মার্কিন বাণিজ্য আলোচনায় প্রধান ইস্যু চীনের মুদ্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

চীন-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে চীনের মুদ্রা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য চুক্তিতে মুদ্রা কারসাজির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। রফতানিকারকদের সুবিধার্থে চীনা মুদ্রা কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ তুলেছেন, নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য এশীয় জায়ান্ট চীন তাদের মুদ্রাকে কৃত্রিমভাবে অবমূল্যায়িত করছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, মুদ্রা ইস্যুতে চীনের সঙ্গে আমাদের একটি চুক্তিতে পৌঁছতে হবে। হোয়াইট হাউজের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ল্যারি কুডলো গত বৃহস্পতিবার জানান, খসড়া চুক্তিতে মুদ্রা কারসাজি নিষিদ্ধ করা হবে এবং চীনা কর্তৃপক্ষ যদি মুদ্রাবাজারে কোনো হস্তক্ষেপ করে, তবে তা প্রতিবেদন আকারে পেশ করতে বাধ্য করা হবে।

তবে মুদ্রা ইস্যুর কেন্দ্রে রয়েছে একটি স্ববিরোধিতা। তা হলো, চীন নিশ্চয়ই চায় না তাদের মুদ্রা দুর্বল হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইউয়ানের ওপর নিম্নমুখী চাপ প্রয়োগ করছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধি।

চীনের মুদ্রা ইউয়ান কিংবা রেনমিনবি (আরএমবি) সহজে বিনিময়যোগ্য নয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে চীনা মুদ্রা প্যারিটি রেটের ২ শতাংশ সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। চীনা সরকারই এ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রতিদিন একটি সেন্ট্রাল প্যারিটি রেট নির্ধারণ করে পিপলস ব্যাংক অব চায়না।

মুদ্রার মূল্য ওঠানামার সীমা নির্ধারিত থাকায় দেশটির মুদ্রা খুব একটা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয় না। গত পাঁচ বছরে ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মান ছিল ৬ দশমিক ২০ থেকে ৬ দশমিক ৮০। ঐতিহাসিকভাবে এটিই ইউয়ানের সর্বোচ্চ বিনিময় মূল্য। চলতি শতাব্দীর শুরুর দশকে ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মূল্য ৮ দশমিক ২৮ স্থির করা হয়েছিল।

২০১৭ সালে আরএমবি ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছিল। অন্যদিকে গত বছর চীনা মুদ্রার মান ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা কিনা গত এক দশকে সর্বনিম্ন। এ কারণেই বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তোলার সুযোগ পাচ্ছে যে, কারসাজির মাধ্যমে মুদ্রাকে অবমূল্যায়িত করা হচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, আরএমবিকে অবমূল্যায়িত করা হয়নি। গত বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইএমএফ জানায়, কারেন্সি বাস্কেটের বিপরীতে আরএমবি মোটামুটি স্থিতিশীল আছে এবং মুদ্রা ব্যবস্থার মূল ভিত্তিগুলোর সঙ্গেও এটি সংগতিপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ও নিয়মিতভাবে আইএমএফের বক্তব্যকে মেনে নিচ্ছিল। গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বেইজিং মুদ্রা কারসাজি করছে না।

২০১৫ সালের আগস্টে বিশ্বের মুদ্রাবাজারকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল বেইজিং। এ সময় ইউয়ানের মান এক সপ্তাহে ৫ শতাংশ পড়ে যায়। ২০১৫-১৬ সালের মুদ্রার পতন ঠেকাতে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করেছিল পিপলস ব্যাংক অব চায়না। ইউয়ান কিনতে তখন বিশাল অংকের বিদেশী মুদ্রার মজুদ ব্যয় করে ব্যাংকটি, যার ফলে আরএমবি স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের মুদ্রার সাম্প্রতিক পতনের জন্য কারসাজি দায়ী নয়। বরং চীনের অর্থনৈতিক শ্লথগতি, মার্কিন সুদহার বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যযুদ্ধের কারণেই দেশটির মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ইউয়ান দুর্বল হওয়ায় পণ্য রফতানিতে সুবিধা পাচ্ছে চীন। এর ফলে দেশটি সহজে পণ্য রফতানি করতে পারছে এবং মার্কিন শুল্কের প্রভাবকে আংশিকভাবে এড়াতে পাড়ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির বিরুদ্ধে যুক্তি দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, চীন তাদের মুদ্রার অত্যধিক পতন ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের প্রধান অ্যাডাম পোসেন ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন, আধুনিক বাণিজ্য সমস্যাকে ১৯৫০-এর দশকের কৌশল দিয়ে নিরসন করা যাবে না। শুল্ক কিংবা মুদ্রা বিনিময় হার দিয়ে আধুনিক বাণিজ্য সমস্যার সমাধান হবে না।