শ্রমিকদের পরিচয়পত্র প্রদানে অনীহা শিপইয়ার্ড মালিকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মৃত্যুঝুঁকি জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। দুর্ঘটনায় আহত বা নিহতের ঘটনাও ঘটে প্রায়ই। তবে পরিচয়পত্র কিংবা নিয়োগপত্র না থাকায় শ্রমিকরা একদিকে যেমন কর্মকালীন বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন, অন্যদিকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে নিহতের পরিবার সম্মুখীন হয় মৃত্যু-পরবর্তী ক্ষতিপূরণপ্রাপ্তির জটিলতায়। শেষ পর্যন্ত অনেক শ্রমিক বঞ্চিত হন কর্মকালীন মৃত্যু বা দুর্ঘটনার কারণে শারীরিক ক্ষতির কারণে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে।

শিপইয়ার্ড-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মতে, শ্রমিকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি কোনো গাইডলাইন না থাকায় নিয়োগপত্র প্রদানে অনীহা আছে ইয়ার্ড মালিকদের।

১৯৬০ সালে ঝড়ে আটকা পড়া এমভি আলপাইন জাহাজ কাটার মধ্য দিয়ে সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের যাত্রা হলেও বর্তমানে সীতাকুণ্ড থেকে কুমিরা পর্যন্ত দেড় শতাধিক কোম্পানি জাহাজ কাটার কাজ করছে।

সব মিলিয়ে বর্তমানে এ শিল্পে ৩০ হাজার শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, যাদের পরিচয়পত্র নেই।

শিপইয়ার্ডের শ্রমিকদের হতাহতের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৬-১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিপইয়ার্ডে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ২০০ শ্রমিক এবং গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০০ জনের বেশি। দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে কী সংখ্যক শ্রমিক তাদের কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই।

শিপইয়ার্ডের মালিকরা জানান, শিপইয়ার্ডগুলোয় সারা বছর জাহাজ কাটা হয় না। যে সময় জাহাজ ইয়ার্ডে কাটার জন্য আনা হয়, সে সময়ে কিছু কাজ নিজস্ব শ্রমিক দিয়ে করা হয়, আবার অনেক কাজ সাব কন্ট্রাক্টে হয়। কন্ট্রাক্টর প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব শ্রমিক দিয়ে চুক্তিভিত্তিক জাহাজ কাটে। চুক্তিতে অংশ নেয়া কোনো শ্রমিকের ক্ষতি হলে আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ভাসমান শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি জটিল। আর নিয়োগপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো গাইডলাইন নেই। এখন কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় আমরা শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেব, সে বিষয়টিও পরিষ্কার নয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কোনো নির্দেশনা থাকলে আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নিতে পারি।

শিপইয়ার্ডে শ্রমিকদের অধিকার আদায় এবং ইয়ার্ডের কর্মপরিবেশ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোস্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, শিপইয়ার্ড শ্রমিকদের কাজের কোনো পরিচয়পত্র দেন না ইয়ার্ডের মালিকরা। মালিকরা মনে করেন, ইয়ার্ডে সবসময় জাহাজ কাটা হয় না। যার কারণে স্থায়ী শ্রমিকের চেয়ে উপঠিকাদারি দেয়া প্রতিষ্ঠানের বেশি শ্রমিক ইয়ার্ডে কাজ করেন। যে কারণে পরিচয়পত্র দেয়া হয় না।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে শ্রম অধিদপ্তর কিংবা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে একটা গাইডলাইন থাকা উচিত।

এদিকে গত ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে আঞ্চলিক ক্রাইসিস প্রতিরোধ কমিটির এক সভায় শিপইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের বিধিমোতাবেক নিয়োগপত্র দেয়ার জন্য কমিটি সুপারিশ করা হয়। তবে এ সময় বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআর) নির্বাহী সদস্য মাস্টার আবুল কাশেম শিপইয়ার্ডের সব শ্রমিকের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান করার জন্য মে মাস পর্যন্ত সময় দেয়ার অনুরোধ জানালে কমিটি তাদের চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় দেয়।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ক্রাইসিস প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো. আব্দুল হাই খান বণিক বার্তাকে বলেন, শিপইয়ার্ডগুলোর শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তার স্বার্থে নিয়োগপত্র দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমরা শ্রমিকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।  আমরা কমিটির পক্ষ থেকে তাদের সময় দিয়েছি। তারা এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে ইয়ার্ড বন্ধ করাসহ কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতে যেকোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বিএসবিআরের সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা আঞ্চলিক ক্রাইসিস প্রতিরোধ কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আগামী সপ্তাহে আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের নিয়ে আলোচনা সভার আহ্বান করেছি। এ সভায় আগামী দুই মাস নিয়োগপত্রের বিষয়টি পর্যালোচনা করব। তারপর পর্যালোচনা প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে ইয়ার্ড শ্রমিকদের নিয়োগপত্রের বিষয়ে কাজ শুরু করব।

এদিকে বিভিন্ন শিপইয়ার্ড শ্রমিক সংগঠনের নেতারা জানান, শিপইয়ার্ডে কাজের স্বীকৃতির জন্য শ্রমিকদের পরিচয়পত্র নয়, নিয়োগপত্র দেয়ার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে মালিক পক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এখনো এ দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। নিয়োগপত্র কিংবা পরিচয়পত্র না থাকার কারণে আমাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তাছাড়া শ্রমিকের আবাসন, খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসাসেবাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো সুবিধা নেই। হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ভয়ে বেশির ভাগ কোম্পানি শ্রমিকদের স্থায়ী নিয়োগ দেয় না। শ্রমিকরা ফিটার, কাটিং, লোডিং ও ওয়্যারিং নামে চারটি বিভাগে কাজ করে থাকেন। পুরনো জাহাজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস, বিস্ফোরণ, যন্ত্রাংশের নিচে চাপা পড়া কিংবা জাহাজের ওপর থেকে পা পিছলে নিচে পড়ে গিয়ে প্রায়ই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জাহাজ কাটার সময় গ্যাস বিস্ফোরণে আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য নেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।