যোগ্যতা থাকার পরও হিজড়া হওয়ায় সরকারি চাকরি পাননি জোনাক

May 5, 2018, 4:57 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

যোগ্যতা থাকার পরও হিজড়াদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন জোনাক হিজড়া। তার দাবি, হিজড়া পরিচয়ে কেউ এখনও কোনও সরকারি চাকরিতে যোগদান করতে পারেনি। তাই সরকারি চাকরির নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তন চায় হিজড়ারা।  

 

জানা যায়, সমাজকল্যাণ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ফরিদুল ইসলাম ওরফে জোনক হিজড়া। অনেক চেষ্টা করেও তিনি কোনও সরকারি চাকরি জোগাড় করতে পারেননি। উপায় না পেয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এখন কাজ করেন তিনি। এই পর্যন্ত আসতেও তাকে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে।

এ ব্যাপারে জোনাক বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় নিজের ভেতরের পরিবর্তন চোখে ধরা পড়ে।’

তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর বাড্ডার নতুনবাজার এলাকার একটি বাসায় তিনি ভাড়া থাকেন। যেখানে অপর দু’জন হিজড়া তার সঙ্গে থাকেন। ছয় ভাইয়ের মধ্যে জোনাক হিজড়া সবার ছোট। বাবা পুলিশে চাকরি করতেন। মা গৃহিণী। অপর পাঁচ ভাই সবাই প্রতিষ্ঠিত।

জোনাক ছোট বেলায় ছেলে পরিচয়ে লেখাপড়া করেছেন। তার নাম ছিল ফরিদুল আলম। ময়মনসিংহ সদরে তাদের বাড়ি। নিজের ভেতরে পরিবর্তন দেখতে পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক থেকে তিনি মেয়েদের মত চলার চেষ্টা করেন। তবে এতে সহপাঠী, শিক্ষক ও পরিবার বাধ সেজেছিল। ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে তিনি লেখাপড়া করেছেন।

জোনাক বলেন, ‘আমি যখন অনার্স ও মাস্টার্সে পড়েছি তখনই বেশি হয়রানির শিকার হয়েছি। কখনও যৌন হয়রানি, কখনও মানসিক হয়রানি। আমার সহপাঠীরা আমাকে এভাবে কেউ মেনে নিতে নিতে পারেনি। শিক্ষকরাও আমাকে হয়রানি করেছেন।’

জোনাক আরও বলেন, ‘২০১৪ সালে মাস্টার্স শেষ করেছি, তখন আমার ভাইয়েরা সবাই চেয়েছেন যাতে পুরুষ পরিচয়ে যেকোনও চাকরি করি। তারা আমাকে পুরুষ সাজিয়ে অনেক জায়গা নিয়েও গেছেন। কিন্তু আমি তো জানি আমি কে? আমি ওইভাবে বাঁচতে চাইনি। কারণ আমি ইচ্ছা করলেই আমার হাতের নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, বসার নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষের মতো বসতে পারি না। কণ্ঠ পুরুষের মতো হয় না। তাহলে আমি কীভাবে পুরুষ হয়ে বাঁচবো। কতদিন এটা পারা যায়? আমি চেষ্টা করেছি পরিবারের দিকে চেয়ে, কিন্তু আমি সেটা পারিনি।’

মাস্টার্স শেষ করে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন জোনাক। কারণ পরিবারের ভেতরে তাকে নিয়ে অনেক সমস্যা হচ্ছিল। পরিবারের অনেকেই মনে করতো তার জন্য আত্মীয়-স্বজনের অনেকের বিয়ে ভেঙে যায়। তার এলাকার মানুষ বিশ্বাস করে, হিজড়া পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা করলে, ভবিষ্যত প্রজন্মে হিজড়া জন্ম হতে পারে। তাই জোনাকের বাড়ির মেয়েদের বিয়ে করতে চাইতো না কেউ। তাই নীরবে অনেক কষ্ট নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান জোনাক।

বর্তমানে জোনাকের সব ভাই ও বোনেরা বাইরে থাকেন। বাড়িতে তার বৃদ্ধা মা এবং তার মৃত এক ভাইয়ের স্ত্রী ও তার সন্তানরা থাকেন। ছুটি পেলে প্রায়ই তিনি বাড়িতে যান। বৃদ্ধা মাকে দেখাশোনা করেন। প্রতিমাসে কিছু টাকা দিয়েও সহযোগিতা করেন। তবে তাকে গভীর রাতে বাড়িতে যেতে হয়।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশীরা যাতে দেখতে না পায় সেজন্য রাতে বাড়িতে যাই।’

তার লড়াই করা জীবনের গল্প অনেক লম্বা। তারপরও লড়াই করেই তিনি হিজড়া পরিচয়ে বেঁচে থাকতে চান। তিনি বলেন, ‘মাস্টার্স শেষ করে আমি হাত খরচের টাকা অন্য ভাইদের কাছ থেকে নিতে লজ্জা পেতাম। কতদিন এভাবে নেবো? তাই চাকরি না পেয়ে ছেলে পরিচয়ে আমি টিউশনি করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনও শিক্ষার্থীকে দুই-একদিন পড়ানোর পর আমাকে তার পরিবার বাদ দিয়ে দিতো।’

দেশব্যাপী হিজড়াদের নিয়ে কাজ করে ‘বন্ধু’ নামের এক সংগঠন। এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহম্মেদ জোনাককে তাদের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিলে তিনি কাজ শুরু করেন। বর্তমানে ‘বন্ধু’র সঙ্গেই কাজ করছেন।

স্বীকৃতির বিষয়ে বলেন, ‘আমরা কেবল গেজেট পেয়েছি একটি। আর কিছুই পাইনি। দেশের কোথাও কোনও কাগজপত্রে তৃতীয় লিঙ্গ বলে কিছু নেই, কোনও সুবিধা হয়নি। এখনও আমূল পরিবর্তন করতে হবে।’

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানে সেভাবে হিজড়াদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। কিন্তু হিজড়ারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী অন্তত পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগের দাবি জানিয়েছে। যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারলে তাদের কাজ দেয়ারও দাবি করেছেন।

এ ব্যাপারে জোনক বলেন, ‘লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিলো, কিন্তু অধিকার মেলেনি।’

হিজড়াদের স্বীকৃতির পর বিভিন্ন অফিস আদালতের নিজস্ব নীতিমালা পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি।

জোনাক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যদি কখনও একটু কথা বলার সুযোগ হয়, তাহলে জানতে চাইবো- এটা আমাদের কেমন স্বীকৃতি?