পাঁচ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

ঘটনাস্থল কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরের ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক। ২৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা। পিচঢালা সড়কের ওপর স্কুলের পোশাক পরা দুই শিশুর ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়েছিল। আফছার ও আফরিন সম্পর্কে ভাইবোন। আফরিনের দুই পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুজনের শরীর থেকেই রক্ত ঝরছিল। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল মাংসপিণ্ড। শরীরের ওপর পড়েছিল তাদের বাবার মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটটি। মোটরসাইকেলের ভাঙা টুকরোগুলো দুই ভাইবোনের লাশের আশপাশে ছড়িয়ে ছিল। দুটি স্কুল ব্যাগও রাস্তায়। একটি লাল, অন্যটি সবুজ আর কালো রংয়ের। বাবার মোটরসাইকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে ঘাতক ট্রাকের চাপায় আফরিন ও আফছার নিহত হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র। যানবাহন চালকদের বেপরোয়া আচরণের কারণেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
একইভাবে গত বছরের মাঝামাঝি সময় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জাবালে নূর পরিবহনের ২ চালকের বেপরোয়া আচরণের কারণে ২ কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের তীব্রতায় টনক নড়ে সরকার ও প্রশাসনের। তখন কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। চালকরাও কিছুটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসে। কিন্তু প্রশাসনের উদাসীনতায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার সড়কে পুরনো চিত্র ফিরে আসে। চালকরা আবারো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে পথচারীরা অগ্রাধিকার পায়। সব ধরনের যানবাহন চালকরা পায়ে হেঁটে চলা পথচারীদের সুবিধা বিবেচনায় রেখেই সড়কে যানবাহন চালায়। কোনো পথচারীকে রাস্তা অতিক্রম করতে দেখার সঙ্গে সঙ্গে চালকরা সতর্ক হয়ে যায়।
ব্যস্ত রাস্তাতেও পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের দিকে চালকরা বেশি মনোযোগী থাকে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে এসব কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা কম হয়। কিন্তু বাংলাদেশের
সর্বত্রই এর বিপরীত চিত্র নজরে পড়ে। যানবাহন চালকদের বেপরোয়া আচরণের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা পথচারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও তোয়াক্কা করে না।
বিশেষজ্ঞদের কাছে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ জানতে চাইলে সবাই এক বাক্যে যানবাহন চালকদের বেপরোয়া আচরণকেই দায়ী করেন। এ ছাড়া চালকদের দক্ষতার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিআরটিএর উদাসীনতা এবং পথচারীদের অসাবধানতাকেও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনাও এক ধরনের খুন। কিন্তু এই খুনের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান না থাকায় যানবাহন চালকরা বেপরোয়া। কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর হলে চালকদের বেপরোয়া আচরণ অনেকাংশে কমবে। তারা সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাবে কিন্তু তা হয়নি। আবার অপরাধ করার পরও সংশ্লিষ্ট চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিআরটিএ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এই দুই সংস্থার উদাসীনতার কারণে চালকরা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে না। সর্বপরি কখনো কখনো পথচারীরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা ইচ্ছেমতো সড়কের যে কোনো স্থান দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। এতেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের দক্ষতা না থাকা সত্তে¡ও মালিকরা গাড়ি চালাতে দেয়। অদক্ষ চালকদের প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। আবার ফিটনেসবিহীন যানবাহনের পুরাতন যন্ত্রাংশ ঠিকমতো কাজ না করায় সড়কে দুর্ঘটনা ঘটে।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সোচ্ছার ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ সংগঠ?নের সভাপতি ই?লিয়াস কাঞ্চন বলেন, চালকদের বেপরোয়া আচরণের কারণেই বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ, বিআরটিএ ও জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলকে আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে। তাহলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের নির্দেশনা থাকা সত্তে¡ও পুলিশ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য রাখে না। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলে নিয়মিত কোনো তথ্য প্রদান করে না।
নিসচার এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৩৯ জনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির পর ৭৪০ জন মারা যায়। আহত হয় ৭ হাজার ৪২৫ জন। নিহতদের মধ্যে গাড়িচাপায় ১ হাজার ৩৮৫ জন, যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫৮৫ জন, গাড়ি উল্টে ২৫৩ জন, খাদে পড়ে ১৩৩ জন ও অন্যান্যভাবে ৬৬৩ জন যাত্রী ও পথচারী নিহত হয়। দুর্ঘটনা কবলিত পরিবহনের মধ্যে ৮৭৯টি বাস, ৭৯৩টি ট্রাক, ৬৩৪টি মোটরসাইকেল, ১১৯টি কাভার্ডভ্যান, ৬৭টি মাইক্রোবাস, ৫০টি নসিমন, ৪৭টি প্রাইভেট কার ও ৩৮টি মাহেন্দ্র।
অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৮ সালে সড়কে ৫ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৭ হাজার ২২১ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৪৬৬ জন আহত হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫০টি যানবাহনের পরিচয় পাওয়া যায়। এসব যানবাহনের মধ্যে ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ বাস, ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ প্রাইভেটকার-জিপ ও মাইক্রোবাস, ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ অটোরিকশা, ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ ব্যাটারি চালিত রিকশা, ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ নছিমন, করিমন ও হিউম্যান হলার।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় সুপারিশমালা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কাছে তা পৌঁছেও দেয়া হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের হার উল্লেখ করার মতো নয়। চালকদের বেপরোয়া আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক আইন অমান্য করার প্রবণতা না কমলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।