সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রগতি নেই

August 28, 2018, 5:42 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

 

   সবচেয়ে সাশ্রয়ী হলো- পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন। কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনাই হয় না। এর পরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয়ী জ্বালানি গ্যাস ও কয়লা। আর সবচেয়ে ব্যয়বহুল হলো- ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গত সাড়ে ৯ বছরে উল্লেখযোগ্য ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে তোড়জোড় থাকলেও কাক্সিক্ষত অগ্রগতি নেই। চলতি বছরের শুরুর দিকে বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তৃতীয় ইউনিটটি চালু হলেও পরে পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটিই বন্ধ করে দিতে হয়। ৫২৫ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত জুলাইয়ে কয়লা দুর্নীতির কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য শূন্যের কোঠায়। আর গ্যাসভিত্তিক কিছু কেন্দ্র স্থাপনের কথা বলা হলেও এ নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। এর বিপরিতে ব্যয়বহুল ডিজেল ও ফার্নেস তেলভিত্তিক রেন্টাল-কুইক রেন্টালের ওপর এখনো নির্ভরশীল সরকার।  


বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিট প্রতি ব্যয় মাত্র ১২ থেকে সর্বোচ্চ ১৪ পয়সা। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিট প্রতি ব্যয় গড়ে ২ টাকা ৫৯ পয়সা। গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাসহ অন্যান্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয় ২০০৯ সালে। যদিও সেই থেকে এ সময় পর্যন্ত কয়লাভিত্তিক নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালু করা সম্ভব হয়নি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউনিট প্রতি উৎপাদন ব্যয় ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। আর ডিজেলে ২০ টাকা ৭৩ পয়সা ও ফার্নেস অয়েলে ১৬ টাকা ৩৭ পয়সা।


সূত্র বলছে, ব্যয় বেশি হওয়ার পরও দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সময়ে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ ছিল তেল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩০ শতাংশেরও বেশি তেলভিত্তিক। এর বিপরীতে কমেছে পানি, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদনের পরিমাণ।
পিডিবি সূত্র বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে সেগুলোর মধ্যে সরকারি খাত থেকে এসেছে ৩২টি, যার উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ৬০৬ মেগাওয়াট। বেসরকারি খাত থেকে এসেছে ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র, এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট, যার প্রায় ৩ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট তেলভিত্তিক এবং এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারের উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। এ পর্যন্ত মাত্র তিন মেগাওয়াটের একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় স্বল্প সময়ের জন্য ২০০৯ সালে তেলভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের চুক্তি করা হয় একের পর এক। বলা হয়, তিন বছর পর রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থাকবে না। কিন্তু সাড়ে নয় বছর ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হলেও এখনো একই ধারায় চলছে বিদ্যুৎ খাত। তেলবিত্তিক রেন্টাল-কুইক রেন্টালের উপর নির্ভরতা কমেনি বরং বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর কয়েকটি দেশ প্রায় শতভাগ পানিবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশেও পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দ্রুত উৎপাদনে আনা দরকার। অন্যথায় রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থেকে উচ্চ দরের বিদ্যুতের চাপ জনগণের ওপর বাড়তে থাকবে।  


পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন
২০১৫ সালের আগস্টে কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় ১৪ পয়সা। একই বছরের সেপ্টেম্বরে সেই খরচ পড়ে ১২ পয়সা ও অক্টোবরে ১৩ পয়সা। দেশের একমাত্র পানিভিত্তিক কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলি ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে পাঁচটি ইউনিট চালু আছে। ১৯৬০ সালে স্থাপিত ও সবশেষ ১৯৮৭ সালে সম্প্রসারিত পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে আরও দু’টি ইউনিট বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে কম ব্যয়ের কেন্দ্রটির উৎপাদন বাড়াতে উদাসীন বিদ্যুৎ বিভাগ। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাঁধে পানি পুনঃসঞ্চালনের মাধ্যমে সারা বছর সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যদিও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কেন্দ্রের নির্গমনযোগ্য পানি পূর্ণ ব্যবহার করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ আরও কমানো সম্ভব।


কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
গবেষকরা বলছেন, ২০০৭ সালে প্রতি টন কয়লার দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ ডলার। সেই কয়লার দাম কমতে কমতে গত বছর প্রতি টন ৩০-৪০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। অবশ্য ২০১৮-তে সেই দাম কিছুটা বেড়ে ৭০-৮০ ডলার হয়েছে। ভারতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে খরচ হচ্ছে প্রতি ইউনিট ৩-৪ রুপি। বাংলাদেশেও দাম পড়বে গড়ে প্রতি ইউনিট ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকা। যদিও ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে কয়লাভিত্তিক যে বিদ্যুৎ আমদানি করার চুক্তি হয়েছে সেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়েছে ৭.৬৯ মার্কিন সেন্ট। কাজেই মূল্য এবং প্রাপ্যতার দিক থেকে বিচার করলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি।  
সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ কয়লাভিত্তিক। জার্মানিতে ৪১ শতাংশ, জাপানে ২৭ শতাংশ, ভারতে ৬৮ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৯৩ শতাংশ, চীনে ৭৭ শতাংশ কয়লাভিত্তিক। অথচ বাংলাদেশে কয়লা দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ মাত্র ১ শতাংশের সামান্য বেশি (১.৩৩ ভাগ)। অবশ্য সেই (বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র) উৎপাদনও বর্তমানে বন্ধ। এর মানে হলো, বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন শূন্য। সরকারি খাতের বড়পুকুরিয়া ২৭৫ মেগাওয়াট (তৃতীয় ইউনিট) প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৩ সালের ৪ জুলাই চুক্তি সই করে পিডিবি। এর পর চলতি বছরের শুরুরের দিকে ওই একটি মাত্র ইউনিট চালু হয় বর্তমান সরকারের সময়ে। এর আগে ২০০২ সালের ২১ নভেম্বর চালু হয়েছিল দেশের প্রথম ও একমাত্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দু’টি ইউনিট। এর পর সেখান থেকে ২৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছিল জাতীয় গ্রিডে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর সাথে যুক্ত হয়েছিল একই কেন্দ্রের ২৭৫ মেগাওয়াটের তৃতীয় ইউনিট। সবমিলিয়ে একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগান হচ্ছিল ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু কয়লা লুটের কারণে জ্বালানি সরবরাহ সংকটে দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।


এদিকে, বেসরকারি খাতে মুন্সীগঞ্জ ৫২২ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প, খুলনা ৫৬৫ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প দু’টি চলতি বছরে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাও অনিশ্চিত। এছাড়া, বেসরকারি খাতে ২০১১ সালে ১ হাজার ৮৮ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনুমতি পায় ওরিয়ন। ২০১৩ সালে কয়লাভিত্তিক ৬৩৫ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলওআই ওরিয়নকে ইস্যু করা হয়। এগুলোরও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। এস আলম গ্রুপ ৬১২ মেগাওয়াটের দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন পায় ২০১২ সালে। সেগুলোর অবস্থাও একই। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে এসব প্রকল্প দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাত করেছে। যা সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের হতাশা তৈরি করেছে বলেই জ্বালানি বিশ্লেষকদের মত।  
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২৭টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা ১১২টি। বিগত সাড়ে নয় বছরে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন ৮৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ৩৭টি। বাকি সব ভাড়াভিত্তিক তথা কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। অন্যদিকে এ সময়ে কম খরচের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।


সূত্রমতে, মহাজোট সরকারের শুরুতে দায়মুক্তি চালু করা হয়। এই আইনের সুবিধা নিয়ে বেসরকারি খাতে যাচ্ছেতাইভাবে একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি করা হয়। এসব অধিকাংশ চুক্তির ক্ষেত্রেই সরকারি স্বার্থের বিষয়টি জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার লক্ষে সাময়িক সময়ের জন্য এসব চুক্তি করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো বেসরকারি এসব কেন্দ্রের কোনো কোনোটির দ্বিতীয় মেয়াদে এবং কোনো কোনোটি তৃতীয় মেয়াদে চুক্তি নবায়ন করেছে সরকার। যদিও রেন্টালের চুক্তি নবায়ন না করে কম খরচে সরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ ছিল। কিন্তু সরকার এ সুযোগ কাজে লাগায়নি। কারণ, এতে লুটপাটের সুযোগ কমে যেত। তাই বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতিবাজ আমলারা নিজেদের আখের গোছাতে সরকারকে ভুলভাল বুঝিয়ে ব্যবসায়ী নামের মাফিয়াচক্র ও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের সমন্বয়ে সুবিধাভোগীরা সরকারকে রেন্টালের ওপরই নির্ভরশীল রেখেছে। ফলে তিনগুণেরও বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে রেন্টাল থেকে। বেসরকারি গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ৬ টাকা। অথচ সরকারি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে ব্যয় হয় ২ টাকারও কম। এরই মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ১৩টি এবং ১১টি তেলভিত্তিক রেন্টালের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এমনকি কুইক রেন্টালকেও এ সুবিধা দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে সরকারি খাতে ৬ হাজার ৭০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৬টি এবং বেসরকারি খাতে ৪ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মোট ১১ হাজার ৩৬৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। কিন্তু এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কোনোটিই চুক্তি অনুযায়ী কার্যক্রম এগোয়নি।


এলএনজি আমদানি কি সাশ্রয়ী বিদ্যুতের সহায়ক?
২০১৮ সালে ৫০০ মিলিয়ন এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু আমদানি করা এলএনজির ওই গ্যাসের দাম পড়বে প্রতি ইউনিট ১৪ টাকার বেশি। পাবনার রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র করার শুরুতে বলা হয়েছিল খরচ হবে ৬০০ কোটি ডলার। পরে ব্যয় বেড়ে হয় ১২শ’ কোটি ডলার। রাশিয়া থেকে এই কেন্দ্রের জন্য নেয়া ঋণের সুদসহ কেন্দ্রটি চালু করতে সব মিলিয়ে খরচ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আর কমার সম্ভাবনা নেই। কাজেই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও বিদ্যুতের দাম কমানোর সুযোগ নেই। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম কমানোর একমাত্র জ্বালানি হচ্ছে কয়লা। অর্থাৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ
বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাথমিক জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন জোগান এবং এ খাতের অর্থায়ন। ২০০৭ সালে গ্যাসস্বল্পতার বিষয়টি সর্বপ্রথম সামনে আসে। তখন থেকে এ পর্যন্ত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৩০ শতাংশ। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার দোদুল্যমান হওয়ায় একইসঙ্গে বিরাট একটা অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। তাই বড় আকারের বেসলোড সাশ্রয়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আনার চেষ্টায় নামে সরকার। কোনো সাফল্য আসেনি সেই প্রচেষ্টায়। সরকারের জন্য আরেকটি বিকল্প হলো- এলএনজি আমদানি। কিন্তু এখানেও সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। ২০১০ সালে দু’বছরের মধ্যে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এই সময়সীমা পরিবর্তন হতে হতে ২০১৮-১৯-এ ঠেকেছে। এই বিলম্ব সরকারকে জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং এর যৌক্তিক দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।


এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো দরকার। তাই বলে একের পর এক মেগাপ্রকল্প অনুমোদন দিলেই হবে না। যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ভোক্তাপ্রান্তে জ্বালানি দক্ষতা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকৃত চাহিদার প্রাক্কলন করা দরকার। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎস তুলে ধরেছেন গবেষকরা। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন উৎসের মধ্যে পানি বা জলবিদ্যুতের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। ২০১৫ সালে উৎপাদিত মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রায় ৭১ শতাংশই এসেছে পানিবিদ্যুৎ থেকে। বিশ্বের শীর্ষ তিন পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে, চীন (বছরে ৯৬.৯ এমটিওই), ব্রাজিল (৩২.৯ এমটিওই) ও কানাডা (৩২.৩ এমটিওই)। আর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া জ্বালানির তালিকায় কয়লা ২৯ শতাংশ ও গ্যাস ২৪ শতাংশ।
গবেষকরা বলছেন, সাশ্রয়ী ও নবায়নযোগ্য পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক সুযোগ থাকার পরও বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর প্রধান কারণ, দুর্নীতি ও লুটপাট। আর সরকার যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে তোড়জোড় দেখাচ্ছে তাও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়। উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন, বিশ্বের জ্বালানির তালিকায় মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে পারমাণবিক। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি উৎস পানিবিদ্যুতের চেয়েও এর ব্যবহার কম। বিশ্বের মোট বিদ্যুতের ৭ শতাংশ আসে বায়ুবিদ্যুৎ থেকে। ২০১৫ সালে ৪৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৪২০ গিগাওয়াট অনশোর (ভূমি) ও ১২ গিগাওয়াট অফশোর, অর্থাৎ সাগরে বসানো টারবাইনের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া জ্বালানির তালিকায় ছয়ে আছে বায়ুবিদ্যুৎ।


বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনার সুফল কী?
২০১০ সালে জাইকার সহযোগিতায় একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। জ্বালানির বহুমুখীকরণ এবং চাহিদা ও জোগানের গ্রহণযোগ্য সমন্বয় পরিকল্পনা ছিল পিএসএমপি ২০১০-এ। এতে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট ধরে ৩০ ভাগ বিদ্যুৎ কয়লা দিয়ে উৎপাদনের কথা বলা হয়েছিল। পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই পরিকল্পনা বাতিল করে নতুন পিএসএমপি-২০১৫ তৈরি করা হয়। যদিও তা আর অনুমোদন হয়নি।
নতুন মহাপরিকল্পনায় দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালের সর্বোচ্চ চাহিদার প্রাক্কলন ১৩ হাজার মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা হয়েছে, যেখানে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়েছে। দু’টোতেই অবশ্য জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পিত প্রকল্পের ৫০ শতাংশ পর্যন্তই বাস্তবায়ন করতে পারে পিডিবি। সেই হিসাবে, ২০২১ সালে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বা লক্ষ্য পূরণ হওয়া নিয়ে বিশ্লেষকরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সরকারের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সেই যোগানও নিশ্চিত হয়নি। ফলে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত ‘এনার্জি আর্কিটেকচার পারফরম্যান্স ইনডেক্স- ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিদ্যুতের কাঠামোগত দক্ষতা সূচকে বিশ্বের ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৪তম। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুতের মাথাপিছু উৎপাদন ভারত, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলংকার মধ্যে সর্বনিম্ন।


তেলভিত্তিক তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্ল্যান
নতুন করে সরকার তেলভিত্তিক তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই তিন হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে দেড় হাজার মেগাওয়াট হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত বিশেষ আইনের আওতায়। এই আইনে বিনা দরপত্রে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিধান রয়েছে, যা নিয়ে কখনোই কেউ আদালতেও যেতে পারবেন না। এ কেন্দ্রগুলো থেকে সরকার বিদ্যুৎ কিনছে অস্বাভাবিক দামে। কোনোটি থেকে ৫ বছর এবং কোনোটি থেকে ১৫ বছর মেয়াদে। ৫০০ মেগাওয়াট করবে পিডিবিসহ সরকারি খাতের কোম্পানিগুলো। আর এক হাজার মেগাওয়াট করা হবে প্রচলিত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বার্জ মাউন্টেড কেন্দ্রও থাকতে পারে। বেসরকারি খাতে যে দেড় হাজার মেগাওয়াট করা হচ্ছে, সেগুলো সব দিক থেকেই ২০১০ সালে করা ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রের মতো। এই দেড় হাজার মেগাওয়াটের জন্য আগ্রহী বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে আলোচনা শুরু করে। ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সাতটি কোম্পানি বিদ্যুতের দাম নিয়ে সরকারের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়নি। সরকার ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রস্তাব করেছিল সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ২৮ টাকা। এটিও ছিল অস্বাভাবিক। অথচ কোম্পানিগুলো ৮ টাকা ৭০ পয়সা দর শেষ পর্যন্ত আদায় করে নেয়।


নতুন তেলভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, ‘এই উদ্যোগ কোনোভাবেই জনবান্ধব নয়। এতে বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের আয়-ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি বাড়বে। এটা সরকারের অনুসৃত নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। কারণ, সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র (বেইজলোড পাওয়ার প্ল্যান্ট) তৈরি করে বিদ্যুতের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা। নতুন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের এই উদ্যোগ সে পরিকল্পনাকে ভন্ডুল করবে।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতে সরকারের পরিকল্পনা ছিল, রেন্টাল কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বড় (বেইজ লোড) বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সম্পন্ন করা। তখন এই কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে চুক্তি বাতিল করা হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু পরিকল্পনার বাস্তবায়নে পিছিয়ে যায় সরকার। এখানে উল্লেখ্য যে, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪০০ মেগাওয়াট নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে রামপালে ১৬ হাজার কোটি টাকা, মাতারবাড়িতে ৩৬ হাজার কোটি এবং অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য আরো ৮০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন সরকারের। এর বাইরে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো তৈরির খরচ তো আছেই। কম করে ধরলেও এর জন্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনেকগুলো প্রকল্প থেকে এভাবে একসঙ্গে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে তা সিস্টেমের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তৈরির ধারণাটি পৃথিবীতে নতুন না হলেও বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে তা বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এটা যেমন নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে এসব পরিকল্পনার কোনোটাই বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে রেন্টালের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে দেশবাসী।


বেশি খরচের বিদ্যুতে আগ্রহ কেন?
পিডিবির তথ্যমতে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে খরচ হতো ২ টাকা ৫৫ পয়সা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ ব্যয় দাঁড়ায় ৬ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ ওই পাঁচ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৩ শতাংশ। বর্তমানে তা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এতে একদিকে বেড়েছে সরকারের ভর্তুকি। অন্যদিকে বেড়েছে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দামও। আর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ পিছিয়ে যাওয়ায় ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। যার খেসারত দিচ্ছেন দেশের জনগণ। ফলাফল হিসেবে বর্তমান সরকারের সময়ে গ্রাহকপর্যায়ে ৮ দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।  
সূত্রমতে, ডিজেল ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের পুরোনো বিবেচনায় সঠিকভাবে দর যাচাই করে কার্যাদেশ দিলে ট্যারিফ (বিদ্যুতের দর) দাঁড়াতো প্রতি মেগাওয়াট ৮.০০ টাকা। কিন্তু কোম্পানিগুলোকে সরকার দিচ্ছে গড়ে ১৪.৮০ টাকা। ফার্নেস ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের ক্ষেত্রে পুরোনো বিবেচনায় ট্যারিফ দাঁড়াতো ০৬.৬০ টাকা। সেখানে ট্যারিফ ধরা হয়েছে ৮.৮০ টাকা। অর্থাৎ ডিজেলের ক্ষেত্রে বেশি দেয়া হচ্ছে (১৪.৮০-৮.০০) = ৬.৮০ টাকা। আর ফার্নেসের ক্ষেত্রে (৮.৮০-৬.৬০)= ২.২০ টাকা। যদি সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রেন্টাল থেকে আসে তাহলে বছরে এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার কোটি টাকা। অথচ সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পানি, গ্যাস অথবা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে এক্ষেত্রে উল্টো লাভ করতে পারতো সমপরিমাণ অর্থ। এছাড়াও, সরকার ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলে প্রতি লিটারে কমপক্ষে কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি দিচ্ছে যথাক্রমে ১২.০০ ও ৯.০০ টাকা। ভর্তুকির গড় দাঁড়ায় সাড়ে ১০ টাকা। সরকার ঘোষিত ৩০০০ মেগাওয়াটের জন্য বার্ষিক ভর্তুকিই দিতে হচ্ছে আরো প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ডিজেলে ২৫ টাকা ও ফার্নেস অয়েলে লিটার প্রতি ১২ টাকা করে ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। আর বর্তমানে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল যদি ১০০০ মেগাওয়াট চালু থাকে তাহলে বছরে সর্বমোট ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। পিডিবির তথ্যেও এর সত্যতা মিলে। কিন্তু টেন্ডার করে যথাযথ দর ও পুরোনোর পরিবর্তে নতুন কেন্দ্র বসালে কম জ্বালানি ব্যবহার হতো বিধায় ভর্তুকির সর্বাধিক পরিমাণ কিছুতেই ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি হতো না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। মূলত, কোনো ধরনের দরপত্রছাড়া দায়মুক্তির সুবিধা নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র ভাড়া দেয়ার অন্তরালে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও আমলাদের একটি প্রভাবশালী চক্র এই কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। তাদেরকে এ সুবিধা দিতেই সাশ্রয়ী মূল্যের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের তৎপরতা পিছিয়ে। এমনটাই জানা গেছে বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে।  


সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বেসরকারি খাতে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি হিসেবে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পিডিবি লোকসান দিয়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয় প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। সরকারি দুই দফতর মিলে চার বছরে ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এদিকে, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সরকার শুরুতে তিন বছরে (২০০৯-১০ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর) ৩৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ করে। এর থেকে ভর্তুকির নামে ব্যয় করেছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকি দিয়ে কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে মাত্র ৯০০ মেগাওয়াট। অথচ মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেই সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেন্টাল বিদ্যুতের জন্য যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গুণতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে- সেই অর্থ দিয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদনে গেলে বিদ্যুতের কোনো সংকটই থাকতো না। তারা বলছেন, ভর্তুকির টাকা কারা লুটপাট করে খাচ্ছে, এ বিষয়ে তদন্ত করার সময় এসেছে। সময় এসেছে এসবের সাথে কারা জড়িত তাদের মুখোশ উম্মোচন করার।