সেই বাসচালকের আত্মসমর্পণ

August 29, 2018, 6:20 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

 

   নাটোরের লালপুরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে ১৫ জন নিহতের ঘটনায় ঘাতক বাসচালক শামীম হোসেন গতকাল দুপুরে বগুড়ায় আত্মসমর্পণ করে। পরে শ্রমিকনেতারা তাকে ডিবি পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। বগুড়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সামছুদ্দিন শেখ হেলাল বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরে শামীম তার কাছে (কার্যালয়) আত্মসমর্পণ করেছে। পরে আমি তাকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছি।’ জেলা  গোয়েন্দা পুলিশের ওসি নূর-এ-আলম সিদ্দিকী জানান, শামীম হোসেনকে নাটোর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।


এর আগে রোববার এ মামলায় বাসের হেলপার কমলকে পুলিশ বগুড়া শহর থেকে গ্রেপ্তার করে এবং বাসের মালিক মঞ্জু সরকারকে বগুড়া সদর পুলিশ ফাঁড়িতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়া হয়। শনিবার বিকাল ৪টার দিকে নাটোরের লালপুরের কদিমচিলান ক্লিক মোড়ের সাদিয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে চ্যালেঞ্জার নামের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী লেগুনার সংঘর্ষ হয়। এতে লেগুনাটি দুমড়ে মুচড়ে যায়।বাসটি পড়ে যায় সড়কের পাশে খাদে। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় লেগুনার ১০ যাত্রী। বাসটি পাবনা থেকে নাটোর হয়ে রাজশাহী যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার পরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে লেগুনার অপর চার যাত্রী ও বাসের আট যাত্রীকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে যোগ দেন বনপাড়া হাইওয়ে থানা, লালপুর থানা, নাটোর ও লালপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আহতদের বড়াইগ্রামের বনপাড়া শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।


সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লেগুনার আরো চার যাত্রী মারা যান। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মীরকামারি গ্রামের সালামত আলীর মেয়ে সুমাইয়া (১১ মাস) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে মারা যায়। লেগুনার বেঁচে যাওয়া একমাত্র যাত্রী নুরসেদ সর্দার (৭২) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বলেছিলেন, লেগুনাটি বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাইপাসের লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া যাচ্ছিল। লেগুনাটি ছাড়ার পর থেকেই চালক এলোমেলো চালাচ্ছিলেন। চালক মোবাইলে কথা বলছিলেন। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে মুহূর্তে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় তিনি স্ত্রী লজেলাকে হারিয়েছেন। পরের দিন সকালে এ ঘটনায় লালপুর থানায় সাত জনকে আসামি করে মামলা হয়। বনপাড়া হাইওয়ে থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক  ইউছুব আলী বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় বনপাড়া লেগুনা স্ট্যান্ডের সভাপতি জাবেদ মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, লেগুনাচালক, চালকের সহকারী, চ্যালেঞ্জার বাসমালিক, বাসচালক ও চালকের সহকারীকে আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্য লেগুনাচালক ও তার সহকারী দু’জনই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। আর চ্যালেঞ্জার বাসমালিক, চালক ও চালকের সহকারীকে অজ্ঞাত দেখানো হয়।


তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন
এদিকে নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোর-পাবনা মহাসড়কের লালপুর উপজেলার কদিমচিলানে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে ১৫ জনের মৃত্যু বিষয়ে তদন্তে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে তদন্ত টিমের প্রধান হিসেবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-

 বিআরটিএ পরিচালক অপারেশন সিতাংশু শেখর বিশ্বাস, গাজীপুর হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার শফিকুল ইসলাম, বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক ও দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সদস্য কাজী মোহাম্মদ সিফান নেওয়াজ, নিরাপদ সড়ক চাই এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এস.এম আজাদ হোসেন এবং বৈশাখী টেলিভিশনের হেড অব নিউজ অশোক চৌধুরী। এ সময় তারা প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তারা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তদন্ত টিমের প্রধান হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম বলেন, পরিদর্শনে এসে দুর্ঘটনা ঘটার পেছনে টেকনিক্যাল কারণগুলো দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। গত ঈদের পর নাটোর, কুমিল্লা ও ভৈরবে যে তিনটি স্থানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে সে স্থানগুলো পরিদর্শন করে তারা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করবেন। তদন্ত শেষে তারা দুর্ঘটনা রোধে যে সুপারিশমালা দেবেন তার আলোকে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। ব্ল্যাক স্পট তৈরি, ওভার টেকিং বন্ধ, অবৈধ যানবাহন যাতে কোনোভাবেই মহাসড়কে উঠতে না পারে সে ব্যবস্থা করা, ট্রমা সেন্টার তৈরি, পার্শ্বরাস্তা তৈরিসহ বাস্তবসম্মত সুপারিশ করা হবে বলে জানান তিনি। নাটোরের সড়ক দুর্ঘটনায় লেগুনার দায়ভার বেশি ছিল উল্লেখ করে শফিকুল ইসলাম আরো বলেন, অবৈধ যানচলাচলে এমনিতেই আইন করে তার প্রয়োগ করা হচ্ছে। যদিও তা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির মালিককে কেন ছেড়ে দেয়া হয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি একটি আইনগত ব্যাপার। তাকে যদি ছেড়ে দেয়া হয় আমরা নিজেরাই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব। নাটোরসহ সারা দেশে সংঘটিত মোট তিনটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন ১০ কার্যদিবসের মধ্যে দেয়া সম্ভব হবে বলে শফিকুল ইসলাম জানান। এ ছাড়া স্থানীয় জনগণের চাহিদার আলোকে লেগুনাসহ অন্যান্য ধীরগতি সম্পন্ন যানবাহনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ ছাড়া তিনি বলেন, সকল মহাসড়কেই পর্যায়ক্রমে পার্শ্বরাস্তা তৈরি করা হবে যা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ।

এর আগে বাসের হেলপার ও মালিককে আটক করা হলেও মুচলেকা নিয়ে মালিককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।