যানজট নিরসনে আনিসুল হকের পরিকল্পনা কতটুকু এগিয়েছে?

August 18, 2018, 5:23 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

 

   নগর পরিবহনের বিশৃঙ্খলা নিরসনে নতুন ৪ হাজার বাস নামানোসহ পরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। পুরো নগর পরিবহনকে মাত্র ৬টি কোম্পানির আওতায় আনতে চেয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী একটি কনসালটিং প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে মাঠ পর্যায়ের জরিপ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অবকাঠামোগত ডিজাইনও তৈরি করেছিলেন। তবে তার মৃত্যুতে সবকিছু থমকে যায়। এরই মধ্যে রাজধানীর কুর্মিটোলায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় তৈরি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আবার সামনে আসে আনিসুল হকের পরিকল্পনা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন নগর পরিবহনগুলোকে ৬টি কোম্পানির অধীনে চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


বিআরটিএর তথ্যমতে রাজধানীতে ৩২০টি রুটে ২৪৬টি কোম্পানির ৮ হাজার বাস চলাচল করে।
তবে বাস্তবে যানবাহনের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। আনিসুল হক জীবিত থাকা কালীন নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেন। পরে তার অনুয়ায়ী ‘বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা’ নামে একটি প্রকল্প তৈরি করে গত বছর ৩১শে মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি অনুমোদন করে ফাইল সই করেন। একই সঙ্গে মেয়র আনিসুল হককে নির্দেশ দেন প্রকল্পটির বিস্তারিত পরিকল্পনা, নকশা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিসহ সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করার। নির্দেশ অনুযায়ী তিনি একটি কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ২ বছর ধরে মাঠ পর্যায়ের জরিপ ও সক্ষমতা যাচাই করেছিলেন। একই সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে প্রকল্পের ডিজাইন সম্পন্ন করেন।


সবশেষ নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে থমকে থাকা প্রকল্পটি আবার বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধামন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। এর পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গত ৬ই আগস্ট মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন প্রকল্পটি নিয়ে। যাতে বুয়েটের স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরিবহন বিশেষজ্ঞছাড়াও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পটি যাচাই বাছাইসহ কিভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যায় সে বিষয়ে ওই কমিটি কাজ করবেন। এর পর এটি নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। এ বিষয়ে জানেন না ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রও।


নগর পরিবহনগুলোকে একীভূত করার জন্য মেয়র আনিসুল হক বাস মালিক সমিতির নেতাদের নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী- ঢাকার বাইরে থেকে আসা দূরপাল্লার গাড়ি যেন ঢাকায় প্রবেশ করে যানজট তৈরি করতে না পারে সে জন্য আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। এর জন্য নতুন করে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল তৈরির জন্য শিমরাইল/চিটাগাং রোড, আব্দুল্লাহপুর ও ঝিলমিলে জায়গা নির্ধারণ করেন। সবার চলাচল ও ট্রিপের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে যানবাহনের সংখ্যা ও ধরণ আলাদা করা। স্বল্প খরচে নিরাপদে এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে সেবাদাতাদের ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করা। ভবিষ্যৎ বাস সার্ভিসকে বড় কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসা এবং মালিকানা বণ্টন করে দেয়া। ভিন্নি রুটে যাত্রী সংখ্যা ও ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মানের বাস সার্ভিস চালু করা। সকল বাস কোম্পানি ৬টি বড় কোম্পানির আওতায় আনা এবং ২২টি রুটে চলাচল করা। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং তদারকির জন্য বোর্ড গঠন। স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা। ৬টি বাস কোম্পানির বাসে রঙ- কমলা, নীল, মেরুন, গোলাপী, বেগুনি ও সবুজ নির্ধারণ করা। রঙ অনুযায়ী রুটের সংখ্যার অনুপাতে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করেন তিনি। এসব কিছু করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বাস কোম্পানিগুলোকে একীভূত করার কর্মপরিকল্পনা ও মাঠ পর্যায়ের জরিপ সম্পন্ন করেন।


প্রকল্পটির মাঠ পর্যায়ের জরিপকারী কনসালটিং প্রতিষ্ঠানের চিফ এডভাইজার ড. এস এম সালেহউদ্দিন মানবজমিনকে জানান, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক জীবিত থাকা কালীন তার নির্দেশে আমরা যে ডিজাইন তৈরি করেছিলাম তার উপর সরকার একটি কমিটি করেছে। এতে বিআরটিএ, বিআরটিসি, বুয়েটের স্থপতি, প্রকৌশলী, সরকারি কর্তৃপক্ষ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ রয়েছে। ওই কমিটিতে আমাকেও রাখা হয়েছে। গত ৬ই আগস্ট মন্ত্রণালয়ে মিটিং করেছে। আরো মিটিং করবে। প্রকল্পটি বাস্তাবায়নের কাজ কিভাবে হবে সেগুলো নিয়ে কাজ করবে। তিনি বলেন, ৬ টি কোম্পানি করা, কোম্পানির নীতিমালা তৈরি, রুট বিন্যাস, পার্কিং, চালকদের ট্রেনিং, টিকিটিং সিস্টেম পাল্টানো, গাড়ি কিভাবে প্রতিস্থাপন হবে, নতুন গাড়ি কিভাবে আসবে, গ্রাউন্ড লেভেলের ট্রাফিক সিস্টেম কিভাবে উন্নত হবে সেগুলো স্পষ্ঠভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এছাড়া, মালিকরা আমাদের সঙ্গে বহুবার বসে ১৮ পয়েন্টের সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও তাদের ঋণ সুবিধাগুলো কিভাবে হবে সেগুলোও আমাদের দেয়া পরামর্শ ও ডিজাইনে উল্লেখ করা হয়েছে। একেবারে পুর্ণাঙ্গ একটা ব্যবস্থা তৈরী করে দেয়া হয়েছে। কোথায় কোথায় ডিপো হবে, টার্মিনাল হবে, কোথায় বাস স্টপেজ হবে এগুলোর সব এখানে বলা আছে। সুতরাং নতুন করে পরিকল্পনা রচনা করার কোন যৌক্তিকতা দেখছিনা। তবে এটাকে ইমপ্রুভ বা যোগ বিয়োগ করা যায়। কিন্তু আবার নতুন করে জরিপ চালালে সময় নষ্ট হবে। আবার দুই বছর চলে যাবে। তিনি বলেন, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের নির্দেশে আমরা বিনা পয়সায় কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছি। আমাদের পক্ষ থেকে যতোটুকু করার তা করে দিয়েছি। এখন বাকি কাজ আমাদের দিয়ে করালে ভালো। না হলেও সমস্যা নেই। নতুন করে গবেষণা করলে সময় নষ্ট হবে।


ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন জানান, ৬ কোম্পানির আওতায় নগর পরিবহন পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর এটি বাস্তবায়ন নিয়ে চলতি মাসে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। সেখানে সিনিয়র পর্যায়ের কোন বৈঠক এখনো হয়নি। প্রকল্পটি আমাকে দিয়ে বাস্তবায়ন করানো হবে কিনা সে বিষয়ে এখনো কিছু বলা হয়নি।