কোথায় গেল সাড়ে ১২ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

২৮ বছর বন্ধ থাকার পর এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের আশা জেগে উঠেছে। দীর্ঘদিন পর আবারও ডাকসুর সব কার্যক্রম চালু হবে- এমনই প্রত্যাশা সবার। তবে এতদিন সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরও প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় বাজেটে ডাকসু ও হল সংসদগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও নেওয়া হয়েছে ছাত্র সংসদ উন্নয়ন বাবদ ফি। কর্তৃপক্ষ এসব টাকা ব্যয় করলেও তাদের কাছে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য।

ছাত্র সংসদ না থাকলেও ঘাটতি বাজেটের কারণে এ টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে বলে জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আর ডাকসু চালু না থাকায় এ টাকা বেতন খাতের ভেতরেই সংযুক্ত করে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। অন্যদিকে ডাকসু নির্বাচন দিলে ডাকসু সংশ্নিষ্ট অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা আসবে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভর্তির সময় প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ডাকসু ও হল সংসদ ফি বাবদ ৬০ টাকা করে মোট ১২০ টাকা দিতে হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। সেই হিসাবে এক বছরে আদায় করা হয় প্রায় সাড়ে ৪৪ লাখ টাকা। ২৮ বছরের এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা। বিভিন্ন  সময় শিক্ষার্থী ও সংগৃহীত টাকার পরিমাণ কমিয়ে ধরলেও এর পরিমাণ ১০ কোটির কম হবে না।

এদিকে ডাকসুর কার্যক্রম না থাকলেও প্রতি বছর ডাকসুর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় খাতে বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ বরাদ্দ রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের 'রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট ২০১৮-২০১৯' অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২১ লাখ এক হাজার টাকা; ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ২০ লাখ ৮ হাজার টাকা; ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ১৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা; ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ১২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। বিগত ২৮ বছরে গড়ে কমিয়ে ধরলেও খরচের পরিমাণ দুই কোটি টাকার মতো হয়। কিন্তু নির্বাচন না হওয়া সত্ত্বেও টাকা বরাদ্দ এবং এই টাকার ব্যয় কোথায় হয়- এমন প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

জানা গেছে, প্রতি বছর শিক্ষার্থীরা ফি দিলেও তারা কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। ক্যাম্পাস ও হলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এখন ডাকসু মানে একটি সংগ্রহশালা ও ক্যান্টিন। ডাকসুর ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে পাশে স্থাপিত হয়েছে সংগ্রহশালা। সেটিও অবহেলার শিকার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ছাত্র সংসদ বন্ধ থাকলেও আগের নিয়মেই ফি নেওয়া হচ্ছে। এটা নিয়ে ছাত্ররা জোরালোভাবে কখনও কথা বলেনি। প্রশাসনও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয় না। প্রতি বছর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘাটতি বাজেট হয়, কাজেই ছাত্র সংসদের ফি অন্য খাতে ব্যয় করা হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আবু রায়হান খান বলেন, যেহেতু নির্বাচন বন্ধসহ ডাকসুর সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল, এ ক্ষেত্রে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ খাতে টাকা নেওয়াও বন্ধ রাখতে পারত। তাছাড়া টাকার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাবও তাদের কাছে নেই। প্রশাসনের উচিত ছিল এসব টাকার স্বচ্ছ হিসাব রাখা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম খান বলেন, সক্রিয় না থাকলেও ডাকসুর জন্য বিগত ২৮ বছর ধরে নিয়মিত ফি দিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। এটি খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। আমরা জানতে পেরেছি, এই ফি থেকে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক বিকাশে ও অন্যান্য কিছু খাতে খরচ করা হয়েছে। এই খরচের পরেও আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় খরচ হচ্ছে কিংবা কত জমা রয়েছে তা শিক্ষার্থীদের জানার অধিকার রয়েছে। ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রদেয় অর্থের স্বচ্ছ হিসাব পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামাল উদ্দীনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া ফি ও খরচের হিসাব দিতে গিয়ে এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস মোল্লা সমকালকে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সবসময়ই ঘাটতি বাজেট। ঘাটতির কারণে বাজেটের ভেতরেই এ টাকা ঢুকে যায়। আর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে টাকা (ডাকসু ও হল সংসদ বাবদ ১২০) নেওয়া হয় তা মূলত বেতন খাতের ভেতরেই নেওয়া হয়। আর যেহেতু ঘাটতি বাজেট, তাই এ টাকা কোথায় খরচ হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।