গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে কাজ চলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হতে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আদায়ের জন্য দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, রাজনৈতিকভাবে ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি মেনে নিয়েছে দু’টি দেশ এবং একটি দেশ গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সহমর্মিতা জানিয়েছে। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে কম্বোডিয়া গণহত্যা যাদুঘর ও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যা বিষয়টির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চেষ্টা করা হবে। এরই মধ্যে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস ইউনেসকো এশিয়া-প্যাসিফিক আঞ্চলিক কার্যালয়ের কাছে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য একটি প্রস্তাবও উত্থাপন করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা যেমন গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা করছি, ঠিক তেমনি পাকিস্তানও চেষ্টা করছে যেন এই স্বীকৃতি না মেলে।
এই কর্মকর্তা বলেন, শুধু পাকিস্তান নয়, গণহত্যার বিষয়টি বেশকিছু দেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এ সংক্রান্ত যেকোনও পদক্ষেপকে তারা সন্দেহের চোখে দেখে এবং প্রতিহত করার চেষ্টা করে।
উদাহারণ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন ১৯১৫ সালে তুরস্ক কর্তৃক আর্মেনিয়াতে সংঘটিত গণহত্যার কথা। তিনি বলেন, ওই ঘটনার কারণে গণহত্যার বিষয়টি তুরস্কের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ১৯৯২ সাল থেকে আর্মেনিয়া তাদের গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য জাতিসংঘে চেষ্টা করছে। কিন্তু এই চেষ্টায় এখনও তেমন ফল মেলেনি।
বাংলাদেশ কিভাবে কাজ করছে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা গণহত্যার বিষয়টি বিভিন্ন সরকারের কাছে তুলে ধরেছি এবং এ বিষয়ে তাদের সমর্থন চাইছি। এখন পর্যন্ত ভারত ও শ্রীলংকা রাজনৈতিভাবে আমাদের সমর্থন দিয়েছে এবং ভূটান আমাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছে।’
গত বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়ে ঘোষিত যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিষয়টি স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একইভাবে গত বছর জুলাই মাসে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মৈথ্রিপালা সিরিসেনা ঢাকা সফরে এলে ওই সময় ঘোষিত যৌথ বিবৃতিতে একই আহ্বান জানানো হয়। আর গত বছরের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর ভূটান সফরে ঘোষিত যৌথ বিবৃতিতে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য সহমর্মিতা জানায় ভূটান।
এদিকে, এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত আদামা দিয়েং ঢাকা সফর করেন। সফরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘কোনও একটি ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে নাম দেওয়ার কোনও পদ্ধতি জাতিসংঘে নেই।’
জাতিসংঘের এই দূত আরও বলেন, ১৯১৫ সালে আর্মেনিয়াতে যে গণহত্যা হয়েছিল, সেটিকে কয়েকটি দেশ গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও তাদের সংসদে এ দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে গণহত্যার স্বীকৃতি দিতে পারে। এতে কোনও বাধা নেই।
এখানে উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলে ১৯৭১ সালে কোনও ধরনের গণহত্যা হয়েছিল বলে অস্বীকার করতে শুরু করে পাকিস্তান। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিবৃতিও দেয়। বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তান সংসদেও একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।
অতীত মুছে ফেলার এ প্রয়াসকে মোকবিলা করার জন্য সরকার মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। গত বছরের ১১ মার্চ সরকারের শরিক দল জাসদের শিরীন আখতারের উত্থাপিত এক প্রস্তাবে বলা হয়— সংসদের অভিমত এই যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে স্মরণ করে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা হোক। আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
ওই প্রস্তাবের পর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড স্মরণ করতে দিনটি ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।