প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্যে সুদিনের অপেক্ষায় চিনি শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

বাংলাদেশে মোট ১৫টি চিনিকল রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ব্রিটিশ আমলে, ৯টি তৎকালীন পাকিস্তান আমলে এবং ৩টি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্থাপিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলটি সবচেয়ে পুরাতন। এটি স্থাপিত হয় ১৯৩৩ সালে। এসব চিনিকলে সরাসরি প্রায় ২২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। আর আখ চাষের উপর নির্ভর করে উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫০ লাখ লোকের জীবিকা।

চিনিকলগুলো দেখভালের দায়িত্ব বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের। করপোরেশন শুধু চিনি উৎপাদন নিয়েই কাজ করে না। আখ থেকে চিনি তৈরির পর উচ্ছিষ্ট দিয়ে তৈরি হয় নানা উপজাত দ্রব্য। তাছাড়া চিনিকলের আওতাধীন যেসব জমিতে আখ চাষ হয় না সেসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফল চাষ করা হয়। আর জলাশয়ে চাষ করা হয় মাছ। কৃষি ভিত্তিক চিনি শিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ এলাকায় রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ব্যাংক, হাটবাজার, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে যা দেশের উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এ কে এম দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে চিনি শিল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় ঢাকাটাইমস প্রতিবেদকের। চিনি শিল্পকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য তিনি যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন সেসব বিষয় তুলে ধরেন বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু। তবে, চিনি শিল্পের বর্তমানে সবচেয় বড় সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বাজারে চিনির কম দামের কথা উল্লেখ করেন।   

এ কে এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আড়াই কেজি চালের সমান ছিল এক কেজি চিনির মূল্য। আর মসুরের ডাল বলেন সয়াবিন তেল বলেন তার চেয়ে চিনির মূল্য বেশি ছিল। তিন-সাড়ে তিন মাস জমি ব্যবহার করে আজ আমাদের উৎপাদিত মসুরের ডাল বিক্রি করছি ৯০ টাকা কেজি। আর আমি চিনি ৫০ টাকা বিক্রি করতে পারছি না। বলতে দ্বিধা নাই, লবণ ৩৮-৪০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। চিনির মূল্যের কাছাকাছি হয়ে গেছে। ফার্মের মুরগীর দাম সস্তা, দেশি মুরগীর দাম বেশি। আমাদের চিনি পৃথক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ। আমাদের বাংলাদেশের জমিতে চাষ করা আখ থেকে উৎপাদিত হচ্ছে এসব চিনি।’

করপোরেশনের আওতাধীন মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার একর। এর মধ্যে খামারে ১৭ হাজার ২২৫ একর কারখানা, অফিস ও আবাসিক এলাকায় ১ হাজার ৭৭৫ একর জমি আছে। খামারের ১৭ হাজার ২২৫ একর জমির মধ্যে আখ আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ৪৩ একর। অন্যান্য ফসল আবাদযোগ্য জমি ৮৩৮ একর। অনাবাদি জমি, বনাঞ্চল ও পুকুর ৩ হাজার ৩৪৪ একর। কুষ্টিয়ায় স্থাপিত রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি সুগারমিলের প্রয়োজনীয় যন্ত্র/যন্ত্রাংশ তৈরি, মেরামত, আমদানি ও বিকল্প যন্ত্র তৈরি করে।

ঢাকাস্থ দিলকুশায় ৯ তলা বিশিষ্ট একটি নিজস্ব অফিস ভবন বিএসএফআইসির সদর দপ্তর হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনটি বর্তমান সরকারের আমলে (১৯৯৬-২০০১) নির্মিত হয়েছে। সম্প্রতি সদর দপ্তরের নীচতলায় আন্তর্জাতিক মানের দুইটি প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মিলগুলোর নিজস্ব খামারে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, শাকসবজি, আখ থেকে উৎপাদিত চিনি, ভিনেগার এবং কেরুজ জৈবসার প্রতিনিয়ত বিক্রয় করা হচ্ছে এই প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্রে।

সকল চিনিকলে উৎপাদিত উপজাত মোলাসেস ব্যবহার করে গো খাদ্য তৈরি ও বিপণন করা হচ্ছে মিল এলাকায়। চিনিকলের উপজাত প্রেসমাড ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আখ আবাদের অনুপযোগী ও অব্যবহৃত জমিতে ড্রাগন ফল চাষ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সুগারমিলের পরিত্যক্ত স্থান/স্থাপনায় মাশরুম চাষের উৎপাদন ও বিপণন শুরু হয়েছে।

সকল সুগারমিলের পতিত জমিতে ভিয়েতনামী খর্বাকৃতি জাতের ১০০০ নারিকেলের চারা রোপণ করা হয়েছে। আখের সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন প্রকার স্বল্পমেয়াদী শাকসবজি ও ডাল উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন চিনিকলের কৃষি ও পরীক্ষামূলক খামারের নিজস্ব জমিতে। এ সমস্ত শাক সবজি, ডাল ইত্যাদি স্থানীয় বাজারে এবং ঢাকাস্থ সদর দপ্তরের বিপণন কেন্দ্রে সুলভ মূল্যে বিক্রয় করা হচ্ছে। এ সমস্ত কার্যক্রম ঠিকঠাক চললে খুব শীঘ্রই লোকসান কাটিয়ে চিনি শিল্প একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে মনে করেন বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান।

সময় বদলেছে। দেশে ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি ও উন্নয়নের বিপ্লব ঘটে গেছে। আখ চাষীদের সাথে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান প্রদানের লক্ষ্যে তাই ই-পুঁজি চালু করা হয়েছে। আগে চাষীরা তাদের আখ বিক্রির অর্থ যথাসময়ে পেতেন না। তাদের হয়রানি করা হতো। এ সমস্যার সমাধানে এখন মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে তাদের অর্থ দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে বিএসএফআইসি। এটি ই-ক্যাশ নামে পরিচিত। আর ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করায় ওজনে এখন কম দেয়ার সুযোগ নেই। চিনিকলে ই-ক্যাশ, ই-গেজেট, ই-পুঁজি এবং ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহৃত হওয়ায় আখ চাষীদের হয়রানি অনেকটাই দূর হয়েছে। আখ চাষীদের মধ্যেও ব্যাপক আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। চাষীরাও আখ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেব দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি উদ্যোগে চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন ও বহুমুখীকরণের পাশাপাশি নিজস্ব চিন্তা চেতনা থেকে আখচাষী তথা মিলের সকল স্তরের শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করি। চাষীদের আখ চাষে উৎসাহিত করতে সক্ষম হয়েছি এবং কর্মবিমুখ সকল শ্রমিক কর্মচারী-কর্মকর্তাগণ এখন আখচাষীও বটে। বাধ্যতামূলক করা হযেছে মিলে কর্মরত সকলের জন্য আখের আবাদ। মিলের কাঁচামালে ঘাটতি পুরণের লক্ষ্যে বর্তমানে এটি একটি সফল উদ্যোগ। আখচাষী, শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের নিকট উন্মুক্ত করে দিয়েছি আমার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর। এখন সকলে তাদের সুখ-দুঃখের কথা, বিভিন্ন সমস্যার কথা আমার সাথে সরাসরি শেয়ার করতে পারেন। আমি ধৈর্য্যরে সাথে তাদের কথাবার্তা শুনি এবং তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়ার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে তাদের সাথে কুশলাদিও বিনিময় করি, এতে তারা যথেষ্ট অনুপ্রাণিত হয় বলে আমি মনে করি।’

চিনিকল করপোরেশনের আওত্তাধীন চিনিকলসমূহ

পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেড, ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস লিমিটেড, শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড, জয়পুরহাঁট সুগার মিলস লিমিটেড, সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড, রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড, ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড, নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড, কেরু এন্ড কোং (বিডি) লিমিটেড, পাবনা সুগার মিলস লিমিটেড, রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর সুগার মিলস লিমিটেড, জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেড, কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড, মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড।