ব্যক্তিগত তথ্যের বৈশ্বিক বাজার বিলিয়ন ডলারের

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

নাম, বয়স, লিঙ্গ, বর্ণ, ওজন, উচ্চতা, বৈবাহিক অবস্থা বা সম্পর্ক, সন্তানের সংখ্যা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ, কেনাকাটার ধরন, স্বাস্থ্য, ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা, পছন্দের রঙ-খাবার-ব্যক্তি-স্থান, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ক্রেডিট কার্ড, কর্মস্থল এবং বেতন—এসব বিষয় জানা থাকলে একজন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

এ তথ্য যে পণ্য, তা না জেনে মানুষ ইন্টারনেটে হরদম ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করছে। বর্তমানে ব্যক্তিগত তথ্যের বাজার ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি! ডাটা ব্রোকার বা ইনফরমেশন ব্রোকারদের কাছে একজন ব্যক্তি একটি ডাটা প্যাকেজ। অর্থাৎ ব্যক্তি নিজেই একটি মূল্যবান পণ্য!

কিন্তু কারা এই ডাটা ব্রোকার, কারা কিনছে এবং কীভাবে তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে?

কথায় আছে, ‘বিনা মূল্যের সেবা মানে ভোক্তাই তখন পণ্য’। এটি খুবই সত্য। ফেসবুক বা গুগল অ্যাড চালিয়ে থাকলে বুঝবেন কতটা নির্দিষ্ট করে আপনি সার্চ ফিল্টার ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট বা কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে কতটা নিখুঁতভাবে বিজ্ঞাপন দেখানো সম্ভব।

যেভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়: সরকারি নথি যেমন সম্পদের বিবরণী, আদালতের রেকর্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স,  মোটরগাড়ির রেকর্ড, আদমশুমারি ডাটা, জন্ম সনদ, বিয়ের সনদ, ডিভোর্স রেকর্ড, রাষ্ট্রীয় পেশাদার ও বিনোদন লাইসেন্স রেকর্ড (যেমন মদের লাইসেন্স), ভোটার নিবন্ধন তথ্য, দেউলিয়াত্বের রেকর্ড ইত্যাদি।

বাণিজ্যিক উৎস থেকেও তথ্য ক্রয় বা সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া সাধারণ মানুষের ক্রয়-বিক্রয় তত্পরতা (এর মধ্যে ক্রয়ের তারিখ, টাকার পরিমাণ, অর্থ পরিশোধের ধরন, লয়্যালটি কার্ড, কুপন ইত্যাদি)। বিক্রেতা ও ক্যাটালগ কোম্পানির দেয়া ওয়ারেন্টি রেজিস্ট্রেশন তথ্যও সংগ্রহ করা যায়। এ কাজগুলো মূলত ভোক্তার অগোচরেই করা হয়। সেই সঙ্গে আছে সোস্যাল মিডিয়া সাইট, ওয়েব ব্রাউজিং হিস্ট্রি, কুইজ অ্যাপ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও উন্মুক্ত নানা সোর্স।

স্মার্টফোন অ্যাপস, পরিধানযোগ্য ও ফিটনেস ট্র্যাকার ডিভাইস থেকে আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চলে যেতে পারে কোনো বিপণন বা বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের হাতে। সোস্যাল নেটওয়ার্কে লাইক, কমেন্ট, যোগাযোগ এমনকি অনলাইন সার্চ ও লোকেশনের তথ্যও সংগ্রহ করা হতে পারে গোপন কুকিজ ব্যবস্থা ব্যবহার করে।

২০১৭ সালে মাইক্রোসফট স্বীকার করে, উইন্ডোজ ১০ আগের যেকোনো সংস্করণের চেয়ে ব্যবহারকারীর অনেক বেশি তথ্য সংরক্ষণ করছে। ফিটনেস ট্র্যাকার এখন মামলার সাক্ষী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় গত বছর ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকাকে নিয়ে। ব্যক্তিগত তথ্য বিনা সম্মতিতে সংগ্রহ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রথম দৃষ্টান্ত এটি। ‘দিস ইন ইউর ডিজিটাল লাইফ’ অ্যাপটির ২ লাখ ৭০ হাজার ব্যবহারকারীর মাধ্যমে ৮৭ মিলিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করে তারা। অর্থাৎ অ্যাপ ব্যবহারকারীর বন্ধুর তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে।

ডাটা ব্রোকারদের বাণিজ্য: ব্যক্তিগত তথ্যের ভাণ্ডারকে বলা হচ্ছে ‘নতুন তেলের খনি’! ২০১৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, এ ধরনের ব্যবসার বড় অংশই অদৃশ্য। স্টপডাটামাইনিং ডটমি ৫০টি ডাটা ব্রোকার কোম্পানির একটি তালিকা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ওরাকলের মালিকানাধীন ডাটালজিকস। এ ধরনের চার সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান আছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এর প্রকৃত সংখ্যা আসলেই কেউই জানে না। ব্যক্তিগত ডাটার বর্তমান বাজার ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০১৮ অর্থবছরে ডাটা ব্রোকার অ্যাক্সিওম ৯৪৫ মিলিয়ন ডলার বার্ষিক রাজস্ব অর্জনের কথা জানায়।

ভোক্তা যেভাবে প্রভাবিত হতে পারে: ই-মেইল ইনবক্সে সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন দেখা এবং বিরক্তিকর টেলিমার্কেটিং কলের অভিজ্ঞতা সবারই কম-বেশি আছে। তবে নিউজউইকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত ধারণা দিতে পারে। ‘আপনার পছন্দমতো পণ্যের বিজ্ঞাপনই শুধু দেখানো হবে’ এমন নির্দোষ অজুহাতে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো এসব ডাটা ব্যবহার করে। তবে বেশির ভাগই সম্মতি নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না।

নিউজউইক বলছে, এসব ব্রোকার অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ডাটা সংক্ষেপ করে ভোক্তা স্কোরিং করে। এতে ভোক্তার জীবনে অনেক সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। যেমন পছন্দের স্কুলে শিশুদের ভর্তি করতে পারবেন না, কারণ সিস্টেম বলছে সেই স্কুলের বেতন দেয়ার মতো সামর্থ্য আপনার নেই বা একই কারণে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছেন না। এর চেয়েও খারাপ কিছু হতে পারে যেমন আপনার ড্রাইভিং রেকর্ড ভালো নয়, এ কারণে স্বাস্থ্যবীমা পাবেন না।

আরো বড় ঝুঁকি: সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো কখনো স্ক্যামারদের কাছেও তথ্য বিক্রি করা হয়। ইনফোইউএসএ নামে একটি ডাটা ব্রোকার ১৯ হাজার সুইপস্টেক খেলোয়াড়ের তথ্য স্ক্যামারদের কাছে বিক্রি করে দিলে খেলোয়াড়রা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিগ্রস্ত হন।

গত বছর গ্রিনডার (অনলাইন ডেটিং অ্যাপ) ব্যবহারকারীদের এইচআইভি স্ট্যাটাস তৃতীয় পক্ষের হাত চলে যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডাটা ব্রোকারদের ডাটাবেজও হ্যাকারের কবলে পড়তে পারে। ২০১৫ সালে এক্সপেরিয়ান; ২০১৩ সালে লেক্সিসনেক্সিস, ক্রল ব্যাকগ্রাউন্ড আমেরিকা ইনকরপোরেশন ও ডান অ্যান্ড ব্র্যাডস্ট্রিট; ২০১১ সালে এপসিলন এবং ২০০৩ সালে অ্যাক্সিওম হ্যাকারদের কবলে পড়ে। হ্যাকাররা অ্যাক্সিওমের ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন রেকর্ড চুরি করে। অবশ্য তখন শুধু স্প্যামের জন্য এসব তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

কনজিউমার ক্রেডিট রিপোর্টিং এজেন্সি: আমেরিকার কনজিউমার ক্রেডিট রিপোর্টিং এজেন্সি ট্রান্সইউনিয়ন। এটি ক্রেডিট কার্ডধারীদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। প্রতিষ্ঠানটি অন্তত ৩০টি দেশের শতকোটির বেশি গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করে। ৬৫ হাজারের বেশি গ্রাহক আছে তাদের। ফেসবুকও এদের গ্রাহক। শিকাগো, ইলিনয়ভিত্তিক এ সংস্থার ২০১৪ সালের রাজস্ব ছিল ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন। তবে বিশ্বের সেরা তিন ক্রেডিট এজেন্সির মধ্যে এটির রাজস্ব সবচেয়ে কম। বাকি দুটি হলো এক্সপেরিয়ান ও ইকুইফ্যাক্স। এই তিনটিকে বলা হয় বিগ থ্রি। এ ধরনের প্রচুর সংস্থা রয়েছে, যেগুলো ডাটা ব্রোকার হিসেবে কাজ করে।

আইন কী বলে? ক্রেডিট রিপোর্টিং এজেন্সিগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। আমেরিকার ফেয়ার ক্রেডিট রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফসিআরএ) ১৯৭০ অনুযায়ী, গ্রাহকের লেনদেন আচরণ সম্পর্কিত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা মোটেও বেআইনি নয়। এ আইন ডাটা ব্রোকার এবং ক্রেডিট রিপোর্টিং অথবা কনজিউমার রিপোর্টিং এজেন্সির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। এ আইন গ্রাহককে তার ক্রেডিট রিপোর্টে প্রবেশ এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয়। তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সীমাও নির্ধারণ করে দেয়। ফলে তথ্য সুরক্ষা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহক আইনি নিরাপত্তা পান। তবে এই আইনেও ফাঁক আছে। কেউ তার অসম্মতিতে তথ্য ব্যবহার নিয়ে আইনের আশ্রয় চাইতে গেলে তাকে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে।

কিন্তু ডাটা ব্রোকারদের জন্য কোনো আইন নেই। এ সুযোগে অনেকে ডিপ ওয়েব বা ডার্ক ওয়েবে সাইবার ক্রিমিনালদের কাছে অথবা নিলামে ডাটা বিক্রি করে।