এমন পরিবর্তন যেন আসে সবার জীবনে

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

জীবনে পরিবর্তন দেখেছি অনেক তবে এমনটি দেখিনি যা লক্ষ্যনীয় সুইডেনের প্রকৃতির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে। শীতে গাছপালা দেখে মনে হয় যেনো মরে বেঁচে আছে। একটিও পাতা নেই তার শাখা প্রশাখাতে।

এমনটি পাতাছাড়া গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই অক্টোবর মাস থেকে শুধু প্রতিক্ষায় কখন সূর্যের কিরণ দেখা যাবে। কখন শীতের অবসান ঘটবে এবং কখন বাতাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। মনে হচ্ছে তেমন একটি সময় আসতে শুরু করেছে প্রতি বছরের মতো এবারও। ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ সেই বাল্টিক সাগরের পাড় দিয়ে হাঁটতে নজর কেড়ে নিল সেই মরা গাছগুলো।

মনে হচ্ছে যেন চোখের পলকে তা সবুজ হতে শুরু করেছে। চোখ ফেরালেই দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। বসন্ত এসেছে ফিরে সঙ্গে শুরু হয়েছে পরিবর্তন, মনের পরিবর্তন অনুভূতির পরিবর্তন শুধু পরিবর্তন আর পরিবর্তন। ঋতুর পরিবর্তন দেখেছি কম বেশি কিন্তু স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মতো পৃথিবীর অন্য কোথায়ও এমনটি চোখে পড়েনি কখনও। সুইডেনে ঋতু চারটি। শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম এবং শরৎ।

শীত এবং বসন্তের মাঝের সময়টি সবার জন্য সত্যি এক আকুল আকাঙ্ক্ষা যা বর্ণনা করার মতো নয়। শীতে যেমন ঠান্ডা সেইসঙ্গে বরফে ঢাকা সারাদেশ। নদী-নালা, খালের পানি জমে বরফে পরিণত হয়।

নর্থে মাঝে মধ্যে সূর্যের কোন দেখা মেলে না। সারাদেশ যখন তুষারে ভরা তখন কিছুটা আলোকিত মনে হয় দিনে অল্প সময়ের জন্য। শীতে স্কী করা এদের শীতকালীন ক্রিয়াকলাপের একটি বিশেষ অংশ।

বাইরের তাপমাত্রা কখনও -৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট সঙ্গে ঘরের তাপমাত্রা +২৫ ডিগ্রী। নর্থ অব সুইডেনে আইস হোটেল রয়েছে যা সম্পূর্ণ বরফের তৈরি, অনেকে বিনোদনে আসে সময় কাটাতে এখানে। আবার উত্তর লাইট (Northern Lights) দেখতেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোক আসে এখানে। অপুর্ব সুন্দর, বিভিন্ন রঙিনের সমন্বয়ে এ সুমেরু প্রভা যা নর্থ অব সুইডেনের আকাশ জুড়ে নাচতে দেখা যায়।

শীতের পর আস্তে আস্তে বসন্তের আবির্ভাব হতে থাকে যা প্রকৃতির জন্য মনে হয় সবচেয়ে আনন্দের মুহুর্ত। দিনের আলো প্রতিদিন বাড়তে থাকে। গাছপালা তার নতুন জীবন খুঁজে পেতে শুরু করে। সেই মরা গাছ তাজা হয়ে সবুজ পাতায় ভরে যায় এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে। বসন্তে ফুলের বাহারে, গন্ধে সারাদেশ ভরপুর। সবকিছু মিলে মনে হয় কেবল পরমদেশ যা শুধু অনুভূতিতে নয় দর্শনেও মুগ্ধ করে।

বসন্তে বেশ ঠান্ডা তবে সব কিছু যখন নতুন জীবন ফিরে পায় মনে হয় না ঠান্ডাকে তেমন বিরক্তিকর। বসন্তের হাত ধরে আস্তে আস্তে গ্রীষ্ম এসে হাজির হয়। বসন্তের বিদায়ের পালা ৩০ এপ্রিল। দিনটির বিকেলে উৎসবের মধ্য দিয়ে অনেক কাঠ এবং গাছের ডালপালা জোগাড় করে খড়ের পালার মতো করে আগুন জ্বালিয়ে সবাই জ্বালানীর চারপাশ ঘিরে উৎসবের সঙ্গে ভলবরিস-মাস-আফতন (Valborgsmässoafton) পালন করে।

এ উৎসবকে মাইব্র্যাসন (majbrasan) বলা হয়। মাইব্র্যাসনের মধ্য দিয়ে বিদায় দেয়া হয় বসন্তকে এবং বরণ করা হয় সুইডিশ গ্রীষ্মকে। গ্রীষ্মে সূর্যের আলো, পানি আর সবুজের মাঝে সুইডিশদের বেশিরভাগ সময় দেখা যায় স্বল্প কাপড়ে।

যেখানে সেখানে রৌদ্রে শুয়ে বইপড়া বা যাস্ট রিলাক্স করা এদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় ফুলে ফলে পুরো দেশটা ভরে যায়। যেখানেই হাত বাড়াই শুধু ফুল আর ফল। সূর্য উদয় হয় এ সময় রাত ২-৩ টার দিকে এবং অস্ত যায় রাত ১১-১২টার দিকে।

বলতে গেলে পুরো সময়টিই দিনের আলোয় আলোময়। ২২ জুন সুইডেনের রাত এবং দিন সমসময়ে পরিণত হয়। দিনটি সুইডিশদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং দিনটিকে সুইডিস মিডসোমার বলা হয়। সুইডিস মিডসোমার-স্টংয়ের (midsommarstång) চারপাশে হাতে হাত ধরে সুইডিশ জাতীয় পোশাক পরে সবাই নাচ-গান, আনন্দ-ফুর্তির মধ্যে দিয়ে দিনটি পালন করে।

মিডসোমারের পরেরদিন থেকে দিনের আলো কমতে শুরু করে সেইসঙ্গে শরতের আবির্ভাব হয়। গাছের পাতা নানা রংয়ে রঙিন হয়ে প্রকৃতিকে সৌন্দর্যে মাতাল করে তোলে। দেখে যেন মনে হয় পুরো সুইডেন পেইন্টিংয়ে ভরা। সুইডেনের শরতকাল মানব জীবনের এক রোমান্টিক সময় যা অনুভব না করলেই নয়।

শরতের শেষ হতে শুরু হয় আর গাছপালা তার সেই আকর্ষনীয় নানা রংয়ের রঙিন পাতা হারাতে থাকে। অন্ধকারে আচ্ছন্ন হতে থাকে স্ক্যান্ডিনেভিয়া। শুরু হতে চলে শীতের আগমন, তারপর শুধু বসন্তের জন্য অপেক্ষা। ছোট বেলায় রেখে আসা দিনগুলোর সঙ্গে যদি তুলনা করি তবে বলতে চাই শুধু পরিবর্তন - জীবনের, সময়ের এবং ভাগ্যের।

যা রেখে এসেছি তা পাবার নয় এবং যা পেয়েছি তা হারাবার নয়। ভাগ্য আমার বড়ই ভাগ্যবান। কারণ দুটি ভিন্ন দেশের ন্যাচারাল দৃশ্য যা শুধু ভরে দিয়েছে আমার জীবনকে প্রকৃতির অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে। এমন পরিবর্তন যেনো আসে সবার জীবনে এবং তা যেনো আসে বারবার এবং হয় যেনো মধুময়।