স্কুলে ছেলেরাও শিখছে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

   

 


কম্পিউটারে গেম খেলার মাধ্যমে ছেলের জন্য চলছে যৌন ও স্বাস্থ্যশিক্ষার ক্লাস
‘জেনারেশন ব্রেকথ্রু’ কর্মসূচির মাধ্যমে ছেলেরাও স্কুলেই শিখছে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা। এজন্য নির্দিষ্ট স্কুলগুলোতে রয়েছে কিশোর-কিশোরী কর্নার। ঢাকা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা— এই চার জেলার বেশ কয়েকটি স্কুলে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের নারী-পুরুষ সমতার ধারণা, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যাগুলো মোকাবিলার বিষয়ে শেখাচ্ছেন শিক্ষকেরা।

এরকম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। সেখানেও রয়েছে কিশোর-কিশোরী কর্নার। সম্প্রতি  মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে সরেজমিনে দেখা গেছে,  কিশোর শিক্ষার্থীরা লুডু এবং কম্পিউটার গেমের মাধ্যমে যৌন ও প্রজনন শিক্ষার পাঠ নিচ্ছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ফয়সাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, এই গেমের মাধ্যমে ‘স্বপ্নদোষ’র বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানলাম।  এর মাধ্যমে বাস্তব জীবন সম্পর্কে শিক্ষা পেলাম। আব্বু-আম্মু  এগুলোর বিষয়ে আমাদের সামনা-সামনি কখনও কিছু বলে না।  তবে বন্ধুবান্ধবসহ অনেকের কাছে আগেও কিছু কিছু শুনেছি। এরপর জেনারেশন ব্রেকথ্রু গ্রুপে ঢুকে বেশি জানতে পেরেছি।  কারও যদি কোনও সমস্যা হয়ে থাকে,এখানে কম্পিউটারে গেম খেলে আমরা যেটা শিখেছি, সেটা অবশ্যই তাদেরকে বলবো। আমরা এখন বুঝতে শিখেছি—  এটা কোনও সমস্যা না,বয়ঃসন্ধিকালে এরকম  হয়ে থাকে।’
নারী-পুরুষ সমতার বিষয়ে ফয়সাল জানায়, ‘ছেলেমেয়েদের শারীরিক গঠন আলাদা, কিন্তু তাদের চিন্তা-ভাবনা একই রকম।  হয়তো কারও কারও ক্ষেত্রে অন্যরকম হয়। অনেক অফিসে দেখা যায়, ছেলেদের বেশি আর মেয়েদের কম বেতন দেওয়া হয়। এটা ঠিক নয়। আমরা এশিয়া কাপে দেখেছি, নারীরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। শারীরিক গঠন তাদের দমাতে পারেনি।’
কম্পিউটারে শিক্ষামূলক গেম খেলছে ছেলেরা
ইভটিজিং খারাপ উল্লেখ করে ফয়সাল  বলে,‘ইভটিজিং মেয়েদের মানসিকতার ওপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা কাউকে ইভটিজিং করতে দেখলে, অবশ্যই কাছে গিয়ে বলার চেষ্টা করবো যে, এসব ঠিক না। মেয়েদেরও সমানভাবে সমাজে মাথা উঁচু করে হাঁটার অধিকার রয়েছে। সেই সুযোগ-সুবিধা তাদের দেওয়া উচিত। টিচারদের শেখানে এসব বিষয়গুলো অবশ্যই আমাদের কাজে লাগছে। আমাদের বয়সী ছেলেরা যৌন সমস্যার মুখোমুখি হলে অনেকে হতাশ হয়ে পড়ে। এই যে ডিপ্রেশনে যারা পড়ে,তাদের জন্য এই ক্লাসগুলো খুবই উপকারী।’
অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সাকিব হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, ‘আসলে পারিবারিকভাবে এতটা বলা হয় না। বরং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে এখান থেকে শেখা যায়।  যখন বীর্জপাত হবে তখন কী করতে হবে, সে সম্পর্কে জেনেছি। এখানে যা শিখেছি তা বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাপ করেছি।  তারা বলেছেন, এটা জানার জন্য খুবই ভালো উদ্যোগ।’
ছেলে ও মেয়ের সম্পর্কের বিষয়ে সাকিবের ভাষ্য— ‘মেয়েদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব ছেলেদের দায়িত্ববান হওয়া উচিত। যতটা সম্ভব খারাপ আচরণ না করা, তারা কষ্ট পায় এমন কথা না বলা।  ছেলে আর  মেয়ে— আমাদের মধ্যে   লিঙ্গ বৈষম্যটাই শুধু তফাত। তাছাড়া, নারী-পুরুষ সমানতালে কাজ করছে, তেমন কোনও তফাত নেই।’

স্কুলে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে কতটা শেখানো হয় জানতে চাইলে সাকিব বলে, সাখাওয়াত হোসেন স্যার এই বিষয়ের ক্লাস নেন।  উনি বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝিয়েছেন। কোনও  প্রবলেম হলে তার কাছে হেল্প পাওয়া যায়। স্যার বন্ধুর মতোই আচরণ করেন।’
নবম শ্রেণির ছাত্র সাইফ আহমেদ বলে, এখান থেকে দুটি জিনিস আমরা শিখতে পেরেছি। তারমধ্যে প্রধানত জেন্ডার ইক্যুইটি, অর্থাৎ নারী পুরুষ সমতা। এছাড়া, বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটে সংকোচের কারণে যা বলতে পারি না। এই সংকোচ থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, সেগুলো ফ্রিলি আমাদের স্যার আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন ধরনের গেমস ও প্রোগ্রামের মাধ্যমে তিনি আমাদের শিখিয়েছেন।’
কম্পিউটারে শিক্ষামূলক গেম খেলছে ছেলেরা
সাইফ আহমেদ  জানায়, এখানে বিভিন্ন গেমসের মধ্যে চারটি প্রোগ্রাম আছে। এছাড়া, লুডুর মতো গেম আছে। মজার খেলার একটা গেম আছে, যেখানে প্রতিটি স্টেপে আমরা তথ্য জানতে পারছি। অর্থাৎ, আমরা খেলতে খেলতে সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারছি। আমাদের স্যাররা যেভাবে ইন্সপায়ার্ড করেন, তারা যেভাবে কথা বলেন, এটার প্রভাব অটোমেটিক আমাদের মধ্যে পড়ে।’
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন ও ওয়াজেদ আলী ছাত্রদেরকে ‘যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা’ পড়ান। সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমাজ বিজ্ঞান বইয়ে এগুলো নিয়ে চ্যাপ্টার আছে— নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আকর্ষণ। পরস্পর বোধ সৃষ্টি হওয়া। আমরা বিষয়গুলো সম্পর্কে পড়াতে গিয়ে একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে থাকি।  কারণ, কিশোরদের জন্য এগুলো শেখা খুবই জরুরি। তবে  সবাইকে আমরা সম্পৃক্ত করতে পারছি না, পারলে  আরও ভালো হতো।  প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। আমাদের ক্লাস রুটিনে এটি নিতে পারলে ভালো হতো। যদি ক্লাসে আলাদাভাবে এটি শেখাতে পারতাম,তাহলে বেশি ভালো হতো।’
যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার অংশ হিসেবে দশ-ঊনিশের মোড় লুডু খেলছে ছেলেরা
এই কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যতগুলো প্রজেক্ট আসে, আমরা সেগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন করি। আমার চার জন শিক্ষক সবসময় কাজ করেন। কোনও শিক্ষাই আসলে ফেলনা না।  একটা বয়সের দোষ আছে, আমরা বলি টিনেজার বয়স। এই সময়টায় তাদের উড়ু উড়ু ভাব থাকে। কিন্তু একটা বয়সের পরে তারা কিন্তু বদলায়। জেনারেশন ব্রেকথ্রু’র কর্মসূচি আমাদের জন্য বাড়তি কাজ হলেও,এটি সারাজীবন মনে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘নিয়ম মাফিক রুটিন থাকলে সেই কাজটা বাস্তবায়ন করা সহজ হয়। সরকার নিয়ম মতো তাগাদা দেয়, আমরা কাজটা করি। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা বিষয়টি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। কারিকুলামে থাকলে যেকোনও জিনিস ওদের শেখাতে আমাদের জন্য সহজ হয়।’

এদিকে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলছেন— এই ‘জেনারেশন ব্রেকথ্রু’ প্রকল্পটি মেয়াদ শেষে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তারা মনে করেন, এতে কিশোর-কিশোরীরা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।

শিক্ষকরা চাইছেন, মূল পাঠ্যবইয়ে এ-সংক্রান্ত দুটি অধ্যায় রাখা হোক। এতে করে সব শিক্ষার্থী এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।