আখচাষিদের আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

এ কে এম দেলোয়ার হোসেন। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান। তার কুশলী নেতৃত্বে গতি এসেছে সরকারি সব চিনিকলে। এ খাতের সমস্যা সমাধানে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কাজ করেছেন দেশজুড়ে। আখ চাষিদের কাছে গিয়েছেন। এ কে এম দেলোয়ার হোসেন গতিশীল করেছেন সরকারি উদ্যোগে চিনি উৎপাদন কার্যক্রম। এর সুফল পেয়েছে আখ চাষিরাও। এসব নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকাটাইমসের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেন।

 

সরকারি চিনিকলগুলো লোকসানে ছিল। আপনি দায়িত্বে এসে সংকট উত্তরণে কী করেছেন?

চিনি আমাদের খাদ্যতালিকায় অপরিহার্য এক উপকরণ। ধনী-গরিব প্রতিটি পরিবারেই দৈনন্দিন জীবনে এর চাহিদা বিদ্যমান। যে খাদ্যপণ্যের এত চাহিদা, সে পণ্য কেন অবিক্রীত থাকবে। কেন আমাদের চিনিকলগুলো লোকসান দেবে? এ নিয়ে চিন্তা করে আমি দেখলাম, চিনিকলগুলোতে অনেক চিনি অবিক্রীত পড়ে আছে। এগুলোকে বিক্রির ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি সহকর্মী ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলি। তখনকার শিল্পমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গেও কথা বলি। এক সময় সরকারি চিনিকলগুলোতে উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম মূল্যে চিনি বিক্রি করা হতো। দেখলাম, এটি করা হলে কোনো দিনও চিনিকলগুলোর লোকসান কাটানো যাবে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুনভাবে সরকারি চিনিকলের চিনির দর নির্ধারণ করি।

এই সিদ্ধান্তে তো ঝুঁকিও ছিল।

দেখুন, আমাদের উৎপাদিত চিনির মান ভালো হলেও তা ক্রেতাসাধারণের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রথমত, দেশের মানুষের মধ্যে এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রত্যেকেই প্যাকেটজাত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাদ্যপণ্য আশা করে। প্রথমে আমি চিনির দর ৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৪ টাকা, পরে ৪৮ টাকা এবং সর্বশেষ মিল গেটে ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছি। এক্ষেত্রে আমি উন্নতমানের প্যাকেট করে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছি। মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় শপিং মলে-সব জায়গায় এখন আমাদের চিনির প্যাকেট বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এখন আমাদের চিনির জন্য ক্রেতারা রীতিমতো লাইন ধরে। মজার ব্যাপার হলো, গুদামে পড়ে থাকা সব সরকারি চিনি ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। এসব চিনি বিক্রি করায় সরকারের অতিরিক্ত আয় হয়েছে ৩৪০ কোটি টাকা। ফলে চিনিশিল্প করপোরেশন বড় ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পায়।

আপনি সব চিনিকলই পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাই।

চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি প্রতিটি চিনিকলে গিয়েছি। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছি, দীর্ঘ বৈঠক করেছি। তাদের প্রস্তাবনা জেনেছি। একই সঙ্গে আমি আখ চাষিদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়েছি। কারণ তারাই চিনিকলের প্রাণ। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করেছি।

চাষিদের জন্য কী করেছেন?

চিনিকলে পুরোনো পদ্ধতি ব্যবহার করে ওজনে কারচুপি করা হতো। এতে চাষিরা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতো। বেশি আখ বেচেও টাকা পেতো কম। চাষিরা সময়মতো আখ বিক্রির টাকাও পেতো না, অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের নানাভাবে হয়রানি করত। মাঠে আখ উপযোগী হলেও যথাসময়ে তা চিনিকলে সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হতো না।

চিনিকলের আধুনিকায়নে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন?

পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে চিনি উৎপাদনের খরচ বেশি হয়। এটা করপোরেশনের লাভকে অনিশ্চিত করে দেয়। এসব সমস্যার সমাধানে আমি শিল্পমন্ত্রী, শিল্প সচিব ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করি। তাদের বুঝাই যে, চিনিকল পরিচালনায় ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। আমার সঙ্গে তারা একাত্মতা প্রকাশ করেন। এখন ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে চাষিরা সঠিক মূল্য পাচ্ছে। এভাবে শেখ হাসিনার সরকার আখ চাষিদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করেছে।

চিনিকলে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।

সময় পাল্টেছে। দেশে ইতিমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটে গেছে। আখ চাষিদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের লক্ষ্যেই গেজেটে ই-পুঁজি চালু করা হয়েছে। আগেই বলেছি, চাষিরা আখ বিক্রির অর্থ যথাসময়ে পেতো না, তাদের হয়রানি করা হতো। এ সমস্যার সমাধানে এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের অর্থ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা ই-ক্যাশ নামে পরিচিত। আর ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করায় ওজনে এখন কম দেওয়ার সুযোগ নেই। চিনিকলে ই-ক্যাশ, ই-গেজেট, ই-পুঁজি এবং ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে- এতে আখ চাষিদের হয়রানি অনেকটাই দূর হয়েছে। আখ চাষিদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। তাই আখচাষ আবার বাড়ছে।

অন্য প্রসঙ্গে আসি। সরকারি চিনিকলে কর্মসংস্থান হয়েছে কত জনের?

দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৩টি ব্রিটিশ আমলে, ৯টি তৎকালীন পাকিস্তান আমলে এবং ৩টি বাংলাদেশ আমলে স্থাপিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল সবচেয়ে পুরোনো। এটি স্থাপিত হয় ১৯৩৩ সালে। এসব চিনিকলে সরাসরি প্রায় ২২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর আখ চাষের ওপর নির্ভর করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়- কৃষিভিত্তিক চিনিশিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ এলাকায় রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংক, হাট-বাজার, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে ওঠেছে, যা দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে।

দেশে চিনি আমদানিও হয়ে থাকে। এ নিয়ে কী বলবেন?

২০০২ সালে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চিনি আমদানি অবাধ করা হয়। পরে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধিত চিনি উৎপাদনের জন্য সরকারের নিবন্ধিত ছয়টি সুগার রিফাইনারি ২০০৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে আসে। নিবন্ধনপত্রে শর্ত ছিল উৎপাদিত পণ্যের ৫০ শতাংশ রপ্তানি করা হবে। কিন্তু এ শর্ত তারা মানছে না। উল্টো তারা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সরকারি ১৫টি চিনিকলের উৎপাদিত চিনির বাজার চাহিদা নষ্ট করছে।

আখ থেকে উৎপাদিত চিনি কতটা স্বাস্থ্যসম্মত?

সারা বিশ্বে ৮০ শতাংশ চিনি উৎপাদন হয় আখ থেকে। আর ২০ শতাংশ হয় সুগারবিট থেকে। কারণ আখের চিনি হলো স্বাস্থ্যসম্মত ও মানবদেহের জন্য উপকারী। অন্যদিকে পরিশোধিত চিনি সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত হয়। যাতে মিষ্টির কোনো মৌলিক ভিত্তি নেই। এজন্য বিভিন্ন দেশ পরিশোধিত চিনি বর্জন করা শুরু করেছে। কারণ এই চিনি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আমাদের দেশের সরকারি মিলে উৎপাদিত চিনি রপ্তানির কোনো সুযোগ আছে?

এ নিয়ে আমি আশার কথাই বলব। কারণ আমাদের মিলগুলোর চিনি সম্পূর্ণ আখ থেকে তৈরি। মানসম্মত প্যাকেট ও গুণাগুণ উল্লেখ করে আমরা যদি বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি, তবে রপ্তানির পথ সুগম হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবশ্যই অগ্রগতির খবর দিতে পারব।

সরকারি চিনিকলগুলো বহুমুখীকরণে আর কী করছেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে আমরা বিচার-বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি, শুধু আখের ওপর নির্ভর করে চিনিশিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সময়ের বিবেচনায় এর আধুনিকায়ন এবং বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। চিনিকলগুলোতে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ছাড়াও প্রচুর পতিত জমি রয়েছে। এগুলোকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। স্বাধীনতার পর বর্তমান সরকার সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ছাড় করেছে এই খাতে। এর ফলে সরকারি চিনিকলগুলো বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা পুরোনো যন্ত্রপাতি মেরামত করছি। প্রয়োজনীয় উন্নতমানের নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় করছি।

চিনি উৎপাদনের বাইরে আর কী ভাবনা আছে?

চিনিকল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি মাথায় আছে। এভাবে নিজস্ব কারখানায় ব্যবহারের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধিত চিনি উৎপাদনে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বায়োগ্যাস উৎপাদনও সম্ভব। যেখান থেকে গ্যাস আসবে। আবার সারও আসবে, যা আখ ও সুগারবিট চাষে কাজে লাগানো যাবে।

এবার আলোচনা শেষ করব। আপনার স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাই।

আমি প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করি ত্রিশ লাখ লোকের রক্তের বিনিময় ও অসংখ্য মা- বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ। আমরা সেই স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক। আমরা যদি বাংলাদেশকে উন্নত ও সুখী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তবেই শহীদদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হবে। আমি এমন একটি দেশ প্রতিষ্ঠার একজন সৈনিক হিসেবে আমার ওপর থাকা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এভাবে আমার স্বপ্ন হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় নিজের জায়গা থেকে ভূমিকা রাখা।