রাজশাহীর নির্বাচনে যা হচ্ছে

July 26, 2018, 10:51 am নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আর মাত্র ৪ দিন বাকি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন সমান্তরাল মাঠ পেয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠের দখল পেতে বেগ পেতে হয়নি তাকে। প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধান ঘুচিয়ে বিজয়মালা পরবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছে দলটি। বিপরীতে বিএনপিকে বন্ধুর পথের চড়াই-উতরাই মাড়িয়ে এগুতে হচ্ছে। বাধা-বিঘ্নের মধ্যেও তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ মিলছে।

নিত্যনতুন মামলা, তৃণমূল থেকে শীর্ষ স্থানীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে ছন্দ হারালেও থেমে থাকছে না। তা কাটিয়ে উঠার চেষ্টায় মাঠে কাজ করছে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। যে ওয়ার্ডগুলোতে ধড়পাকড় বাড়ছে সেখানে ছোট ছোট টিম করে দলীয় ম্যাসেজ ভোটারদের দিতে সফল হয়েছে বিএনপি। মনোবল অটুট বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করতে ১ লাখ ৪০ হাজার ধানের শীষের ভোট ব্যাংক ফ্যাক্টর হবে। ধীরে চলো নীতিতে অনেকটাই গুছিয়ে ফেলেছে দলটি। তবে দিন যত পার হচ্ছে মামলার খড়গ তত বাড়ছে। গত রাতেই বিএনপির ২০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের নামে শহরে কোনো মামলা চলমান না থাকায় নাটোর, পাবনা ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায় নিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এর আগে নেতাকর্মীদের পুলিশ ও ডিবি আটক করে জেলার পুঠিয়া ও গোদাগাড়ীতে গ্রেপ্তার দেখায়।

বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের দলীয় ভোট নিশ্চিত করতে প্রায় প্রতিটি পথসভায় সুযোগ মতো চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু করজোড়ে হাত তুলে বলছেন, ‘আমি আপনাদের সন্তান, আমার ছোট ভাই বুলবুল যদি জানা-অজানায় কোনো ভুল করেন তার জন্য আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।’ ‘তাকে ঠিকমত দায়িত্ব পালন করতে দেয় নি বর্তমান সরকার, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও তাকে আবার ভোটটা দেন।’
রাজশাহী জেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিউজ্জামান পরাগ বলেন, ‘ভোটের সময়ে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে রেকর্ড পরিমাণে বিএনপির উপর দমন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। আশেপাশের জেলাগুলোতেও হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে। যা গাজীপুর ও খুলনা নির্বাচনেও ঘটেছে কি না সন্দেহ আছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদককে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। নতুন করে কিছু নেতাকে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে আশার দিক হলো, এবার ভোট হচ্ছে ধানের শীষ প্রতীকে। ধানের শীষের ভোট কোনোদিন নৌকায় পড়ে নি, পড়বেও না। মানুষকে বাধ্য করে নৌকার প্রচারণায় হয়তো নামাতে পেরেছে। কিন্তু ভোট ধানের শীষ প্রতীকেই পড়বে। আমরা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’

বিএনপি নেতৃবৃন্দের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণার পাশাপাশি কয়েকটি ওয়ার্ডে রাজশাহীবাসীর কাছে পরিচিত মুখ এমন সব কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নগরীর ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য চারঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ চাঁদ স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক ডাক টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রচারণা চালান। আছেন চাঁপাই নবাবগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুর-অর-রশিদের মতো শীর্ষ নেতারা। গতকাল নগরীর ১৩ ও ২০নং ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন বিএনপি ২০ দলীয় জোট প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

এ সময় মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, রাজশাহীতে সরকারদলীয় প্রার্থীর নির্দেশে ছাত্রলীগ যুবলীগ অঙ্গসহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা বিএনপির গণসংযোগ ও পাড়া মহল্লায় নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন এবং নারী কর্মীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। এ নিয়ে রাজশাহী নির্বাচন কমিশনে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। যুবলীগ-ছাত্রলীগের সূর্যসন্তানদের অত্যাচারে অনেক মেয়ে পড়ালেখা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। অনেক শিক্ষক অবসর এবং ছাত্রলীগের নারীনেত্রীদের মিথ্যা ও প্রহসনের গুজবে অনেক শিক্ষক এখন কারাগারে এবং অনেক শিক্ষক আত্মহত্যা করেছে। ছাত্রলীগের নারীনেত্রীরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মিথ্যা অভিযোগ এনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কলুষিত করছে। তারা মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে আয় করছে। অথচ পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার না করে যারা সাধারণ মাদক সেবন করে তাদের ধরে গ্রেপ্তার বাণিজ্য করছে। ফলে এই শহরের আসল মাদক ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের প্রচারণা একই হারে চলছে। প্রতীক বরাদ্দের আগে থেকেই তিনি ভোট প্রার্থনায় এক ধরনের সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। প্রতিদিনই স্থানীয় আওয়ামী লীগ, থানা, ওয়ার্ড ও মহানগর পর্যায়ের নেতাকর্মীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শিক্ষক ফোরাম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপকমিটির সদস্য মসিউর রহমান কয়েকদিন ধরে নৌকা প্রতীকের প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি জানান, ‘সারা দেশে আওয়ামী লীগের উন্নয়নের জোয়ার বইছে, সেই জায়গা থেকে রাজশাহীবাসী বঞ্চিত হতে চায় না। তাই আওয়ামী লীগের প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটনকে বেছে নেয়ার জন্য সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছে। ভাসমান ভোটারদের মাঝে কাজ করে আমরা সেই প্রত্যাশা তাদের কাছে পেয়েছি।

ওদিকে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ১১ নম্বর ওয়ার্ড হেতেম খাঁ চৌধুরী পুকুর এলাকায় বিএনপির নির্বাচনী অফিসে ২০টি মোটরসাইকেল নিয়ে মহানগর ছাত্রলীগ সেক্রেটারির নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা হামলা-ভাঙচুর চালায় এবং নারীকর্মীদের লাঞ্ছিত করে। ওইদিন ২৯ নম্বর জাহাজঘাট এলাকায় বিএনপির নির্ধারিত নির্বাচনী পথসভার দুই পাশের নৌকা প্রতীকের প্রচার মাইক বাজিয়ে বিঘ্নের সৃষ্টি করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ-যুবলীগ। ৪০/৫০ জন আওয়ামী-যুবলীগের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু, মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল তাদের প্রচার মাইক দিয়ে দূরে যাওয়ার অনুরোধ করলেও তারা তা শুনেন নি। খবর পেয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার উপস্থিত হলে তার সামনেই তার দলীয় নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকে। তারা যেকোনোভাবে বিএনপির পথসভাগুলোকে ভুল করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
মহানগর বিএনপির দপ্তর সম্পাদক নাজমুল হক ডিকেন এসব অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, আওয়ামী লীগের বাড়াবাড়ি রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে অতিক্রম করেছে। সাধারণ মানুষও তাদের উপর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। শান্তিপ্রিয় নগরবাসী আওয়ামী লীগকে ইতিমধ্যে বয়কট করেছে। তা তারা বুঝতে পেরে মরিয়া হয়েছে উঠেছে। ১১ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর করে তারা ক্ষান্ত হয়নি আজ আবার অফিসটির দখল নেয় ছাত্রলীগ মহানগর সেক্রেটারি রাজীবসহ তার অনুসারীরা।

মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক উপাধ্যক্ষ কামারুজ্জামান জানান, রাজশাহী সিটি বিএনপি-জামায়াতের দলীয় ভোট সর্বোচ্চ হলে ৭৫ হতে ৮০ হাজার। ৬০ হতে ৭০ হাজার ভোটই ভাসমান। বর্তমানে খুলনা ও গাজীপুর নির্বাচনের প্রভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে সিটি নির্বাচনে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। মানুষ মেয়র হিসেবে বুলবুলের ব্যর্থতা দেখেছে। সেদিক থেকে খায়রুজ্জামান লিটন উজ্জ্বল। দলীয় ভোটের বাইরে তিনি নিজস্ব ১৫/২০ হাজার ভোট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। যা আমাদের বিজয়ী হয়ে আসতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।