সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে যে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির ঘটনা ঘটে আসছে, তার দায়ভার প্রথমত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের ওপরই বর্তায়। ব্যাংকে অদক্ষ, অনভিজ্ঞ ও অসৎ ব্যক্তিদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কারণেই এমনটি ঘটছে।

 

ব্যাংকিং পেশায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না দেখে পরিচালক পদে, বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে, নিয়োগ দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞতা না থাকলেও শুধু তদবির ও লবিংয়ের জোরে অনেকে পরিচালক হয়ে পর্ষদে বসে পড়ছেন।

ফলে তারা ব্যাংকগুলোকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে বা প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালনা করতে পারছেন না। সামাল দিতে পারছেন না রাজনৈতিক মহল ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের চাপ। এ পরিস্থিতিতেই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদির মাধ্যমে ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত থাকছেন। জাল-জালিয়াতি আর খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়।

ফলে এগোতে পারছেন না ভালো উদ্যোক্তারা। পরিণামে বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। বস্তুত এ পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরিচালক নিয়োগ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সুনির্দিষ্ট বিধিমালা আছে। আগে ব্যাংকের পরিচালক হতে হলে কমপক্ষে ২০ বছরের ব্যাংকিং বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা থাকতে হতো। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে এ বিধিমালা শিথিল করতে করতে এমন অবস্থা হয়েছে যে, এখন যে কেউ পরিচালক হতে পারেন।

জানা যায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার বিধিতে পরিবর্তন আনা হয় একজন দলীয় নেতাকে পরিচালক করার জন্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ প্রবণতা এখনও বজায় আছে, যা বন্ধ হওয়া উচিত। ব্যাংকিং খাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে, দুর্নীতি রোধে এবং এ খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ফেরাতে পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বতন বিধিমালাটি আবারও মেনে চলতে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ব্যাংক একটি বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে অগাধ জ্ঞান ছাড়া এ পেশার উচ্চপদে দায়িত্ব পালন দুরূহ। অথচ ব্যাংক বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তিকে এ খাতের পরিচালক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে! এটি শুধু হাস্যকর নয়, খাতটির জন্য দুঃসংবাদও বটে।

আশার কথা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিষয়টিতে দৃষ্টি দিয়েছেন। সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘যারা বোঝে না, তাদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাখব না। একজন একজন করে দেখে দেখে ইন্টারভিউ নিয়ে ব্যাংকের পর্ষদে পাঠাব। অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো পরিচালক নিয়োগ দেয়া হবে না।’ আমরা আশা করব, অর্থমন্ত্রী তার কথা রাখবেন। কারও সুপারিশে নয়, ব্যাংকিং পেশায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দেখে পরিচালক নিয়োগের পদক্ষেপ নেবেন। তিনি অবিলম্বে পূর্বতন বিধান ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবেন- এটাই কাম্য।