সেবার মানের ভিত্তিতে অপারেটরদের র‍্যাংকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

সেবার মান নিয়ে সেলফোন গ্রাহকদের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমিত পরিসরে অপারেটরদের সেবার মান পর্যবেক্ষণে যন্ত্র আমদানি করেছে। সম্প্রতি তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবার মান পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। তবে এক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় নীতি (পিপিআর) অনুসরণ না করে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

জানা গেছে, পাই টেকনোলজিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে তিন মাসের চুক্তিতে সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান পরীক্ষার দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এতে মূল্য সংযোজন করসহ মাসে ব্যয় হবে ৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা। তিন মাসের চুক্তিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি ড্রাইভ টেস্টের যন্ত্রপাতি সুরক্ষায় বীমা করার প্রয়োজনীয় অর্থও প্রদান করবে বিটিআরসি। আর দীর্ঘমেয়াদে ড্রাইভ টেস্ট কার্যক্রম সম্পূর্ণ আউটসোর্স করতে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে কাজ করছে। যাচাই-বাছাই করে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। চলতি বছর টেলিযোগাযোগ খাতে সেবার মানোন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সেলফোন অপারেটরদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেবার মানের ভিত্তিতে অপারেটরদের র‍্যাংকিং করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন, সেটিও নির্ভর করবে এ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের ওপরই। অথচ দরপত্র আহ্বান ছাড়াই এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে নির্বাচন করা হয়েছে। এমনকি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কার্যাদেশ দেয়ার যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলোও এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। এছাড়া সেবার মান পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠানটি তাদের যন্ত্র ব্যবহার করবে। এজন্য বীমার অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব তাদেরই।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, পিপিআর অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। উন্মুক্ত দরপত্র কিংবা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে ক্রয়াদেশ দেয়া যায়। উন্মুক্ত দরপত্রের ক্ষেত্রে অনুমোদনের বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। আর সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য বা সেবা নেয়া যায়। এছাড়া কোনো পণ্য বা সেবার একমাত্র সরবরাহকারী হিসেবে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও ক্রয়াদেশ প্রদানের বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা সেবা যদি অনেক প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করতে পারে, সেক্ষেত্রে একতরফাভাবে পিপিআর না মেনে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানই ক্রয়াদেশ দিতে পারে না।

এর আগে সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান পর্যবেক্ষণ ও গ্রাহকরা প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন কিনা তা জানতে ২০১৫ সালে দেশব্যাপী জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে বিটিআরসি। দেশের ১৫টি জেলাকে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করে কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও সেলফোন অপারেটরদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত তিনটি কমিটি এ কার্যক্রমে অংশ নেয়। সেলফোন অপারেটরের কাছ থেকে সংগৃহীত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরিচালিত হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির এ কার্যক্রম।

ভয়েস ও ডাটাভিত্তিক সেবার মান পর্যবেক্ষণে ২০১৬ সালে বহনযোগ্য যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেয় বিটিআরসি। একই বছর ফিনল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান এনাইটের কাছ থেকে সংগ্রহ করা এসব যন্ত্র ব্যবহার শুরু হয় গত বছর থেকে। তবে সেবার ব্যাপ্তি বিবেচনায় এটিকে অপ্রতুল মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিটিআরসির দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সেবার মান পরীক্ষায় ড্রাইভ টেস্ট কার্যক্রম তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

দেশে সেলফোন গ্রাহকদের অভিযোগ মূলত কল ড্রপসহ সার্বিক সেবার মান নিয়েই। বিটিআরসির তথ্যমতে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর সময়ে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কে কলড্রপ হয় ১০৩ কোটি ৪৩ লাখ, রবির ৭৬ কোটি ১৮ লাখ, বাংলালিংকের ৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ও টেলিটকের প্রায় ৬ কোটি। অপারেটররা প্রতি মাসে জমা দেয়া প্রতিবেদনে কল ড্রপ সংখ্যা বিটিআরসি নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করছে।

মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিতে সম্প্রতি কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) বিধিমালা করেছে বিটিআরসি। বিধিমালা অনুযায়ী, সেলফোন অপারেটরদের কল ড্রপের হার ২ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। সফলভাবে কল সম্পন্নের হার ন্যূনতম ৯৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কমপক্ষে ৯৮ শতাংশ এসএমএস সফলভাবে গ্রাহকের প্রান্তে পৌঁছে দিতে হবে। আর অপারেটরদের নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত বিটিএসের (বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশন) ডাউন টাইম ১ শতাংশের কম হতে হবে। সেবার বিস্তৃতি ও কল ড্রপসহ মোট সাতটি বিষয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আর সেবার মানের ভিত্তিতে অপারেটরদের র্যাংকিং করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এতে সিটি করপোরেশন এলাকা ও দেশের অন্য এলাকাগুলোর জন্য আলাদাভাবে সিগনালের উপস্থিতি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ডাটাভিত্তিক সেবার ক্ষেত্রে ফোরজির ন্যূনতম ডাউনলোড গতি ৭ এমবিপিএস, থ্রিজির ২ এমবিপিএস ও টুজির ন্যূনতম ডাউনলোড গতি ১৬০ কিলোবিটস পার সেকেন্ড (কেবিপিএস) নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ৫ এমবিপিএসকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হলে প্রথমবার ৫০ হাজার ও পরবর্তীতে ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে বিধিমালায়। পাশাপাশি লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বিটিআরসি।

দেশে সেলফোন অপারেটরদের জন্য সেবার মানদণ্ড নির্দিষ্ট করতে ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ‘স্ট্রেনদেনিং দ্য রেগুলেটরি ক্যাপাসিটি অব বিটিআরসি’ শীর্ষক এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প শেষে দেয়া প্রতিবেদনে কল ড্রপের হার, এসএমএস সেবা প্রক্রিয়া সম্পন্নের হার, বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশনের (বিটিএস) কার্যক্রম বন্ধ থাকার হার ও ব্লক কলের হারসহ আরো কয়েকটি বিষয়ে মানদণ্ড নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সেবাগ্রহীতাদের তালিকায় রয়েছে একাধিক সেলফোন অপারেটর। ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে সেলফোন অপারেটরদের নেটওয়ার্কের বিভিন্ন মানদণ্ড পরিবীক্ষণের দায়িত্ব পালন করে পাই টেকনোলজিস। মূলত নিজেদের নেটওয়ার্কের অবস্থা সম্পর্কে জানতে সেলফোন অপারেটররাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়। পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম থেকে পাওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেটওয়ার্কের ত্রুটি কিংবা দুর্বলতা দূর করতে উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্ট অপারেটর। দেশে এ ধরনের আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সেলফোন অপারেটরদের নিয়োগের ভিত্তিতে ড্রাইভ টেস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পরীক্ষামূলক এ কার্যক্রমের আওতায় এরই মধ্যে ড্রাইভ টেস্টের ফলাফল প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ঢাকা মহানগর এলাকায় সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফোরজিতে রবির ডাউনলোড গতি ৫ দশমিক ৯১ এমবিপিএস, গ্রামীণফোনের ৫ দশমিক ৮৮ এমবিপিএস ও বাংলালিংকের ৫ দশমিক ১৮ এমবিপিএস। অর্থাৎ তিনটি অপারেটরেরই ফোরজি সেবার গতি নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে কম। ড্রাইভ টেস্টে রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটকের ফোরজি সেবার মান পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।