দুর্ঘটনায় আহতদের আর্তনাদ

August 26, 2018, 3:09 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

কদিন আগের কথা। দুপুর ১টা ২২ মিনিট। ছুটির দিন হলেও রাস্তার যানজট চোখে পড়ার মতো। পঙ্গু হাসপাতালের সি-ডি রুমে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল ১৩ বছর বয়সী এক বালকের দিকে। বাম হাত কনুইয়ের নিচ থেকে আর বাম পা কোমরের নিচ থেকে কাটা। ডান পায়ের গোড়ালিতে পচন ধরেছে।

 

এতকিছুর পরও থেমে নেই ওমর ফারুক রিপন। কীভাবে এমন হলো জানতে চাইলে ডান হাতে মাস্টার চাচার কিনে দেয়া সাদা ফোনের বাটন টিপতে টিপতে রিপনের উত্তর ট্রেনে কাটা পড়ে এমনটা হয়েছে। উত্তরা থেকে চট্টগ্রামগামী এক ট্রেনের ছাদে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন। স্বপ্নের ভেতরে পল্টি খেতে খেতে বাস্তবে চোখ খুলে দেখে রেল লাইনের পাশে তার কাটা পড়া বাম পা’টা গলাকাটা মুরগির মতো লাফাচ্ছে। বাম হাতের সবগুলো আঙ্গুল ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। হাতে মাংস বা চামড়া বলতে কিছুই ছিল না। ডান পায়ের গোড়ালির সব মাংস রেল লাইনের ফিশপ্লেটই খেয়ে নিয়েছে। জানাল এক স্কুল মাস্টার তাকে নিজ দায়িত্বে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করেছেন সাড়ে ৭ মাস আগে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেলে মা শাহিনূর বেগম মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করে দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বেঁচেবর্তে ছিলেন। তবে শান্তি ছিল না শাহিনূরের মনে। প্রতিদিন কম হলেও ডজন দুয়েক বিচার আসতো তার এই চঞ্চল রিপনের নামে। একে চিমটি তো ওকে লাথি। এর ছাগলের পা ভাঙলো তো ওর গরুর গায়ে ঢিল ছুড়লো। বড়রা পর্যন্ত রেহাই পেত না তার দুষ্টুমি থেকে। এক সময় বিরক্ত হয়ে জীবন সংগ্রামে ত্যক্ত মা রিপনকে বেদম পিটুনি দেয়। মায়ের পিটুনি খেয়ে ৫ বছর আগে ঘর ছেড়েছে রিপন। আর ঘরে ফেরা হয়নি তার। নিখোঁজ ছেলেকে কোথাও খোঁজেননি রিপনের মা। অতঃপর গত ১৫ দিন আগে রিপনকে উদ্ধারকারী স্কুল মাস্টার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিপনের ছবি দিয়ে তার মাকে খুঁজে বের করেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে পান বিড়ির হকারি করতো ছোট্ট রিপন। বাম হাত কেন কেটে ফেলতে হলো জানতে চাইলে রিপন বলে, ওই সময় আমার সঙ্গে কোনো অভিভাবক ছিল না তাই ডাক্তাররা ঝামেলা এড়াতে হাতটাই কেটে ফেলেছে। ডান পায়ের মাংসে পচন ধরায় দুর্গন্ধে রিপনের বেডের কাছে কোনো লোকই দাঁড়াতে পারে না। এখন পা নিয়মিত পরিষ্কার ও ড্রেসিং করেন তার মা। সুস্থ হয়ে কি করবে, কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে জানতে চাইলে রিপন বলে, জানি না! রিপনের মা দুচোখ ভর্তি শূন্যতা নিয়ে অন্যদিকে মুখ করে বললো এ জীবনে আর সুখের মুখটা দেখা হলো না আমার!

 

৪-৫টা বেডের পরেই দেখা গেল এক নারীর দুটি পা-ই নবজাতক বাচ্চাদের মতো মশারি দিয়ে ঢাকা। কাছে যেতেই দেখা গেল মাঝবয়সী নারী প্রচণ্ড ব্যথায় আর্তনাদ করছে। পাশে ৫ বছর বয়সী এক মেয়ে ও তার মা বসে আছেন। বরিশালের গৌরনদীর মেয়ে শারমিন। বয়স ৩০-৩২ হবে। প্রায় এক যুগ আগে বিয়ে হলেও তিনটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়ার পরপরই স্বামী তার তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে ফেলে অন্যত্র চলে যায়। জীবন সংগ্রামে জর্জরিত শারমিন তিন মেয়ে ও নিজের পেটের তাগিদে ৪-৫ বছর আগে ঢাকা শহরে পাড়ি জমায়। তেমন কোনো উপায়ন্ত না পেয়ে অবশেষে বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেয়। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে শারমিন সবার বড়। বাবা খুব ছোট বেলায় মারা যাওয়ার পর মা-ই তার একমাত্র অবলম্বন। তিন মেয়েকে মায়ের কাছে রেখে খেয়ে না খেয়ে টাকা উপার্জন করতো শারমিন। ভালোই চলছিল তাদের মা মেয়ের ছোট্ট সংসার। কিন্তু হঠাৎই যেন তার চারপাশটা অন্ধকারে গ্রাস করে। গত রমজানের ঈদে মেজ মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে অনেকটা যুদ্ধ করেই ফিরে এসেছে শারমিন। বাসের সামনের দিকে থাকা সব যাত্রীই কম বেশি হতাহত হয়েছে। শারমিনের দুই পায়ের হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। মেয়ের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগে ব্রেইনে রক্ত জমে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা করালেও টাকার জন্য ব্রেইনে জমে থাকা রক্ত আর অপারেশন করে বের করা হয়নি। এদিকে শারমিনের বাম পায়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ বার অপারেশন হয়েছে ডান পায়ে হয়েছে এক বার। এখন দুই পায়েই রড দিয়ে সোজা করে রেখেছে ডাক্তার। চিকিৎসার অর্থ কোথায় পাচ্ছেন জানতে চাইলে শারমিনের মা বলেন, আমরা গরিব মানুষ। মাদরাসা-মসজিদ, বাস টার্মিনাল ও গ্রামে গ্রামে এর ওর কাছ থেকে সাহায্য চেয়েই চলছে মেয়ের চিকিৎসা। প্রথমে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করালে অবস্থার আরো অবনতি হওয়ায় পঙ্গুতে রেফার করেন ডাক্তাররা। সুস্থ হয়ে শারমিন কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে কিংবা আদৌ শারমিন সুস্থ হবে কিনা জানে না তার পরিবার।

 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস ইউনিটে ঢুকতেই ওয়ার্ডের বাইরে দু’পাশে বেশকিছু রোগীকে বেডে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। ওয়ার্ড-১১৫ বেড-২০। হাতের বামে মোড় নিতেই দেখা গেল ১৯ বছরের এক যুবক ও আল্লাহ, ও বাবা, ও মাগো বলে চিৎকার করছে। পাশেই মা শিউলি বেগম ছেলের চিৎকার সহ্য করতে না পেরে কান্না করছেন। মাথায় ও মুখে ব্যান্ডিস। পায়ে লোহার রড ভরা হয়েছে। তার চেয়ে বয়সে বড় চাচাতো ভাই সান্ত্ব্তনা দিচ্ছেন। সজীব হাওলাদার। পেশায় একজন ট্রাক চালক। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে মালবাহী ট্রাক চালান তিনি। গত ১২ই আগস্ট ঢাকার মদনপুরে ট্রাক থেকে মাল নামিয়ে ট্রাকে ওঠার সময় পেছন থেকে একটি পিকআপ ভ্যান ধাক্কা মারে। এতে তার বাম পা ভেঙে যায়। এবং মাথা ও মুখের বেশকিছু স্থানে গুরুতর জখম হয়। গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জ থানায়। তিন ভাই বোনের মধ্যে সজীব সবার বড়। দুই ভাই বোনকে নিয়ে বাবা-মা বরিশালে থাকেন। সংসারের হাল ধরতে খুব ছোট সময়ই গাড়ির হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১ বছর হলো চালক হিসেবে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেছেন। ছেলে চালক হয়ে পরিবারে যে অল্পকিছু টাকার জোগান দিতেন তাই দিয়ে কোনোরকম বেঁচেবর্তে আছে এই দরিদ্র পরিবারটি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডাক্তাররা বলেছেন সজীবকে পুরোপুরি সুস্থ হতে মাসখানেক সময় লাগবে। সজীবের মা শিউলি বেগম চক্ষুলজ্জায় হাত পেতে কারোর কাছে সাহায্য না চাইলেও চোখভর্তি কেবলই আকুতি। বারবার ছেলের জন্য দোয়া করতে অনুরোধ জানান এই হতভাগা মা।

 

১৬নং বেডে দু’পা টান করে পিঠে বালিশের ঠেকা দিয়ে বসে আছেন ৭০ ঊর্ধ্ব মুনসুর হাওলাদার। বুকের ডান পাজরে ব্যান্ডেজের মধ্যে দিয়ে একটি পাইপ বেরিয়ে আছে। পাইপের মধ্যে দিয়ে হালকা লাল তরলজাতীয় পদার্থ বের হয়ে একটি স্যালাইনের প্যাকেটে জমা হচ্ছে। পাশেই বড় মেয়ে ও জামাই বসে খাবার খাচ্ছেন। কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটলো জানতে চাইলে মুনসুর হাওলাদার বলেন, কপালের দোস। শেষ বয়সে এতটা ভোগান্তি পোহাতে হবে কে জানতো। ঢাকার কেরানিগঞ্জ তেলঘাট এলাকায় একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন তিনি। গত শনিবার দুপুরে রিকশাযোগে দোকানের মালিকের জন্য খাবার আনতে যাচ্ছিলেন এমন সময় ঘাতক বাস এসে পেছন থেকে বাড়ি মারলে রিকশাসহ উল্টে পড়ে ডান পাঁজরে গুরুতর আঘাত পান। এবং ডান পা’টা ভেঙে যায়। বুকের অপারেশন হয়েছে। পরিবার নিয়ে কেরানিগঞ্জে ভাড়া বাসায় থাকেন। ধার-দেনা করে বুকের অপারেশন করিয়েছেন। কাপড়ের দোকানে কাজ করে যে টাকা বেতন পেতেন তা দিয়ে কোনোমতে বুড়ো বুড়ির সংসার চলে যেতো। বৃদ্ধ মুনসুরের আত্মসম্মান এতোটাই প্রকট যে ছেলে মেয়েদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে এই বয়সেও কাপড়ের দোকানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।   
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে শত শত মানুষের নাম। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন সারা দেশে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৬৪ জন। আহতের সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। আহতদের বেশিরভাগকেই বরণ করতে হয় আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব। স্বাভাবিক কর্মক্ষম অবস্থায় তারা আর কখনো ফিরতে পারেন না। এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভয়ঙ্কর সব তথ্য দিয়েছে। তারা বলেছ, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিরূপণ করা গেলেও যারা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান, তাদের হিসাব কেউ রাখে না। প্রতিদিন এত সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে তেমন কোনো প্রভাব পড়তে দেখা যায় না। ছোটখাটো দুর্ঘটনা নিয়ে কোনো আলোচনা-সমালোচনা তেমন হয় না। বাংলাদেশের সড়ক এখন মৃত্যুপুরী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) হু এর প্রতিবেদনে তা ফুটে উঠেছে। তাদের রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিশাল অঙ্কের। সড়ক দুর্ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটিতে ক্ষতি হয় মোট জিডিপির ১ দশমিক ৬ ভাগ। আর বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ যায় ১২ হাজারের অধিক। আহতের সংখ্যা এর থেকে আরো চার-পাঁচ গুণ বেশি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯০তম।

 

সেন্টার ফর ইনজ্যুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিচার্স বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)- এর গবেষণা বলছে, দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বিভিন্ন অপঘাতে পঙ্গুত্ববরণ করেন ৬৬০ জন। সিআইপিআরবি তাদের জরিপে সড়ক দুর্ঘটনার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হচ্ছে চালকদের বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতাই দায়ী।

সরকারিভাবে বাংলাদেশে দুর্ঘটনার হিসাব রাখে পুলিশ বিভাগ। এর বাইরে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবং ফায়ার সার্ভিস মাঝে দুই একটি জরিপ পরিচালনা করে। পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তারা এখনো প্রকাশ করেনি। তবে ২০১৫ সালে ২ হাজার ৪০০ জন এবং ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা নিয়ে যৌথভাবে একটি গবেষণা পরিচালনা করছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও পিপিআরসি। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্ঘটনার ২৮ ভাগ ঘটেছে মহাসড়কে গড়ে ওঠা বাজারে, ১৮ ভাগ সড়কের মোড়ে। তাদের রিপোর্টে দুর্ঘটনার জন্য চালকের বেপরোয়া যান চালানো, বেপরোয়া গাড়ি চালানো ড্রাইভারদের শাস্তি না হওয়া, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, চালকের প্রশিক্ষণের অভাব, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার অভাব, পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও আইনি দুর্বলতাসহ ৯টি কারণকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের এ গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, দেশের মহাসড়কগুলোয় মোট ২০৯টি ব্ল্যাকস্পট রয়েছে। আর এই ২০৯টি স্থানের ৫৫ কিলোমিটারজুড়েই দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)। তারা প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। আর এ কাজে সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশের তথ্য এবং পত্রিকায় প্রকাশিত দুর্ঘটনার প্রতিবেদন নিয়েই মূলত তারা জরিপ প্রকাশ করে। বুয়েট অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে নিহতের পরিসংখ্যানটাই স্টান্ডার্ড নয়। পুলিশের অ্যাক্সিডেন্ট মামালার এফআইআরের তথ্যমতে বছরে প্রায় ২ হাজারের মতো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ২৩শ মারা যান। এবং আহত হন ২৬শ মানুষ। এছাড়া আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে তৎক্ষণাৎ কীভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হবে এ বিষয়ে সঠিক কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

 

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। সারা দেশের হাসপাতালগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩শ মানুষ আহত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান প্রায় ৬৪ জন মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি বছর অর্ধলাখ অর্থাৎ ৫০-৬০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের পুলিশ বাহিনীর একটি জরিপে বলা হয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ১৮শ থেকে দুই হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়। তিনি বলেন, আমাদের যাত্রী কল্যাণ সংস্থা সংবাদপত্রের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সাধারণত এ প্রতিবেদন তৈরি করে। সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটে তারমধ্যে মাত্র ৬০ শতাংশ সংবাদপত্র পর্যন্ত পৌঁছায়। আবার যেগুলো পৌঁছায় তার মধ্যে থেকে ২০ শতাংশ নিউজ হিসেবে গুরুত্ব পায় না বা নিউজ হয় না। ধামাচাপা পড়ে যায়। তার মানে মাত্র ৪০ শতাংশ নিউজই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়-বন্যাসহ বিভিন্ন বিপর্যয়ে সরকার সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের বিষয়টিকে সরকার বা সাধারণ মানুষ তেমন একটা আমলে নেয় না। সরকার কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান কেউই তাদের পাশে দাঁড়ায় না। একজন ব্যক্তি আহত হওয়ার পর সর্বপ্রথম তার সঞ্চিত অর্থের ওপর হাত দেন। এরপর স্থায়ী সম্পদ গবাদিপশু, গাছপালা, স্বর্ণালঙ্কার, জমিজমা সর্বস্ব বিক্রি করে চিকিৎসা খরচ চালান। প্রতি বছর যদি ৫০ হাজার ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে দরিদ্র্যতার কাতারে চলে আসে তাহলে সেটা একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধান অন্তরায়।