জীবন যুদ্ধে বাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

খেলা শব্দের ইংরেজী গেম, সুইডিসে বলে স্পেল। না এ খেলা ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট বা টেনিস নয়। এ লটারী, বাজি, গ্যাম্বলিং হার জিতের খেলা যা আজ চলছে পৃথিবীর সর্বত্র। পৃথিবীতে চিরপ্রচলিত দুটি ব্যবসা যার জনপ্রিয়তা শুধু বেড়েই চলছে দিনের পর দিন ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে।

 

একটি পতিতাবৃত্তি (প্রস্টিটিউশন) এবং আরেকটি জুয়া (গ্যাম্বলিং)। যারা জুয়া খেলায় আসক্ত তাদের কাছে এটা ছাড়া পৃথিবী অচল। বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস যেকোন খেলাই হোক না কেন চলছে বাজি (বেটিং)। আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে কে জিতবে সেখানেও বাজি। শেয়ার মার্কেটের কেনা বেচা এটাও এক ধরনের জুয়া খেলা (গ্যাম্বলিং)।

প্রযুক্তির যুগে নতুন প্রজন্ম ঘরে বসে রাত জেগে নানা ধরণের জুয়া বা বেটিং খেলছে। জানিনা গ্যাম্বলিং বা বেটিং থেকে রেহাই পাবার ব্যবস্থা আছে কি না! যে পরিমান টাকা খেলায় জড়িত এবং জিতলে সারাজীবন আর কিছু করার দরকার হবেনা।‘উইনার টেকস ইট অল’। আজ লটারী খেলার ওপর একটি ঘটনার বর্ণনা দেবো যা ঘটেছিল অনেক আগে।

১৯৮৫ সাল, মে মাসের শেষ সপ্তাহ। ঢাকা থেকে সবে সুইডেনে এসেছি। আমার ছোটমামা আমার বছর দুই আগেই পড়াশোনা করতে এখানে এসেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই স্টকহোম শহর এবং এখানকার নিয়ম কানুন তার ভালো জানা। মামা-ভাগ্নে মিলে এক রুমে আছি এবং সামার জব করছি।

রাত ১২টার দিকে রুমে আমাদের দেখা হয়, পরে ভোর ৫টা বাজলেই যে যার কাজে। আমার প্রথমদিনে কাজ সকাল ৭টায়। রাতে ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছি। হঠাৎ জানালার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো দেখে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে মেট্রোর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। স্টেশনে এসে দেখি ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত ৩টা। একটু অবাক, কি ব্যাপার? এদিকে কোথাও কেউ নেই, ট্রেনও আসছে না।

ট্রেনের টাইম টেবিল দেখতে গেলাম। দেখি সকাল ৫.৩০ এ প্রথম ট্রেন। ফিরে এলাম রুমে। মামা বিষয়টি বললেন যে সূর্য উঠে সামারে সকাল ২-৩ টের দিকে। সামারে যারা এসেছে এমন ভুল করেনি, কেও আছে বলে তিনি জানেন না। নতুন একটি অভিজ্ঞতা হলো সেদিন। তিনদিন কাজ করেছি। শুক্রবার একটু আগেই রুমে এসেছি।

মামাও এসেছেন সকাল সকাল। মামা লটারির টিকিট কিনেছেন। উনি নাকি মাঝেমধ্যে কেনেন। সুইডেনে নানা ধরনের লটারি খেলা হয় যেমন লোট্টো, হ্যারিবয়, ট্রিস, ভাইকিং লোট্টো ইত্যাদি। ভাইকিং লোট্টোতে মোট ৪৮টি সংখ্যা তার মধ্যে ৭ টি পছন্দ করতে হবে, পছন্দ করা নাম্বরগুলো মিলে গেলেই কয়েক মিলিয়ন সুইডিস ক্রোনার।

মামা এমনভাবে বর্ণনা করছেন যেন মনে হচ্ছে পরেরদিন ড্রতে তিনি দুই মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার জিতবেন। ওনার প্ল্যান প্রোগ্রাম শুনতে শুনতে কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে মামা লটারি জিততেও পারেন। কিন্তু একবারও বললেন না জিতলে আমাকে কত দেবেন।

মামা লটারির টিকিট ওয়ালেট থেকে বের করে দেখালেনও। মনে দুষ্টমি ঢুকেছে, মামা নাক ডেকে মনের আনন্দে ঘুমাচ্ছেন। ওয়ালেট থেকে লটারির টিকিটটা সরিয়ে আমার ওয়ালেটে রেখে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে কাজে যার যার মত করে চলে গেলাম। শনিবারে কাজের শেষে টিকিটটা চেক করে দেখলাম মামার মাত্র দুটি সংখ্যা মিলেছে সাতটার ভেতর। আমি রুমে এসে মামার বিছানাতে সে টিকিটটা রেখে দিয়েছি।

কিছুক্ষন পর মামাও ঢুকেছে রুমে, তার মন খুবই খারাপ। জিজ্ঞেস করলাম কারণ। বলে লটারির টিকিটটা হারিয়েছে, নিশ্চিয় কেও পেয়ে অনেক টাকা জিতেছে। আমি বললাম হারাবে কেন, দেখেন ভালো করে। সে বলে ওয়ালেট দেখেছি নেই, আমি বল্লাম রুম ভালো করে দেখেন। উনি একটু খোঁজাখুজি করে টিকিটটা পেলেন তার বিছানায়। তৎক্ষণাৎ তিনি চলে গেলেন নম্বার মিলাতে এবং ঘন্টাখানেক পর ফিরে এলেন। তবে তাকে দেখে খুব বিষন্ন মনে হলো। আমি মামাকে একটু সান্তনা দিলাম এই বলে পরের সপ্তাহে হয়ত আসিবে ফিরে হোপ নতুন করে। দু:খের বিষয় মামা আজো জিততে পারেননি কোন লটারি সুইডেনে।

তবে হ্যাঁ আজ জিতেছে একজন এখানে। তাকে আমি চোখে দেখিনি তবে তার গল্প শুনেছি। সে খেলেছিল ইউরো জ্যাকপট। ৫০টি সংখ্যা তার মধ্যে ৫টি সংখ্যা পছন্দ করতে হয় এবং ২টি বোনাস, মোট সাতটি নম্বর যদি মিলে যায় তবে অনেক টাকার ব্যাপার। পুরো দেশে ঘটনা রটেছে এক সুইডিশ ভদ্রলোক জিতেছে বাংলাদেশি টাকায় পাচঁশো ষাট কোটি টাকা। যেহেতু এধরনের লটারি খেলতে আইডি সহ জন্মতারিখ যোগ করা হয়েছে বিধায় সুইডিশ গেম কোম্পানী জানে কে জিতেছে। তবে যে জিতেছে সে এখনও সোআপ করেনি। আমার মামা যে নয় সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত কারন ঘটনা ঘটেছে সাউথ ওফ সুইডেনে, মামা থাকেন স্টকহোমের অদুরে হালুনদায়। যদি আমার মামা এ গল্প পড়েন তবে আজ এত বছর পরে জানবেন যে আমি তার লটারির টিকিট নিয়ে আগেই চেক করেছিলাম এবং জেনেছিলাম মামা জেতেননি। প্রসংগত তখন শুধু আইডি দেখাতে হতো কারণ ক্রেতা প্রাপ্ত বয়স্ক কিনা ( ১৮+ হতে হবে )। আমরা প্রতিদিন সবাই ভালো কিছু ঘটুক আশা করি। আশাকরি যেন ঠিকঠাক মত গন্তব্যস্থানে পৌছাতে পারি, দিনটা যেন ভালোভাবে যায় ইত্যাদি।

কখনও আশা করিনে কোন বিপদ আপদ হোক বা দিনটি খারাপ যাক বা পথে যেতে এ্যাকসিডেন্ট ঘটুক। লটারীর ব্যপারে হয়েছে সবাই আশা করে জিতবে কিন্তু আশা করা আর না করাতে কিছু যায় আসে না কারণ ‘What is lotted cannot be blotted’.

ভাবনার বিষয় নতুন প্রজন্ম গ্যাম্বলিং, মদ, পর্ণগ্রাফি বেটিং এরপ্রতি ভীষন আকারে আসক্ত হয়েছে। কেউ কেউ ভিডিও গেমসের উপর আসক্ত হয়ে পড়েছে। মদ গাঁজার ব্যবহার যেমন দিনের পর দিন বেড়ে চলছে বিশ্বজুড়ে ঠিক বেটিং বা গ্যাম্বলিংও চলছে সর্বত্র। অনেকে আসক্তির কারনে মেন্টাল সিকনেসে ভুগছে। নিষিদ্ধ বস্তুর (মদ-গাজা, পর্ণ ছবি, জুয়া) প্রতি মানুষ মাত্রই অস্বাভাবিক আকর্ষণ, কিন্তু সেটা মেটাতে গিয়ে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে শারীরিক এবং মানসিক হুমকির মুখে।

একই সঙ্গে লক্ষ্যনীয় দারিদ্রতা এবং দূর্নীতি যেখানে যত বেশি ধর্মের ব্যবহারও সেখানে তত বেশি। দারিদ্রতা এবং দূর্নীতি যুক্ত সমাজে চলছে ঘুষ দেয়া-নেয়া জ্ঞাত বা অজ্ঞাত অবস্থায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের নামে চলছে ভন্ডামী। অনেকে পরিবার, সমাজ এবং দেশকে ঠকিয়ে গড়ে তুলছে অর্থের পাহাড়। জানিনা মানবজাতির কি পরিনতি হবে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে! জানিনা পৃথিবীর শিক্ষা প্রশিক্ষণ কিভাবে সামলাবে এ দুর্যোগময় পরিস্থিতি! জানিনা এ ধরণের অমানবিক বিনোদনের মাত্রা কোথায় গিয়ে দাড়াবে!

জানিনা কখন এ ঘটনা প্রবাহের হবে শেষ। জানিনা জীবনযুদ্ধে বাজি খেলে জয়ী হতে পেরেছে তাদের সংখ্যা কতজন। তবে সর্বহারা হয়েছে অনেকে। হয়ত মদ, বেটিং, পর্ণ ছবি, গ্যাম্বলিং চিরতরে পৃথিবী থেকে সরে যাবে না। একটু বিনোদন জীবনে ঘটতেই পারে, তবে এসবে আসক্ত হয়ে বা মেন্টাল সিকনেসে ভুগে জীবন যুদ্ধে পরাজিত হওয়া ঠিক হবে না। কারণ অন্ধকার সময় যদি ঘনিয়ে আসে তখন কে সেই অন্ধকারকে সরিয়ে ভালোবাসার আলো দেবে!