যা থাকছে দেশের প্রথম শিশুবান্ধব আদালতে

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

প্রচলিত আদালত ব্যবস্থায় বিভিন্ন অপরাধের আসামির সঙ্গে বিচার করা হয় শিশুদেরও। এতে শিশুর মনোবিকাশে বিরূপ প্রভাব পড়ে। একারণে শিশু আইনে তাদের জন্য পৃথক আদালত গঠনের সুপারিশ করা হয়। শিশু আইন অনুসারে এবং সুপারিশের আলোকে দেশে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়েছে শিশুবান্ধব আদালত কক্ষ।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, থানা কিংবা আদালত অঙ্গনে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছে ‘সুপ্রিম কোর্ট স্পেশাল কমিটি ফর চাইল্ড রাইটস’। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী এই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঁচ সদস্যের এই স্পেশাল কমিটিকে সার্বিক সহযোগিতা করছে ইউনিসেফ। শিশু আইন অনুসারে দেশে শিশুবান্ধব আদালত স্থাপনে  ২০১৭ সাল থেকেই স্পেশাল কমিটি ও ইউনিসেফ যৌথ উদ্যোগে কাজ করছে।  

শিশুবান্ধব আদালত গঠনে আইনে যা বলা হয়েছে

২০১৩ সালে প্রণীত শিশু আইনের ১৭ (১) ধারায় বলা হয়েছে— ‘আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু বা আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু কোনও মামলায় জড়িত থাকলে, যেকোনও আইনের অধীনেই হোক না কেন, উক্ত মামলার বিচারের এখতিয়ার কেবল শিশু আদালতের থাকবে।’

আদালতের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে আইনটির ১৯ (৪) ধারায় বলা হয়েছে— ‘অন্য কোনও আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, শিশু-আদালতে শিশুর বিচার চলাকালীন, আইনজীবী, পুলিশ বা আদালতের কোনও কর্মচারী আদালত কক্ষে তাদের পেশাগত বা দাফতরিক ইউনিফর্ম পরিধান করতে পারবেন না।’

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ব্যারিস্টার মো. সাইফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৩ সালের শিশু আইনের আলোকে শিশুবান্ধব আদালত গড়ে তোলার নির্দেশনা ছিল। আইন অনুসারে পৃথকভাবে প্রতিটি থানায় শিশু বিষয়ক ডেস্ক এবং আদালতে শিশুবান্ধব কক্ষ গড়ে তোলার বিষয়ে বলা আছে। সেখানে ঘরোয়া পরিবেশে শিশুদের বিচার করতে বলা হয়েছে, যেন শিশুটি বুঝতে না পারে যে, তার বিচার হচ্ছে। সেই নির্দেশনা অনুসারেই দেশে প্রথমবারের মতো শিশুবান্ধব আদালত গড়ে তোলা হয়েছে। এই আদালতের বিচারক ও আইনজীবী আদালতের প্রচলিত কালো কোর্ট বা গাউন পড়বেন না। আদালতের ভেতরে শিশুর নিকটাত্মীয় অবস্থান করতে পারবেন। এ আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরাও সাধারণ পোশাকে থাকবেন। এর ফলে শিশুদের মনে আদালত সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পড়বে না বলে মনে করছি।’

সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত সারাদেশের শিশু আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা মোট ২১ হাজার ৫০৩টি। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় বিচারাধীন রয়েছে একহাজার ১২৪টি মামলা।

যা যা থাকছে শিশুবান্ধব আদালতে

শিশু আইন  প্রণয়নের আগে লাল সালু মোড়ানো আদালত কক্ষে শিশুদের বিচার করা হতো। কিন্তু আইন প্রণয়নের পর শিশুদের বিচার হয়ে আসছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। তবে শিশুবান্ধব আদালত কক্ষে থাকছে প্রচলিত আদালত ব্যবস্থার থেকে একেবারেই ভিন্ন পরিবেশ।

শিশুদের মানসিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশে এই প্রথম শিশুবান্ধব আদালত গড়ে তোলা হয়েছে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে এই আদালতটি। আদালতের প্রতিটি কক্ষ শিশুসুলভ চিত্রকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে। সেখানে রয়েছে শিশুদের জন্য পরিচর্যা কেন্দ্র ও ওয়েটিং রুম। শিশুদের উপযোগী চেয়ার-টেবিল ও টয়লেট তো আছেই। শিশুদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের-পরিজনের জন্য রয়েছে একটি ওয়েটিং রুম। এছাড়া, আদালতটিতে সমাজসেবা অধিদফতরের প্রবেশন কর্মকর্তার জন্যও একটি কক্ষ রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী আব্দুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। তাই এ মহৎ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে প্রত্যেক জেলায় শিশুবান্ধব আদালত কক্ষ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে শিশু আইনের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যাবে।’

সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘শিশু আইন অনুসারে ঢাকায় প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে শিশু আদালত কক্ষ স্থাপিত হয়েছে। তবে আইনের নির্দেশনা ছিল দেশের সব জেলায় অন্তত একটি করে শিশু আদালত স্থাপন করা। তাই ঢাকাতে শিশু আদালতের সফলতা মিললে পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলাতেই এ ধরনের শিশুবান্ধব আদালত গড়ে তোলা হবে।’

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১২ আগস্ট মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে দেশের প্রথম শিশুবান্ধব আদালত কক্ষের উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আদালতটির উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে শিশু আদালত কক্ষ স্থাপিত হওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। শিশু আদালতের জন্য পৃথক আদালত কক্ষ স্থাপনের কারণে শিশুবান্ধব পরিবেশের মধ্যে বিচারকার্য করা সম্ভব হবে।’