পায়ে পায়ে মৃত্যুকূপ

July 26, 2018, 10:39 am নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

১১২৬ কিলোমিটার সড়কের অর্ধেকই অচল। সচল সড়কের পায়ে পায়েও গর্ত। সড়কের পাশের নর্দমাগুলোও যেন ছোট ছোট ডোবা। যেগুলো মৃত্যুকূপ হয়ে হা করে আছে প্রতিনিয়ত। সড়কের এমন দশা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের।

ঢাকার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর হলেও এ যেন এক স্ক্র্যাপ নগরী, এক মৃত্যুপুরী।

আর এর জন্য দায়ী শুধুই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম ওয়াসা। যাদের ক্ষতে প্রলেপ দিতেই প্রায় হিমিশিম খাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।

নগরবাসীর মতে, চট্টগ্রামের প্রতিটি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করেই যাচ্ছে ওয়াসা। পানি শোধনাগার প্রকল্পের পানি সরবরাহের পাইপলাইন স্থাপনের নামে গত ১১ বছর ধরে এই খোঁড়াখুঁড়ি করছে ওয়াসা। ১১ বছর আগে যে সড়ক খুঁঁড়ে পানির পাইপলাইন স্থাপন করেছে তার ক্ষত ও গর্ত এখনও হা করে আছে।

তার ওপর নগরজুড়ে হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাসের প্রকোপের কারণে জন্ডিস ছড়িয়ে পড়ায় স্থাপন করা পানির পাইপলাইন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চলছে পুনঃখোঁড়াখুঁড়ি। তাতে পানির পাইপলাইনে অসংখ্য ফুটো হওয়ার প্রমাণও মিলছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম ওয়াসার যন্ত্রণায় ছটফট করছে চট্টগ্রামবাসী।

এর ওপর আবার ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততম বহদ্দারহাট মোড়, আগ্রাবাদ দেওয়ানহাট মোড়, কদমতলী মোড়, মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত আখতারুজ্জামান উড়াল সড়ক করতে গিয়ে সেই যে সড়ক খুঁড়েছে; তার ক্ষত ও বড় বড় গর্তের ওপর দিয়ে এখনো নগরবাসী চলাফেরা করছে।

উড়াল সড়কগুলোর কাজ শেষ হলেও সড়কগুলোর নালা-নর্দমা, স্যুয়ারেজ, ওয়াসার পাইপলাইন সংস্কারে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে তো চলছেই। উড়াল সড়কের এসব এলাকার একপাশ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সংস্কার করলেও আরেক পাশে বড় বড় গর্ত থাকায় সম্পূর্ণ অচল রয়েছে।

এভাবে চট্টগ্রাম মহানগরীর ১১২৬ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে প্রায় অর্ধেক সড়ক অচল হয়ে পড়ার কথা স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর সবচেয়ে দীর্ঘতম ও প্রধান সড়ক কালুরঘাট-শাহ আমানত বিমান বন্দর সড়ক। সড়কটি ওয়ানওয়ে হলেও একপাশ প্রায় অচল। সড়কটির কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত মৃত্যুকুপে পরিণত হয়েছে।

বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে শুলকবহর, মুরাদপুর থেকে জিইসির মোড় পর্যন্ত এবং আগ্রাবাদ থেকে ইপিজেড পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কের একপাশ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আবার বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার সড়কটির সংস্কার কাজের জন্য প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। নগরীর মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট থেকে বায়েজীদ বোস্তামী পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার, আগ্রাবাদ আখতারুজ্জামান সেন্টার থেকে হালিশহর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার, হালিশহর থেকে পতেঙ্গা নেভাল পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার, কদমতলী থেকে বন্দর সড়কের ১০ কিলোমিটার অকেজো হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, উড়াল সড়ক নির্মাণকাজ ও ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপন কাজের ফাঁকে এসব সড়কের একপাশের গর্ত ভরাট ও কার্পেটিং করে যানবাহন সচল রাখা হলেও মূলত আরেক পাশ বন্ধই রয়েছে। এভাবে নগরীর অর্ধেক সড়ক প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

আর সংস্কার করা সড়কে ওয়াসার পুনরায় খোঁড়াখুঁড়ির কারণে আবারও বড় বড় গর্ত হা করে রয়েছে। গত রমজানের শুরু থেকে চট্টগ্রামের হালিশহরে পানিবাহিত হেপাটাটিস ‘ই’ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওয়াসার পানি সরবরাহ লাইনের সমস্যার কথা বলায় তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এতে কোথাও কোথাও পানি সরবরাহ লাইনে ফুটো থাকার প্রমাণও মিলছে। সবমিলিয়ে ওয়াসার কারণে চট্টগ্রাম মহানগরী এখন মৃতুপুরীতে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, চট্টগ্রামে যানবাহন চলাচলের জন্য যে পরিমাণ সড়ক আছে তা মোটেও কম নয়। কিন্তু এসব সড়কের অর্ধেকই অকেজো। নগরীর প্রধান সড়কগুলো ওয়ানওয়ে হলেও যানবাহন চলছে একপাশ দিয়ে। ফলে নগরীর যানজট কমছে না। বাড়ছে দুর্ঘটনাও।
তিনি বলেন, নগরীর সড়কগুলোর যেখানে চোখ যায় সেখানে গর্ত। ওয়াসা আর উড়াল সড়কে নির্মাণে সৃষ্ট এসব গর্ত এখন মৃত্যুকূপ হয়ে রয়েছে। মঙ্গলবার টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে নগরীর সবকটি সড়ক বহমান নদীতে পরিণত হয়। এ সময় যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে বিভিন্ন সড়কের এসব গর্তে পড়ে বিকল হয়ে যায় দেড় শতাধিক যানবাহন। গর্তে পড়ে স্কুলগামী অনেক ছাত্রছাত্রী তলিয়ে যায়। নাকাল হতে হয় হাজারো নগরবাসীকে। সম্প্রতি আগ্রাবাদে ওয়াসার খোঁড়া গর্তে তলিয়ে যাওয়া এক শিশুকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী জহুরুল হক বলেন, পানির পাইপলাইন স্থাপন কাজে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করলেও কাজ শেষে তা ভরাট করা হয়। কিন্তু বর্ষার কারণে ভরাট গর্ত দেবে গিয়ে আবারও গর্তে পরিণত হচ্ছে। আর বর্ষার কারণে সময়মতো কাজ করতে না পারায় নগরীর কিছু কিছু সড়ক অকেজো অবস্থায় রয়েছে। বর্ষার পর দ্রুতগতিতে এসব সড়কে পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ করে চলাচলের উপযোগী করে তোলা হবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম শহরে চারটি উড়াল সড়কের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। উড়াল সড়কের নিচে সড়কগুলো ও পাশের নালা-নর্দমার নির্মাণকাজ চলছে। এখানে খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে। বর্ষার কারণে এসব সড়কে নগরবাসীর চলাচলে দুর্ভোগে পড়েছেন। বর্ষার পর দ্রুত সব শেষ হবে। এ সময়ে একটু সাবধানে চলাফেরার জন্য নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, চউক এবং ওয়াসার কাজ করার দায়িত্ব যতটুকু তা করে দিলে চসিক সঙ্গে সঙ্গে বাকি কাজ করে দিচ্ছে। চট্টগ্রামকে সচল রাখতে চসিক সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। কিন্তু চউক ও ওয়াসা যথা সময়ে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে না পারায় চট্টগ্রাম মহানগর নরকের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে উভয় কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দেয়া হয়েছে। আবারও দেয়া হবে বলে জানান তিনি।