সানেমের বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী : টেকসই গণতন্ত্রে সব ধরনের অন্তর্ভুক্তি অর্জন সম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

‘যদি সত্যিকার অর্থে আমরা টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি, সত্যিকার অর্থে যদি জনগণকে তার শক্তি সম্পর্কে সচেতন করতে পারি, তাহলে সামাজিক বা বুদ্ধিভিত্তিকসহ অন্যান্য যেকোনো ধরনের অন্তর্ভুক্তি আমরা অর্জন করতে পারব।’ পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান গতকাল সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত চতুর্থ বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এ কথা বলেন।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল শুরু হয়েছে সানেম আয়োজিত চতুর্থ বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলন। এ বছর সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘গভর্নিং নিউ চ্যালেঞ্জেস: ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট, ট্রেড অ্যান্ড ফিন্যান্স’। পরিকল্পনামন্ত্রী সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন। এ সেশনে সভাপতিত্ব করেন সানেমের চেয়ারম্যান ড. বজলুল হক খন্দকার। সূচনা বক্তব্য রাখেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। মূল দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএনএস্কাপ-এসএসডব্লিউএর নয়াদিল্লি শাখার ডিরেক্টর ড. নাগেশ কুমার এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) রিসার্চ ডিরেক্টর ডক্টর বিনায়ক সেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সরকারের অনেক উদ্যোগের পরও সমাজে বৈষম্য বিদ্যমান। এর মূল কারণ হচ্ছে সমাজের ধনী শ্রেণী বহু আগে থেকেই সম্পদ কুক্ষিগত করে আসছে। কিন্তু সরকার দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মোটেই কর্মহীন প্রবৃদ্ধি নয়। যেখানে কর্মহীন প্রবৃদ্ধি হয়, আমরা ওই পর্যায়ে নই। বুদ্ধিভিত্তিক নই, প্রযুক্তিগতভাবেও নই। আমরা চাচ্ছি সুস্থিরভাবে উন্নয়নকাজগুলো হোক। এ কাজে আমাদের বিদেশী বন্ধুদের সহায়তা আছে, ঋণের মাধ্যমে বেশির ভাগ। বলা হয় কোমল সুদ, সেটা কতটা সুদ সেটা আমরা পর্যালোচনা করি, দেখা যায় অতটা কোমল নয়। কিন্তু প্রয়োজন আছে। এ ঋণগুলো আমরা কাজে লাগাই। আমরা স্বীকার করি, আমরা যে কাজগুলো করি সেগুলোয় তাড়াহুড়ো আছে। রাজনৈতিকভাবে আমাদের সময় অনেক চলে গেছে।

সম্মেলনে প্রতিপাদ্যবিষয়ক মূল প্রবন্ধে ড. নাগেশ কুমার এসডিজি বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসডিজি ১৭-এর মূল প্রতিপাদ্য হলো দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা। তবে বিশ্বে সংরক্ষণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবকাঠামো ঘাটতি দূর করতে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানান তিনি। অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে প্রতি বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলার বের হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপর কর আরোপের পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, অক্সফামের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে আটজন ব্যক্তির কাছে বিশ্বের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর চেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে। এ ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এসডিজি বাস্তবায়নে অন্যতম মূল বাধা। বিদেশী বিনিয়োগ মূলত উন্নয়নশীল ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেই যাচ্ছে। কারণ, বিদেশী করপোরেশনগুলো সেসব দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, যেখানে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি।

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে আবারো সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কার বিষয়টি জোর দিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লক চেইন প্রভৃতির আগমন বিশ্ব অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন সংগঠিত করবে। বহু বিদ্যমান চাকরি বিলুপ্ত হবে ও বহু নতুন ধরনের চাকরি তৈরি হবে। আমরা এ পরিবর্তনের জন্য তৈরি নই।

দ্বিতীয় মূল প্রবন্ধে ড. বিনায়ক সেন বাংলাদেশ ও বিশ্বের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ২০০০ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস দুটোই সমানতালে হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে বৈষম্যও বেড়েছে। বাংলাদেশে ভোগব্যয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য বৈশ্বিক পর্যায়ের তুলনায় ১২ থেকে ১৬ শতাংশ বেশি। স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্যের একটি বিপরীতমুখী সম্পর্ক রয়েছে। সেটি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।