রাষ্ট্রপতি যাচ্ছেন : গাজীপুরে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

একাত্তরে গাজীপুরে শুরু হয় প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। দিনটির স্মরণ উপলক্ষে এবং অপর দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দুদিনের সফরে আজ সোমবার গাজীপুর আসছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর ও শহীদদের স্মরণে নাগরিক গণসংবর্ধনা, কারা সপ্তাহ উদ্বোধন ও ডুয়েটের দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। প্রতি বছর ১৯ মার্চ গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করেন এলাকাবাসী। দিনটিকে জাতীয়ভাবে পালনসহ সে দিন নিহত শহীদ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার দাবি করছেন এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুদিনের সফরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আজ বিকেলে হেলিকপ্টারযোগে গাজীপুর পৌঁছবেন। বিকেল ৩টায় তাকে গাজীপুর সার্কিট হাউসে গার্ড অব অনার দেয়া হবে। বিকেল ৪টায় তিনি ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর ও শহীদদের স্মরণে নাগরিক গণসংবর্ধনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। তিনি গাজীপুর সার্কিট হাউসে রাত যাপন করবেন। পরদিন দুপুর ১২টায় কারা সপ্তাহ ২০১৮-এর উদ্বোধন উপলক্ষে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার প্রাঙ্গণে আয়োজিত কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করবেন। একই দিন বিকেল ৩টায় রাষ্ট্রপতি গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

এ ছাড়া ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাজীপুর আসার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে গাজীপুর শহরজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। দিন-রাত সড়ক মেরামত, ভবন রং ও চুনকামসহ নগরে চলছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এরই মধ্যে পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইভেন্টের স্থান পরিদর্শন করেছেন।

বীরত্বগাথা সেই ১৯ মার্চ : মার্চের প্রথম দিকে দুই ধাপের জয়দেবপুর মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তৎকালীন হাবিব উল্লাহ এমপির নেতৃত্বে প্রয়াত মণিন্দ্রনাথ কুমার গোস্বামী ও শ্রমিক নেতা এম এ মুত্তালিবকে সদস্য করে ৩ সদস্যের হাইকমান্ড এবং বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপিকে আহ্বায়ক করে অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. নজরুল ইসলাম খান এবং সদস্য ছিলেন মো. শহীদুল্লাহ বাচ্চু (মরহুম), শেখ মো. আবুল হোসাইন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মিয়া, হারুন আর রশিদ ভূঁইয়া, মো. শহীদুল ইসলাম পাঠান (মরহুম) ও মো. নুরুল ইসলাম। গাজীপুরের তৎকালীন নাম ছিল জয়দেবপুর। জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ীতে অবস্থান ছিল তৎকালীন পাকিস্তান বাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট।

সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মিয়া জানান, ১৯ মার্চ সকালে ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব এক কোম্পানি সৈন্যসহ জয়দেবপুর সেনানিবাসে এসে উপস্থিত হন। এ সময় ওই রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হবে- এমন সংবাদে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মুক্তিকামী বীর জনতা। তাদের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা, তীর-ধনুক, বল্লম, রড আর শাবল। জনতা রাজবাড়ী সড়কে তৈরি করেন দুর্ভেদ্য অবরোধ। তারা রেলস্টেশন থেকে মালগাড়ির একটি ওয়াগন এনে রাস্তা বন্ধ করে দেন। সংগ্রাম পরিষদের ডাকে রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেন বীর জনতা।

হানাদার বাহিনী জয়দেবপুর বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে পৌঁছলে জনতা তাদের কাছ থেকে ৪টি চাইনিজ রাইফেল ও একটি স্টেনগান কেড়ে নেন। হানাদার বাহিনী তখন নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালায়। গুলিতে মুক্তিকামী নিয়ামত আলী, মনু খলিফা ও হুরমত আলী শহীদ হন।

এদিকে জয়দেবপুর বটতলা ব্যারিকেড ভেঙে ঢাকায় যাওয়ার পথে পাকিস্তানি সৈন্যরা চান্দনা চৌরাস্তায়ও শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এখানেও হানাদাররা নির্বিচারে গুলি চালায়। এ সময় ভোগড়া গ্রামের সাহসী যুবক ফুটবলার হুরমত আলী এক পাকিস্তানি সেনার রাইফেল ছিনিয়ে নিতে গিয়ে অপর এক সেনার গুলিতে শহীদ হন। এ সময় কানুবীরসহ অনেকে আহত হন। এরপরই দেশজুড়ে ¯েøøাগান ওঠে- ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কানুবীরও মারা যান। শহীদ পরিবারের লোকজন জানান, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও শহীদদের স্বজনদের দিন কাটছে নানা কষ্টে।

অবশ্য ১৯ মার্চের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে চান্দনা চৌরাস্তায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মারক ভাস্কর্য জাগ্রত চৌরঙ্গী এবং জয়দেবপুর বটতলায় মুক্তমঞ্চ। প্রতি বছর পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় গাজীপুরবাসী এ দিনটি পালন করেন। এবারো রয়েছে নানা আয়োজন।

১৯৭১ সালের সে দিনের ওই প্রতিরোধ সংগ্রামে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন আজকের মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি। তার কাছেই এখন জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনসহ নানা দাবি শহীদ পরিবারের লোকজন ও মুক্তিযোদ্ধাদের।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ১৯ মার্চ জাতীয়ভাবে পালনের জন্য যে দাবি উঠেছে সে দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি সদয় সম্মতি দিয়েছেন ১৯ মার্চ গাজীপুরে এসে গাজীপুরবাসীর গৌরবগাথা- বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধকে স্বীকৃতি দেয়ার। এর মাধ্যমে সারা দেশে ভবিষ্যতে ১৯ মার্চ জাতীয়ভাবে পালনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।