অবাধ দুর্নীতি ও ঋণ জালিয়াতির কারণে ফারমার্স ব্যাংক মুমূর্ষু

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

দেশে ব্যাংক সেক্টরে যে ধারাবাহিক বিপর্যয় চলছে তা থেকে অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক রেহাই পাচ্ছে না। সোনালী, জনতা, বেসিক ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংকের দুর্নীতি ও অনিয়মের যে ফিরিস্তি উঠে এসেছে তার সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায় বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে অনুমোদনপ্রাপ্ত ফারমার্স ব্যাংকের নাম। মূলত বল্গাহীন দুর্নীতি, চরম অনিয়ম, পরস্পরের যোগসাজশে বেপরোয়া ঋণ জালিয়াতি ও ঋণখেলাপি ইত্যাদি নৈরাজ্যের কবলে ব্যাংক খাত এখন খাদের কিনারে এবং পর্যুদস্ত। আর ব্যাংক খাতের এ চরম দুর্নীতি অবাধ অনিয়ম, বেপরোয়া ঋণ জালিয়াত তথা ঋণখেলাপির দায় নিয়ে বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকটির এখন ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা। তাই এ মুহূর্তে ঘুরে ফিরে এ ব্যাংকটি : নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা এখন তুঙ্গে। : বলাবাহুল্য রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের গত মেয়াদে অনুমোদন প্রাপ্ত ৯টি ব্যাংকের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক একটি। ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন পাওয়ার আগেই সাইনবোর্ড লাগিয়ে দফতর খুলে নিয়োগ দিতে শুরু করে ব্যাংকটি। কিন্তু ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরুর পর বছর না ঘুরতেই তারা ঋণ প্রদানে অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। আর এর ভুক্তভোগী এখন সাধারণ আমানতকারীরা। মূলত আমানতের চেয়ে ঋণ বেশি হওয়ায় ফারমার্স ব্যাংকের আমানতের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। ব্যাংকটির শাখাগুলোতে প্রতিদিন ভিড় করেও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। পক্ষান্তরে নানা অনিয়ম করে প্রদত্ত ঋণও আদায় করতে পারছে না তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়া ফারমার্স ব্যাংকের অনিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব গুরুতর আর্থিক তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত এসব অনিয়ম হয়েছে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতির সময়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ফারমার্স ব্যাংকের গ্রাহকদের ঋণের ভাগ নিয়েছেন তারা। এর মাধ্যমে এ দু’জনের নৈতিক স্খলন ঘটেছে এবং তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। উল্লেখ্য, মহীউদ্দিন খান আলমগীর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদের সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি। : এদিকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংক খাতে। আমানতকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরিণতিতে অন্যান্য ব্যাংক থেকে আমানত তোলার প্রবণতা বাড়ায় ব্যাংক খাতে তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এর জেরে একদিকে যেমন সুদের হার বেড়ে গেছে পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ কার্যক্রমেও এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে ফারমার্স ব্যাংকের এসব নানা অনিয়মের ইতিবৃত্ত। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ব্যাংকিং খাতের সকল নিয়মনীতি ও কার্যপদ্ধতি (প্রসিডিউর) উপেক্ষা করে ব্যাংকটি ৫শ’ কোটি টাকা অনুমোদন করে। এর মধ্যে ৩৬০ কোটি টাকা ইতিমধ্যে ঋণখেলাপির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উপরন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এ ৫শ’ কোটি টাকা ঋণের ব্যাপারে অপর একটি অর্থ কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটিত হয়েছে। তা হলো ব্যাংকটি ব্যাংকিং খাতের সকল নিয়ম-কানুন ও কার্যপদ্ধতি লঙ্ঘন করে ১১টি কোম্পানির মধ্যে এ ৫শ’ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করে। এর মধ্যে ব্যাংকটির মতিঝিল শাখা ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত যে ১০টি কোম্পানিকে ঋণ প্রদান করে এসব কোম্পানির সবকটিই এখন ঋণখেলাপি হিসাবে পর্যবসিত হয়েছে। : কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ঋণখেলাপি তথা জালিয়াতির ব্যাপারে ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দিন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতিকে বহুলাংশে দায়ী করেছে। ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ব্যাপারে যে অনিয়ম হয়েছে তা মোটা দাগের। এর মধ্যে কয়েকটির ক্ষেত্রে সরাসরি ঋণ জালিয়াতি হয়েছে। এর মাত্রা ঋণ গ্রহণের ব্যাপারে আবেদনপত্র ছাড়াই ঋণ মঞ্জুর করা থেকে শুরু করে কি উদ্দেশে তা ব্যবহৃত হবে তার কোনো উল্লেখ নেই। কয়েক বছর পার হওয়ার পর গত ডিসেম্বরে ফারমার্স ব্যাংকের রাজধানীর গুলশান, মতিঝিল ও শ্যামপুর শাখা থেকে ৪শ’ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি উদ্ঘাটনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এ নতুন তথ্যগুলো বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ এ তদন্তে দেখা যায় ফারমার্স ব্যাংক ১১টি কোম্পানিকে ঋণ বিতরণে কমপক্ষে ১১টি ক্ষেত্রে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। এসব কোম্পানি হলো এনএআর সোয়েটার্স লিঃ, অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট টেকনোলজিস, আবেদা মেমোরিয়াল হাসপাতাল, ইনডেক্স হাউজিং, আল-ফারুক ব্যাগস, নাহার ফারমার্স গ্রুপ, অ্যাপোলো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মল্লিক একুয়াকালচার ফার্ম, মেসার্স প্রেমজয়, ম্যাক ট্রেডিং ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। : এ বেসরকারি ব্যাংকটি ১৯৯১ সালের ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্ট লঙ্ঘন করে ফুলে-ফেঁপে মুনাফা দেখানোর জন্য খেলাপি ঋণের বিষয়টি গোপন রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকটির মতিঝিল শাখা যে ১০টি কোম্পানিকে ৩৬৭ কোটি টাকা ঋণ প্রদানের ব্যাপারে অবৈধ উপায় অবলম্বন করে এ ঋণকে আনক্লাসিফাইড বা অশ্রেণীভুক্ত লোন হিসাবে দেখায়। যদিও এসব কোম্পানি ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি হিসাবে গণ্য হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়। : এদিকে চলতি বছরের মধ্য জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকের মতিঝিল শাখার ক্রেডিট অ্যাকাউন্টের অডিট রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দেয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি এ রিপোর্ট পেশ করার কথা থাকলেও তা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ফারমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ প্রসঙ্গে বলেছেন তারা ফাংশনাল অডিট করার জন্য মধ্য-জানুয়ারিতে আটিজান চার্টার্ড অ্যাকাউন্টসকে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি অবশ্য জানান, ঋণখেলাপি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করার আবেদন জানিয়েছে। এদিকে সূত্র জানায়, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ও হয়রানির অবসানে ৩ মাসেও ব্যাংকটির মূলধন জোগান হয়নি। তারা জানায়, তারল্য সঙ্কটে পড়ায় এখন নতুন করে মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। এজন্য সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইসিবির উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৪টি ব্যাংক থেকে মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে ব্যাংকগুলো কেউ বাড়তি ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। এজন্য ব্যাংকগুলো মূলধন জোগান দেয়ার পাশাপাশি ফারমার্স ব্যাংকের পর্ষদে বসতে চাইছে। তবে ব্যাংকটির বর্তমান পর্ষদ তা মানতে দোটানায় পড়েছে। এ কারণে গত জানুয়ারিতে এ উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। : এদিকে ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দিন খান আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি কোনো ঋণ দেননি। পক্ষান্তরে নিরীক্ষায় কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতির সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের ফারমার্স ব্যাংক থেকে সরে যাওয়ার কথা বললে এ ২ জন কর্মকর্তা গত বছর নভেম্বরে উক্ত ব্যাংক বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেন। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র দেবাশীষ চক্রবর্তীকে ফারমার্স ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। সব মিলিয়ে এ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংকটি বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছে। একদিকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেয়ার চাপ অন্যদিকে মূলধন জোগান পাওয়ার দুঃসাধ্য প্রচেষ্টায় ব্যাংকটির লেজে-গোবরে অবস্থা। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে সাবেক ব্যাংকার ইবরাহিম খালেদ সহমত পোষণ করে বলেন, তিনি মনে করেন ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের যথাযথ শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।