সমান সুবিধা চায় সব রফতানি খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

আগামী বাজেটে সব রফতানি খাতকে সমান সুবিধা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন রফতানিকারকরা। তারা বলেছেন, রফতানি খাতে কর বৈষম্য রয়েছে।

 

যেখানে তৈরি পোশাক খাতের কর্পোরেট কর ১২ শতাংশ, সেখানে টেক্সটাইল খাতে ১৫ শতাংশ, প্লাস্টিক খাতে ৩৫ শতাংশ, গার্মেন্ট এক্সেসরিজ খাতে ৩৫ শতাংশ এবং টেরিটাওয়াল খাতে ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। অথচ সব খাতই রফতানির মাধ্যমে দেশে ডলার আনছে। তাই সব রফতানি খাতকে সমান সুযোগ দিতে হবে।

সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ দাবি জানান। এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে সভায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, টেরিটাওয়াল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, প্লাস্টিক রফতানিকারক সমিতি, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ রফতানিকারক সমিতির নেতারা বক্তব্য দেন।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘সব রফতানিকারকরাই বিদেশ থেকে ডলার আনেন। তাই রফতানি খাতে বৈষম্য থাকা উচিত নয়। রফতানি খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পলিসি করে দেয়া উচিত, যাতে প্রতি বছর বাজেটের আগে এনবিআরে এসে ধরনা দেয়া না লাগে। এছাড়া রফতানি খাতকে সম্পূর্ণরূপে ভ্যাটের আওতামুক্ত এবং বন্ডের অডিট অটোমেশন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

চাপ দিয়ে ব্যবসায়ীদের মেরে ফেললে দেশ এগোবে না। ব্যবসায়ীরা এনবিআরের চাহিদা অনুযায়ী ট্যাক্স দিতে পারতেন; কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় বাধা ব্যাংক ঋণের সুদের হার। দুর্বৃত্তরা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। আর যারা সৎভাবে ব্যবসা করছেন ঋণের সুদ দিয়ে তাদের এর খেসারত দিতে হচ্ছে। ব্যাংকের স্প্রেড না কমালে এবং মন্দ ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ঋণের সুদ হার কমিয়ে আনা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী রোববার সুদ হারের ব্যাপারে যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা তার সুফল দেখতে চাই।’

 

টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, তৈরি পোশাক খাতে ৩২ বিলিয়ন ডলার রফতানি হয়। এ অর্থের ৫০ শতাংশের দাবিদার টেক্সটাইল খাত। তৈরি পোশাকের পশ্চাৎপদ শিল্প হিসেবে টেক্সটাইল খাত গড়ে ওঠায় ১৬-১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হচ্ছে না। আর স্থানীয় পর্যায়ে টেক্সটাইল খাতের আকার ১২ বিলিয়ন ডলার। এ খাতে ২ কোটির বেশি মানুষ জড়িত। অর্থনীতিতে এত অবদানের পরও টেক্সটাইল খাত কর বৈষম্যের শিকার।

কর্পোরেট ট্যাক্স ১৫ শতাংশ দিতে হচ্ছে। কিন্তু গার্মেন্ট খাত দিচ্ছে ১২ শতাংশ। তাই আগামী বাজেটে তৈরি পোশাক খাতের মতো কর্পোরেট ট্যাক্স নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘সুতার ওপর ভ্যাট আরোপ করা হলে প্রান্তিক পর্যায়ের তাঁতিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বর্তমানে ট্যারিফ মূল্য আরোপিত আছে কিন্তু ট্যারিফ প্রথা বিলুপ্ত করে তাঁতিদের সুতার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে প্রতি কেজি সুতার দাম সাড়ে ২৩ টাকা, সাড়ে ৭ শতাংশ আরোপ করলে ৩৫ টাকা ২৫ পয়সা এবং ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে ৪৭ টাকা বাড়বে।’

প্লাস্টিক রফতানিকারক সমিতির সভাপতি (বিপিজিএমইএ) জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সরকার সব সময় বলে আসছে রফতানি খাতকে বহুমুখী করা দরকার। কিন্তু কাজকর্মে বাকি খাতকে মূল্যায়ন করা হয় না। সব রফতানি খাতকে সমান সুবিধা দেয়া উচিত। বর্তমানে প্লাস্টিক খাত ৩৫ শতাংশ কর্পোরেট কর দেয়। রিসাইকেল শিল্পে কর অবকাশ এবং শিল্পের যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দিতে হবে।’

গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল কাদের খান তৈরি পোশাক খাতের মতো কর্পোরেট ট্যাক্স ১২ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘প্রচ্ছন্ন রফতানি করলেও এক্সেসরিজ খাতকে ৩৫ শতাংশ কর্পোরেট কর দিতে হয়, এটা বৈষম্য। গত কয়েক বছর যাবৎ এ নিয়ে প্রস্তাব দিয়ে সুফল পাওয়া যায়নি। কর্পোরেট ট্যাক্সের কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে এনবিআরকে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন করতে হবে।’

টেরিটাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিটিএলএমএ) সভাপতি শাহাদাত হোসেন সোহেল বলেন, ‘গত ৬ মাসে টেরিটাওয়াল খাতে রফতানিতে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ খাতকে বাঁচাতে হলে তৈরি পোশাকের মতো কর্পোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা এবং নগদ প্রণোদনার ওপর কর অব্যাহতি দিতে হবে।’

সভাপতির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রীলঙ্কা, ভারত থেকে টেকনিশিয়ানরা বাংলাদেশে এসে কাজ করছেন। তারা বিপুল পরিমাণ ডলার নিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের রেমিটেন্সের বড় অংশ যায় বাংলাদেশ থেকে। অনেক ব্যবসায়ী বিদেশি কর্মীদের বেতন সঠিকভাবে ঘোষণা দেন না। তাই বিদেশি কর্মীদের কাছ থেকে এনবিআর সঠিক কর আদায় করতে পারছে না। বাজেটের আগে অথবা পরে এ ধরনের বিদেশিদের কাছ থেকে কর আদায় করতে জরিপ চালানো হবে। এজন্য ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চাই।’

বন্ড অপব্যবহারকারীদের তালিকা করা হচ্ছে : বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের দমন করার ঘোষণা দিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেছেন, ইসলামপুর, নয়াবাজার, চকবাজারের মতো স্থানে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া কাগজ, কাপড় ও প্লাস্টিক পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হয়। এর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের তালিকা করছি। আমরা অসাধু ব্যবসায়ীদের দমন করার জন্য যা প্রয়োজন তাই করব। তিনি বলেন, বন্ডের অপব্যবহার রোধে অভিযান চালানো হয়েছে।

কারও কারও লাইসেন্স বাতিল করছি। এরা রফতানিকারক নয়, ফটকা ব্যবসায়ী। বন্ডের সুযোগ নিয়ে কর ও শুল্ক না দিয়ে বাজারে পণ্য বিক্রি করছে। এতে টেক্সটাইল, উইভিং, কাগজ শিল্প প্রত্যেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএর মতো কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনেরই কোনো প্রকার সমর্থন নেই বন্ডের অপব্যবহার নিয়ে। যারা এ অপব্যবহার করছে, আমরা তাদের ধরার চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে নীতিমালায় পরিবর্তন আনব। রফতানি ছাড়া কোনো বন্ড সুবিধা হবে না।

সভায় এনবিআরের ভ্যাট নীতি সদস্য রেজাউল হাসান, আয়কর নীতি সদস্য কানন কুমার রায়সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।