অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ

March 22, 2018, 2:59 pm নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম


স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বে এখন বাংলাদেশের নতুন পরিচয় মধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মডেল। গরিব দেশ, শুধু সাহায্য চায়—এরকম ভাবমূর্তি এখন আর নেই বাংলাদেশের। বরং বাংলাদেশের সফলতার এই অগ্রযাত্রা আরও প্রসারিত হবে, আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে দেশ। উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দ উদযাপনে এমনটাই বলছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা।

উন্নয়নশীল দেশ হতে যে তিনটি সূচকের দরকার হয়, তা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের মূল্যায়নের নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে এ ঘোষণা কার্যকর হবে ২০২৪ সালে। জাতিসংঘের ইকোনমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিল উল্লিখিত তিনটি বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশকে এ ঘোষণা দিয়েছে। যা বাংলাদেশ সরকারের হাতে এসেছে ১৭ মার্চে, বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্মদিনে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানান, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরার পথে লন্ডন বিমানবন্দরে বিদেশি সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তোমার দেশ তো এখন একটি ধ্বংসস্তূপ। কীভাবে সেই দেশকে গড়ে তুলবে?’ জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিদেশি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষ ও মাটি যদি থাকে, তাহলে আমার এই বাংলাদেশ একদিন সোনার বাংলা হবে।’ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ সত্যিই আজ সোনার বাংলায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। এর রূপকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, উন্নয়নকে টেকসই করতে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি তিন বছর পরপর সূচক তৈরি করে থাকে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। তারই ভিত্তিতে সিডিপি স্বল্পোন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নত দেশ—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে। বিবেচনার সব সূচক অর্জন করেই আজ দ্বিতীয় ধাপে পা রাখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশ এলডিসির তালিকা থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন এখন চূড়ান্ত।

জাতিসংঘের সিডিপির সঙ্গে সরকারের বৈঠকে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অর্জিত পয়েন্ট হবে ৭২ দশমিক ৮। অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক নেমে দাঁড়িয়েছে ২৫ পয়েন্ট। আর মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭২ ডলার। সেই হিসাবে তিন সূচকেই একসঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ।বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ  বলেছেন, মার্চেই এলডিসি থেকে ডেভেলপিং কান্ট্রিতে পরিণত হলো বাংলাদেশ। ‘ডেভলপিং কান্ট্রি’ হতে যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়, তা বাংলাদেশ অর্জন করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, শর্ত অনুযায়ী একটি দেশকে উন্নয়নশীল হতে হলে সেই দেশকে প্রথমত, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৪২ মার্কিন ডলার হতে হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার। দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদের উন্নয়ন অর্থাৎ দেশের ৬৬ ভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়েছে। আর তৃতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুরতা না হওয়ার মাত্রা নামিয়ে আনতে হয় ৩২ শতাংশে। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে এই সূচকটি ২৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার মানদণ্ডে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক ৬৬ শতাংশ বা তার বেশি এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক ৩২ বা তার কম নির্ধারণ করা হয়। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৭১ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচক ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ হওয়ায় বাংলাদেশ এ স্বীকৃতি পেয়েছে।

তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিলের মূল্যায়ন কমিটি বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ ঘোষণা কার্যকর হতে প্রস্তুতির সময় থাকবে। সেই সময় নিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালে বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশের পরিচিতি পাবে। যদিও বাংলাদেশের এই স্ট্যাটাস ২০২৪ সালে চূড়ান্ত ঘোষণা এবং ২০২৭ সালে তা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

জানা গেছে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেলেও বৈশ্বিক সম্প্রদায় আগামী ১৫ বছর বাংলাদেশের এই উত্তরণকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। বাংলাদেশের এই উত্তরণ হবে একমুখী প্রক্রিয়া। কেননা, ধারণাগতভাবে উত্তরণের পর আবার এলডিসিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও যেসব দেশের জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটির বেশি, সেসব দেশের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। তাই বাংলাদেশের আর ফেরত যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে, ২০১৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গতি আসবে। যথাযথ প্রস্তুতি নিলে বাংলাদেশ তার সুফল নিতে পারবে।

বাংলাদেশের এই অর্জনে এখন করণীয় কী, জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জনের জন্য আমাদের প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখনও বাংলাদেশের ৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আমাদের অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি শিল্পায়িত হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি আমাদের পরিস্থিতিনির্ভর অর্থনীতি থেকে উৎপাদনশীলতানির্ভর অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। তাই এই উত্তরণের মধ্য দিয়েই সব সমস্যার সমাধান আপাতত হচ্ছে না।’

তিনি জানান, ‘অবশ্যই অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ ব্যবসায় পরিবেশ সক্ষমতা ও বন্দর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। যাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলেও পণ্যের দাম ঠিক রেখে বাজার প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা যায়। এ ছাড়া আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে এই উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্য সুবিধা পাবে। ততদিন পর্যন্ত জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের স্ট্যাটাস হবে স্বলোন্নত দেশের। তবে বিশ্বব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ এখনই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাচ্ছে।