অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘটে বিচ্ছিন্ন চট্টগ্রাম

August 4, 2018, 4:30 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

 

   বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শনিবার পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আজ শুক্রবার চট্টগ্রামের কোথাও শিক্ষার্থীদের দেখা যায়নি। তবে এ সুযোগ চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন টার্মিনালে দূরপাল্লার বাস রেখে আশপাশের সড়কে অবস্থান নিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

 

পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা চট্টগ্রাম থেকে রাজধানীসহ দূরের জেলাগুলোর যোগাযোগ সড়কপথে যানবাহন চালানো বন্ধ রেখে চট্টগ্রামকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এ নিয়ে ঢাকাসহ দূরের জেলায় যাতায়াতকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।  

 

বৃহস্পতিবার পড়ন্ত বিকালে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে মূলত পরিবহন শ্রমিকরা চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়।
তবে তা ছিল অঘোষিত। আজ শুক্রবার সকাল থেকেও বাস চলাচল প্রায় বন্ধ রেখে সড়কে অবস্থান নেয় পরিবহন শ্রমিকরা।

 

নগরীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে শ্রমিকরা আলাপকালে জানান, শুক্রবার ভোর থেকে নগরীর সিনেমা প্যালেস ও অলঙ্কার মোড় থেকে ঢাকামুখী দুয়েকটি বাস ছেড়ে যায়। অক্সিজেন এলাকা থেকে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটির উদ্দেশে বাস ছেড়ে গেলেও তা অন্যদিনের তুলনায় অনেক কম। শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে কক্সবাজারমুখী বাস চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। বান্দরবান জেলার উদ্দেশ্যেও কোনো যানবাহন ছাড়ছে না।

 

নগরীর অলঙ্কার মোড়, সিনেমা প্যালেস, দামপাড়া, অক্সিজেন, কদমতলী, শাহ আমানত সেতু এলাকায় স্ট্যান্ড-টার্মিনালগুলোতে দূরপাল্লার বাসগুলোকে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অলঙ্কার মোড়ে কয়েকশ শ্রমিককে রাস্তায় দেখা গেছে। তবে তারা কোন সমাবেশ-মিছিল করছে না।

 

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান বলেন, প্রত্যেক টার্মিনালের আশপাশে শ্রমিকরা আছেন। তবে অলঙ্কার মোড়ে একটু বেশি। শ্রমিকরা কোথাও অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটাননি। কিন্তু চট্টগ্রামের সঙ্গে যে পাঁচটা সংযোগ মহাসড়ক আছে সেগুলোতে বাস চলাচল করছে না। পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক আছে।

 

তিনি বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিক কোনো ধর্মঘটের ঘোষণা দেননি। তবে জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মুছা সাহেব আমাকে জানিয়েছেন, কেন্দ্র থেকে তাদের গাড়ি না চালানোর জন্য বলা হয়েছে।

 

এই বিষয়ে কথা বলার জন্য মো. মুছার মোবাইলে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে পূর্বাঞ্চলীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক     
ফেডারেশনের সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেছেন, কেন্দ্র থেকে শ্রমিকদের বাস না চালানোর কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বরং, শ্রমিকদের বলা হয়েছে জনগণকে জিম্মি না করতে এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোন ধরনের সংঘাতে না জড়াতে।

 

তিনি বলেন, শ্রমিকরা হয়তো রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ এই গাড়ি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে দায়ভার কে নেবে? তারপরও আমরা বলছি, যদি শ্রমিক ভাইয়েরা মনে করেন, রাস্তায় গাড়ি নিয়ে গেলে কোন সমস্যার সম্মুখীন হবেন না, তাহলে তারা যেন অবশ্যই গাড়ি চালান।

 

আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির মহাসচিব কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সড়কে গাড়ি থামিয়ে লাইসেন্স চেক করা হচ্ছে। গাড়ির ডকুমেন্ট চেক করা হচ্ছে। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ দেখলেই হয়রানি করছে। আবার যে আবেদন করা হয়েছে, সেটা বললেও শুনতে চাচ্ছে না। ডকুমেন্টে কিছু একটা পেলেই হয়রানি করা হচ্ছে। সেটা বোঝানোর সুযোগ দিচ্ছে না। এক ধরনের অরাজকতা চলছে। এই অবস্থায় আমরা তো গাড়ি রাস্তায় নামাতে পারি না। শ্রমিকরাও তো ভয়ে গাড়ি চালাতে চাচ্ছে না।

 

নগরীর সিনেমা প্যালেস এলাকায় ইউনিক বাস কাউন্টারের কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, রাতে ঢাকায় একটা এবং কক্সবাজারে একটা বাস গেছে। ভোরে ঢাকায় গেছে একটা। কক্সবাজারে কয়েকটা গেছে। এখন আর বাস ছাড়ছে না। শ্রমিকরা ভয়ে বাস চালাতে চাচ্ছেন না বলে দাবি এই কর্মকর্তার।

 

সরজমিন দেখা যায়, নগরীর গরীবউল্লাহ শাহ, বিআরটিসি, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন বাস কাউন্টার, অক্সিজেন বাস স্ট্যান্ড, অলংকার মোড় বাস স্ট্যান্ডসহ নগরীর বিভিন্ন অস্থায়ী বাস কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। সবাই আটকা পড়েছে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের এই আকস্মিক কর্মবিরতিতে।


সরকারি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় যাওয়ার জন্য বৃহসপতিবার দুপুরে দামপাড়ায় কাউন্টারে যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু রাসেল রাহাত। বাস স্বল্পতায় বিপাকে পড়েন তিনি। সন্ধ্যার পর একটি বাসে উঠেন। সেটি রাতে ছেড়ে যায়। ভোরে পৌঁছে সরাসরি পরীক্ষার কেন্দ্রে চলে যেতে হয়েছে তাকে।

 

ঢাকা থেকে রাহাত মুঠোফোনে বলেন, কোনমতে ঢাকায় পৌঁছালেও এখন এখানে আটকে গেছি। ট্রেনের টিকিটের চেষ্টা করছি। কিন্তু সেখানেও চাপ বেশি বলে শুনতে পাচ্ছি। রোববার আমার প্রাইমারি স্কুলের মৌখিক পরীক্ষা আছে। কিভাবে চট্টগ্রামে যাব বুঝতে পারছি না।

 

সমপ্রতি ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং নৌপরিবহন মন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে রাজধানীতে আন্দোলন শুরু করেছেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। রাজধানী অচলের পাশাপশি বৃহসপতিবার চট্টগ্রাম মহানগরীতেও বড় আকারে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।