নির্মম পদ্মা করেছে নিঃস্ব, জেগেছে মানবতা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

নদীভাঙন পদ্মা পাড়ের মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে করেছে নিঃস্ব। কিন্তু সেখান থেকেই যেন শুরু হয়েছে অন্য এক অধ্যায়। নিঃস্ব এসব মানুষের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এলাকার কিছু মানুষ। গড়ে তুলেছেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে তারা প্রমাণ করেছেন ‘মানুষ মানুষের জন্য’।
এলাকাবাসী জানান, এক সময় মানুষের কোলাহলে মুখরিত হতো যেসব গ্রাম-পাড়া সেগুলো এখন পদ্মাগর্ভে বিলীন। গৃহহীন, সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলো মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে আলম হোসেন লস্করের বাগান বাড়ি, সুমন শরীফের মাঠ ও ভূঁইয়া বাড়ির মাঠে। ২০১৩ সালে নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো কিছু মানুষ আশ্রয় নেন লস্কর বাগান বাড়িতে। বিশাল জায়গায় অন্তত শতাধিক পরিবার নিজেদের মতো করে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু করে নিয়েছে। তাদের সবাই কেদারপুর ইউনিয়নের চর জুজিরা গ্রামের বাসিন্দা। ভাঙনে ভিটেবাড়ি হারানোর পরও যাদের হাতে কিছু টাকা আছে, তারা বিভিন্ন এলাকায় বাসাভাড়া নিয়ে লস্কর বাগান থেকে চলে গেছেন। এখনো ২৫/৩০টি পরিবার সেখানে থাকছে। এবারের নদীভাঙনে যারা বসতভিটা হারিয়েছেন তাদের অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন ভূঁইয়া বাড়ির মাঠে। প্রায় ত্রিশটি পরিবার সেখানে আশ্রয় পেয়েছে।
ভূঁইয়াবাড়ির মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন নিঃস্ব ভ্যানচালক দেলোয়ার হোসেন (৫০)। পদ্মায় ডুবে যাওয়া ঘরের চালা থেকে খুলে আনা টিন দিয়ে গড়েছেন অস্থায়ী আশ্রয়। নয় সদস্যের দেলোয়ারের পুরো পরিবার সেখানেই কোনো রকমে মাথা গুঁজে পড়ে আছেন। একই জায়গায় পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন রিকশাচালক ইব্রাহীম মোল্লা।
আলম হোসেন লস্কর এই প্রতিবেদককে বলেন, পাঁচ বছর ধরেই নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ লস্কর বাগানে থাকছে। মানুষগুলো অসহায় বলেই তো আজ তাদের খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে না পারলে কিসের মানুষ হইলাম? বাগানের একটা অংশে কলাবাগান ছিল। অসহায় মানুষগুলো কই যাইব? তাই কলাবাগান পরিষ্কার করে দিছি। ওরা সেখানেই ঘরে তুলে থাকতেছে।
নদী ভাঙনে নিঃস্ব পরিবারগুলোর জন্য সবার কাছে মানবিক সাহায্য চেয়ে রাস্তায় নেমেছে ‘দ্য হ্যান্ড অব ফেইথ’ নামের একটি সংগঠন। স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনের সবাই বয়সে তরুণ ও শিক্ষার্থী। সংগঠনের সদস্য রিজভী, ইতি, নূর মোহাম্মদ, ইহসান, স্বপন, আদনান, শাহিন, অনিকসহ বেশ কিছু তরুণ-তরুণী প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজারে আগতদের কাছে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে সাহায্য চায়। এতে বেশ সাড়াও পেয়েছে এই সংগঠনটি।
দ্য হ্যান্ড অব ফেইথের সদস্যরা জানায়, এই সংগঠনের মাধ্যমে জড়ো হয়ে ইতোমধ্যে নড়িয়ার নদী ভাঙনে গৃহহীন নিঃস্ব ৪৭টি পরিবারকে নগদ ৫ হাজার টাকা ও একটি প্রতিবন্ধী পরিবারকে ২৫ হাজার টাকাসহ মোট আড়াই লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করতে তাদের আরো পরিকল্পনা রয়েছে। জানা যায়, গত ৭ আগস্ট মূলফৎগঞ্জের সাধুর বাজারে হঠাৎ ভাঙনে ১০ জন নিখোঁজ হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য কিছু তাগিদ অনুভব করেন এই তরুণ-তরুণীরা। এরপর ১১ আগস্ট বন্ধুরা মিলে ফেইসবুকে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে দ্য হ্যান্ড অব ফেইথ নামে ফেসবুকে একটি গ্রুপ খোলেন। ইতোমধ্যে ওই গ্রুপে তিন হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছে। শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের এই মানবিক উদ্যোগে সার্বিকভাবে তত্ত্বাবধায়ন করছেন নড়িয়া উপজেলার সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. গোলাম ফারুক ও প্রবাসী টিটু ব্যাপারি।
ডা. গোলাম ফারুক বলেন, নদী ভাঙনকবলিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে সরকারি উদ্যোগের বাইরে সবার এগিয়ে আসা দরকার। এককালীন সহায়তায় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অভাব পূরণ করা সম্ভব নয়। তাদের জন্য স্থায়ী ও টেকসই উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে।