‘আমি যে মেয়ে বিশ্বাস করতেই ভুলে গেছি’

April 26, 2018, 12:46 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

বাবার ঋণ পরিশোধ করতে সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছে ১৮ বছরের কিশোরী সিতারা।

 

ভোর হলেই পুরুষদের মতো পোশাক পরে বাবার সঙ্গে একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতে যায় সে। সেখানে তাকে যেন কেউ চিনতে না পারে তাই কারও সঙ্গে কথা বলার সময়েও ইচ্ছাকৃতভাবে কণ্ঠস্বর মোটা করে নেয়।

তার পুরো নাম ওয়াফাদার। পূর্ব আফগানিস্তানের নানগড়হার এলাকার একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান সে।

সিতারারা পাঁচ বোন, কোনো ভাই নেই। তাই আঞ্চলিকপ্রথা মেনে পুরুষ সেজে কাজ করতে হয় তাকে।

এ প্রথার নাম ‘বাচাপোসি’। এর নিয়মানুযায়ী, পুরুষ সাজতে গিয়ে কিশোরী ও তরুণীদের শুধু পুরুষদের মতো পোশাক পরলেই চলে না। তাদের পুরুষদের পারিবারিক রীতিও মেনে চলতে হয়।

একা সিতারা নয়, পুত্রহীন অনেক দম্পতির সন্তানকেই ‘বাচাপোসি’ অনুযায়ী জীবন কাটাতে হয়।

সিতারা বলছে, ‘আমি যে মেয়ে, সেটি আমি নিজেই বিশ্বাস করতে ভুলে গেছি। যে ইটভাটায় আমি কাজ করি, সেখানে বেতন পাই না। ইটভাটার মালিকের কাছ থেকে আমার বাবা একসময় টাকা ধার করেছিলেন। তা এখানে কাজ করার বিনিময়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

সিতারাকে তার বাবাও সব জায়গায় নিজের ছেলে হিসেবেই পরিচয় দেন। পুরুষদের ধর্মীয় আচার-আচরণও মেনে চলেন তিনি।

আফগানদের ‘বাচাপোসি’র দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অতীতে পুত্রহীন দম্পতিরা তাদের পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম যাতে সুষ্ঠুভাবে হয়, সে কারণে বড় মেয়েকে ছেলের মতো করে বড় করতেন।

পর্দাপ্রথা তাদের ওপরে প্রযোজ্য হতো না। পুরুষনিয়ন্ত্রিত আফগান সমাজে পুরুষদের সমান অধিকার ও মর্যাদা দেয়া হতো সেই মেয়েকে।

পরে অধিকার ও মর্যাদা পাওয়ার ইচ্ছায় কিছু নারী নিজ থেকেই এ প্রথা মানতে শুরু করেন।

সিতারা বলে, ‘বাড়ির বাইরে যখন বের হই, প্রায় সময়েই কেউই বুঝতে পারেন না যে আমি পুরুষ নই। যেদিন সেটি লোকে বুঝতে পারবে, সেদিন থেকে আমার জীবনে অনেক সমস্যা তৈরি হবে। আমাকে ধর্ষণ বা অপহরণ করা হতে পারে। সেই সময় হয়তো আমাকে কাজ করা বন্ধ করে দিতে হবে। আট বছর বয়স থেকে এখানে কাজ করছি। স্কুলে যাওয়া বা খেলাধুলা করার সুযোগ আমি পাইনি।’

সিতারা প্রতিদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। সকাল ৭টায় কাজ শুরু করে বিকাল ৫টার মধ্যে ৫০০ ইট বানানোর চেষ্টা করে। যেদিন পারে সেদিন বাবার ঋণের ১৬০ আফগানি পরিশোধ করা হয়েছে বলে ধরা হয়।

সিতারার বাবা ইটভাটার মালিকের কাছে ২৫ হাজার আফগানি ঋণ করেছিলেন। সেই হিসাবে অনেক আগেই ঋণ পরিশোধ হয়ে যাওয়ার কথা।

কিন্তু সুদে আসলে মোট অঙ্কটা কত দাঁড়িয়েছে তার হিসাব জানেন না সিতারার বাবা নূর। তিনি বলেন, ‘আমরা পড়াশোনা জানি না। টাকা শোধ হলে মালিকই জানিয়ে দেবে বলেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে ছেলে দেননি। দিলে এভাবে মেয়েকে দিয়ে কাজ করাতে হতো না।’

সিতারা বলছে, ‘আমার একটা ছোট বা বড় ভাই থাকলে ভালো হতো। অনেক ছোটবেলা থেকে আমাকে ছেলে সাজানোর এই কাজটা শুরু হয়। ১৩ বছর বয়সে আমি বুঝতে পারি, আমার সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। সেই সময়ে প্রতিবাদ করেছিলাম। তবে ততদিনে গোটা সংসারের দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব আমাকে ধার শোধ করতে হবে। আমি চাই না আমার কোনো ছোট বোনকে এ কাজ করতে হোক।’