ইমরান এইচ সরকারকে হত্যা করতে অবস্থান রেকি করে পুরনো জেএমবি

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারকে হত্যার উদ্দেশ্যে পুরনো জেএমবি তার অবস্থান গতিবিধি রেকি করেছে বলে গোয়েন্দা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে তার নিরাপত্তা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা এই হুমকির কথা ইমরান এইচ সরকারকেও জানিয়েছে। তবে তিনি এই হুমকিতে ভীতু নন বলে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে মন্তব্য করেন।

এ বছরের মে মাসে একটি গোয়েন্দা সংস্থা পুলিশের কাছে ওই রিপোর্টটি হস্তান্তর করে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইমরান এইচ সরকারের ওপরে জঙ্গি ও উগ্রবাদীরা হামলা করতে পারে বলে গোয়েন্দাদের কাছে এমন তথ্য রয়েছে। তবে, বর্তমানে ব্যক্তিগতভাবে ইমরান এইচ সরকার কোনও নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। পুলিশের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তাকে ধানমন্ডি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তবে তাকে সার্বক্ষণিক কোনও নিরাপত্তারক্ষী বা পুলিশ সদস্য দেওয়া হয় না।

কিছুদিন আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাদের এই তথ্যের বিষয়ে ইমরান এইচ সরকারকে জানিয়ে সতর্ক থাকতে বলেন।  এই প্রসঙ্গে ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমাকে এ রকম একটি রিপোর্টের বিষয়ে বলা হয়েছে। তবে এরপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তারা যেভাবে রিপোর্টের কথা বলে কিন্তু সেভাবে দৃশ্যমান নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে না। এসব ঘটনায় আমি আরও শঙ্কিত হই। পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে তাদের জানাতে। আমাদের কার্যক্রম যেহেতু শাহবাগে বেশি থাকে, সেখানে কোনও প্রোগ্রাম থাকলে আমি ওই থানার পুলিশকে বিষয়টি জানাই।’

তবে হুমকিতে তিনি ভীতু নন উল্লেখ ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘যখন আমরা প্রতিবাদ শুরু করি, সেই ২০১৩ সাল থেকে এই ধরনের হুমকি পেয়ে আসছি। এতে আমি ভীতু নই। আমাদের প্রতিবাদ আন্দোলন চলবে।’

গোয়েন্দা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গঠিত গণজাগরণ মঞ্চের কর্মকাণ্ডের ফলে ডা. ইমরান এইচ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ও উগ্র মৌলবাদীদের টার্গেট হয়ে আছেন এবং জঙ্গিদের হাতে যেকোন সময় তার প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি গোপন সূত্রে জানা যায়, পুরনো জেএমবি গ্রুপের শীর্ষ নেতা তৌকির ওরফে তৌকে ওরফে গোপাল রাজশাহী অঞ্চলের পুরনো জেএমবির ইসাবা প্রধান বুলবুল ওরফে সোহাগকে জানায়, ইমরান এইচ সরকারকে রেকি করা হয়েছে’। এই বার্তায় প্রতীয়মান হয় যে তারা ডা. ইমরান এইচ সরকারের প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করছে ও সে ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ’৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের সহকার সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে সন্তুষ্ট হতে না পেরে ওইদিনই ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কস নামক সংগঠনের ব্যানারে প্রতিবাদী তরুণরা শাহবাগ চত্বরে একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু করে। পরদিন ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮ টায় শাহবাগ চত্বরে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কসের ব্যানারে প্রায় ৬-৭ হাজার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ সমবেত হয়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে সমাবেশ করে। শাহবাগ মোড়ে স্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে গণজাগারণ মঞ্চ নাম দেওয়া হয়। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেন ডা. ইমরান এইচ সরকার। গণজাগরণ মঞ্চ একনাগাড়ে শাহবাগ চত্বরে অবস্থান করার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি’র শীর্ষ পর্যায়ের মানবতাবিরোধী অপরাধী নেতাদের প্রত্যেকের রায় ঘোষণার আগের দিন শাহবাগ চত্বরে বড় ধরনের সমাবেশে মুখর থাকে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় কার্যকরে গণজাগরণ মঞ্চের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও রায় কার্যকরে ওই সময়ে গণমানুষের মধ্যে মানবতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে ঐকমত্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে গণজাগরণ মঞ্চ। একপর্যায়ে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের অনুসারী গণজাগরণ মঞ্চের কয়েকজন কর্মী তাদের ব্লগে ইসলাম ধর্ম ও রাসুল (সা.)কে নিয়ে কটূক্তি করায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত জামায়াতে ইসলামীসহ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএসবি ও উগ্র মৌলবাদী সংগঠনগুলো ডা. ইমরান এইচ সরকারের প্রতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়।

বর্তমানে গণজাগরণ মঞ্চ বিভক্ত হয়ে পড়ায়, আগের মতো এর ইমেজ নেই বলেও মঞ্চের বর্তমান কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, বর্তমানে গণজাগরণ মঞ্চ বিভক্ত হয়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য কর্মকৎপরতাও নেই। ডা. ইমরান এইচ সরকার গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের নেতা হিসেবে পরিচিত এবং হাতেগোনা কর্মী-সমর্থকসহ বিভিন্ন ইস্যুতে শাহবাগে কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলেও ততটা ইমেজ নেই।

গণজাগরণ মঞ্চের নেতা হিসেবে ডা. ইমরান এইচ সরকারের সারাদেশে একটি পরিচিতি রয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে রাজনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক। আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় রাজনীতির মাঠ শান্ত থাকা দরকার। এ পরিস্থিতিতে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত ও আগামী সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট করার লক্ষ্যে স্বার্থন্বেষী মহল ইমরানের প্রাণনাশের মাধ্যমে উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাতে পারে ।

প্রতিবেদনে ডা. ইমরান এইচ সরকারের প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকায় তার নিরাপত্তার প্রতি যথাযথ সতর্কমূলক ব্যবস্থাসহ সব গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত নজরদারি রাখার সুপারিশ করা হয়। একইসঙ্গে জঙ্গিদের হিটলিস্টে থাকা অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তার ব্যাপারেও সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।

ইমরান এইচ সরকারের নিরাপত্তার বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল লতিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বর্তমানে সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে পুলিশ দিচ্ছি না। তবে তার প্রয়োজন হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এছাড়া তিনি যে এলাকায় থাকেন, সেখানে সব সময় টহল পুলিশ থাকে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ইমরান এইচ সরকারের নিরাপত্তা জোরদারের কোনও নির্দেশনা নেই। তবে নিরাপত্তা চাইলে তিনি পাবেন।’