়ারস সমঝোতা মেনে চলছি। সে অনুযায়ী প্রত্যেক যাত্রীর ৮ হাজার ৩০০ ডলার পাওয়ার কথা। তবে ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বরে হেগে এটির সংশোধন করা হয়। হেগ প্রটোকল অনুযায়ী সেটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ডলারে।

অন্যদিকে দেশীয় বিমা প্রতিষ্ঠান সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শফিক শামিম জানান, দাবি নিষ্পত্তির কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি লস এডজাস্টার দল (সার্ভে টিম) ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে। তাদের প্রতিবেদন হাতে পেলেই বোঝা যাবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সে অনুসারে দাবি পরিশোধ করা হবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, এক মাসের মধ্যেই দাবি পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারব।

তিনি জানান, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের দুর্ঘটনাকবলিত বিএস ২১১ ফ্লাইটের জন্য কমপ্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ নেয়া হয়েছে। মোট লায়াবিলিটি ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে এয়ারক্রাফটের জন্য কাভারেজ ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর বিমানের টিকেট কাটলেই যাত্রীরা বিমার আওতায় চলে আসেন।

তিনি বলেন, আমরা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং পুনঃবিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তবে নিহত-আহতদের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের দাবির প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে না।