‘সম্প্রীতি’ বনাম ‘উন্নয়ন’

July 25, 2018, 10:31 am নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

‘সম্প্রীতি’ বনাম ‘উন্নয়ন’। কোন্‌টির প্রয়োজন বেশি। এ নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত সিলেটের ভোটাররা। কেউ বলছেন- শান্তির শহর সিলেটে আগে প্রয়োজন সম্প্রীতি। সম্প্রীতি বজায় থাকলে দ্রুত উন্নয়ন কাজ ত্বরান্বিত হবে। আবার কারো কারো মতে- আগে উন্নয়ন পরে সম্প্রীতি।

পিছিয়ে পড়া সিলেটকে এগিয়ে নিতে হলে আগে উন্নয়ন প্রয়োজন। আগামী ৩০শে জুলাই দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নেবেন সিলেটবাসী। এবার সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কামরানের মুখে সম্প্রীতির কথা। তিনি উন্নয়নের কথা বলছেন, তবে এগিয়ে রাখছেন সম্প্রীতিকে। এই সম্প্রীতিতে যাতে আঘাত না আসে সে ব্যাপারে তিনি ভোটারদের সতর্ক করে দিচ্ছেন। আর আরিফুল হক চৌধুরীর মুখে উন্নয়নের কথা। তিনি আড়াই বছরের উন্নয়নকে ভোটারের নজরে আনছেন। এই অবস্থায় দু’জনের ক্ষেত্রেই ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে যাবে ‘মার্কা’। কোনো স্থানীয় নির্বাচনে এই প্রথম মার্কায় ভোট দিতে যাচ্ছেন সিলেটবাসী। অতীতের সব নির্বাচনে তারা মার্কা ছাড়াই ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার দলীয় প্রতীকে তারা নির্বাচিত করতে যাচ্ছেন নগর পিতাকে। এতে করে হিসেবেও গরমিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রীতির শহর সিলেট। আদিকাল থেকেই এখানে সম্প্রীতি বিরাজমান।

এই সম্প্রীতির মধ্যে রয়েছে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্প্রতি। ১৯৯৫ সালে পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কামরান সম্প্রীতির ধারা বজায় রেখে চলেছেন। তার সঙ্গে সব মহলের সম্পর্ক ভালো। এই সম্পর্কের কারণে নিজ দলের কারো কারো কাছে বিরাগভাজনে পরিণত হয়েছেন। এরপরও সম্প্রীতি ছাড়েননি কামরান। সিলেটের চমৎকার সামাজিক সম্পর্ক তিনি লালন করে চলেছেন। ফলে পঞ্চায়েতি ও ওয়ার্ডভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থাকেই তিনি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এজন্য প্রতি এলাকায়ই প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছে কামরানের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সামাজিকতার কারণেই কামরান সিলেট নগরের অনেক বড় বড় সমস্যাকে সমাপ্ত করেছেন। আইনি ঝুটঝামেলা থেকেও তিনি নগরবাসীকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন সামাজিকতার কারণে। পাশাপাশি পাড়ায়-পাড়ায় সামাজিক সংগঠনে কামরানের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বেশি। সিলেট শহর ধর্মীয় সম্প্রীতির শহরও। বিশেষ করে এই শহরে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বসবাস করছেন। দীর্ঘ দিনের শাসক হওয়ার কারণে কামরানের সঙ্গে মুসলিম, হিন্দু সহ বিভিন্ন ধর্মের ইমাম, পুরোহিতদের সম্পর্ক ভাল। গেল রমজান মাসে সিলেট লা-মাযহাবীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সুন্নি মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এ ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে উঠে সিলেট। এই উত্তেজনা স্তিমিত রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন কামরান। তিনি এ নিয়ে উভয়পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কামরান রাজনীতিবিদ হলেও অন্য রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি কখনোই হিংসাত্মক মনোভাব দেখান না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের ১০ বছরে সিলেটে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।

এমনকি সিলেটে বিরোধীদের দমন-পীড়নের মাত্রা কম। রাজনৈতিক সম্প্রীতির কারণে সিলেটে বিরোধীরাও অনেক সময় কামরানের আনুকূল্য পেয়েছেন। ফলে এ সম্প্রীতিতে ভাঙনের সৃষ্টি হয়নি। বরং গত রমজানের আগে কামরান যখন হার্টের এনজিওগ্রাম করিয়ে সিলেটের বাসায় ফেরেন তখন মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তাকে বাসায় দেখে এসেছেন। এবারের সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের শুরু থেকেই কামরানের মুখে সম্প্রীতির কথা। গতকাল কামরান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেটের উন্নয়ন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সুতরাং সিলেটে কে মেয়র সেটা মুখ্য নয়- ‘সিলেটের উন্নয়ন হবেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে সম্প্রীতি। সিলেটের শান্তিপ্রিয় মানুষ কখনো কোনো হানাহানি, রক্তপাত কিংবা বিশৃঙ্খলা চায় না।

আমরা সুদীর্ঘ রাজনীতির ধারাবাহিকতায় সেটি লালন করে এসেছি। এখন এই জায়গাতে কেউ আঘাত করলে সিলেটের মানুষ রুখে দাঁড়াবে।’ তিনি বলেন- ‘আমি নির্বাচিত হলে সিলেটে উন্নয়নের পাশাপাশি সম্প্রীতির শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তুলবো। অতীতেও আমি এ ধারা বজায় রেখেছি।’ এদিকে বিএনপি দলীয় মেয়রপ্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর মুখে উন্নয়নের স্লোগান। তার উন্নয়নেও নগরবাসী সন্তুষ্ট। বিগত ৫ বছরের শাসনে আরিফুল হক চৌধুরী অর্ধেক সময়ই কারাগারে ছিলেন। আর এই অর্ধেক সময় তিনি কাজ করেছেন। দৃশ্যমান এই উন্নয়নে ইতিমধ্যে সিলেটের মানুষের মন জয় করেছেন তিনি। এই সময়ে সিলেটে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাজ হয়েছে। এই কাজের অর্ধেকের বেশি করেছেন আরিফুল হক চৌধুরী। এর আগে বিএনপি সরকারের সময় আরিফুল হক চৌধুরী ছিলেন নগর উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান। ওই সময় নির্বাচিত সিটি কাউন্সিলর ছিলেন তিনি। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কামরানকে পাশ কাটিয়ে আরিফ সিলেট নগরীতে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ঘটান। এ সময় আরিফুল হক চৌধুরীর পাশে ছিলেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ফলে ওই সময় সিলেটে সাইফুরের উন্নয়ন হয়েছে আরিফের হাত ধরেই।

ফলে পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আরিফ মেয়র হিসেবে প্রার্থী হলে উন্নয়নের ধারক হিসেবে তার পক্ষেই যায় জনরায়। গেল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচিত হওয়ার পর তার ওপর উন্নয়নের চাপ বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে আরিফ পাশে পান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে। বিগত ৫ বছর সিলেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের টাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী। আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘মাত্র আড়াই বছরে আমি উন্নয়ন দিয়ে জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছি। আগামীতে নির্বাচিত হলে দুই বছরও লাগবে না সিলেট নগরীর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেবো।’ এদিকে সিলেটের মানুষ সম্প্রীতির পাশাপাশি উন্নয়নও চায় বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের জেলা সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, সম্প্রীতি হচ্ছে মানসিক বিষয়। সেটি নিজের ব্যক্তিত্ব ও মহত্ত্ব দিয়ে দেখাতে হয়। আবার লোক দেখানো সম্প্রীতিও মানুষ বিশ্বাস করেন না। ফলে শান্তির শহর সিলেটে সম্প্রীতিকে যেভাবে প্রধান্য দেয়া হয় সেভাবেও মানুষ উন্নয়ন চায়। এই দু’য়ের সংমিশ্রণে একজন যোগ্য প্রার্থীকেই বেছে নেবেন ভোটাররা। দুর্নীতিমুক্তকরণ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ জানিয়েছেন, সিলেটের মানুষ একজন স্কয়ার মেয়র চায়। যিনি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে নগরীর উন্নয়ন ঘটাতে পারবেন। আবার সম্প্রীতিকে আঁকড়ে ধরে সিলেটের মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসবেন। এমন মেয়রকেই এবার সিলেটবাসী ভোট দেবেন বলে জানান। পাশাপাশি যিনি সৎ এবং দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে সিলেটের উন্নয়ন ঘটাবেন- এমন মেয়রের জন্য সিলেটবাসী অপেক্ষায় রয়েছে।