সব হারিয়ে আকবর হোসেন এখন মানসিক ভারসাম্যহীন

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

স্কুলের সময় হলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় তার। ছুটে যান স্কুলে, কিন্তু ক্লাসে যাওয়া হয় না। প্রিয় শিক্ষার্থীদের সান্নিধ্য না পেয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, ক্লান্ত হয়ে পড়লে বাড়ি ফেরেন, মাঝে মাঝে ফেরেনও না।

 

২২ বছর আগে তার অফিস ছিল, অফিসে সাজানো টেবিল-চেয়ার ছিল। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের রোল কল করতেন নিয়মিত। এখন এসবের কিছুই নেই তার। এই হতভাগ্য শিক্ষকের নাম আকবর হোসেন। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মিথ্যা অভিযোগে চাকরি হারিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ লড়াইয়ের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে চাকরি ফিরে পেলেও শেষ হয়ে যায় তা একদিনেই। তার চাকরির বয়স যেদিন শেষ, ঠিক সেদিনই বিদ্যালয়ে যোগ দেন তিনি, আর পরদিন থেকে চলে যান অবসরে। এসব কিছুই আকবর হোসেনের মনের ওপরে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। অবসরে যাওয়ার চার মাসের মাথায় ব্রেন স্ট্রোক করে মানসিক ভারসাম্য হারান তিনি। সেই থেকে ২২ বছরে ধরে অস্বাভাবিক জীবনযাপন চলছে এই নিরীহ শিক্ষকের।

পাবনা শহর থেকে চাটমোহর উপজেলার আটলংকা বাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। এই বাজারের দক্ষিণ পাশে চিকনাই নদীর তীরে অবস্থিত আটলংকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই আকবর হোসেন ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। অভিযোগ আছে, ম্যানেজিং কমিটির ষড়যন্ত্রে ১৯৯৫ সালের ৩০ মে চাকরি হারান তিনি। এরপর উচ্চ আদালতের সর্বশেষ রায় অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই চাকরি ফেরত পান। কিন্তু, আদালতের নির্দেশের পরও আকবর হোসেনকে চাকরিতে যোগদান করতে দেয়নি ম্যানেজিং কমিটি। এমনকি তাকে স্কুলেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে কমিটি কেবল আদালতেরই নয়, বরং উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও উপেক্ষা করেছে।

মাঝে মাঝেই মামলার কাগজ পড়ে দেখেন শিক্ষক আকবর হোসেন

অনুসন্ধানে জানা যায়, আকবর হোসেনের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার দিন ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট তাকে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য এই উদ্যোগ নেন চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেলী লায়লা। তবে ওইদিনই আকবর হোসেনকে চাকরি থেকে অবসরে যেতে হয়। এ অবস্থায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এর চার মাস পর ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর ব্রেন স্ট্রোক করেন তিনি এবং একইসঙ্গে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ান

বিদ্যালয় এলাকা থেকে একটু দূরে চাটমোহর রেলস্টেশন। পাশেই রেলবাজার এলাকায় শিক্ষক আকবর হোসেনের বাড়ি। স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেই থাকেন তিনি। রাতে বাড়িতে থাকলেও দিনে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ান। সকালে স্কুলের সময় হলেই বাড়ি থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন তিনি। সকালে বের হয়ে ফিরে আসেন সন্ধ্যায়। মাঝে মাঝে ফিরতে দেরি হলে বাবার খোঁজে বের হন একমাত্র ছেলে শামীম হোসেন, বাবাকে খুঁজে নিয়ে বাড়িতে ফেরেন। শামীম জানান— কোথায় যান, কী করেন, তার বাবার তা কিছুই মনে থাকে না।

গত ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যার পর বাড়ির পাশের রাস্তা থেকে শামীম তার বাবাকে বাড়িতে ডেকে আনেন। বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে ছেলে তার বাবাকে বলেন, ‘মেহমান এসেছেন, আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’ বাকিটা ইশারায় বুঝিয়ে দেন শমীম।

আকবর হোসেনের প্রতিষ্ঠিত আটলংকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়

ছেলের কথা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন আকবর হোসেন। তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই, এক সময় তিনি ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। সব হারিয়ে স্কুলশিক্ষক আকবর হোসেন যেন আজ এক উদ্ভ্রান্ত পথিক।

২২ বছরের বঞ্চনায় হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবন

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও আকবর হোসেনের সহকর্মীদের কেউ কেউ জানান, আটলংকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে, সরকারি অনুদানভুক্ত করা, সবই তার হাত ধরে হয়েছে, অথচ এখন তাকেই ভুলে গেছে স্থানীয়রা। আর ২২ বছরের বঞ্চনায় আকবর হোসেন হারিয়েছেন তার স্বাভাবিক জীবন।

আটলংকার পার্শ্ববর্তী চিকনাই হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অপমান করে তাকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এই লজ্জায় আকবর হোসেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। তার প্রতি চরম অবিচার করা হয়েছে।’

পরিবারের বক্তব্য

শিক্ষক আকবর হোসেনের ছেলে শামীম হোসেন জানান, ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট চাকরি ফিরে পান তার বাবা। চাকরিতে যোগ দিয়ে আবার ওই দিনই অবসরে যান। অবসরের পর অসহায় বোধ করতে থাকেন তিনি।

শামীম হোসেন বলেন, ‘আদালতের নির্দেশের পরও ২২ বছরের বকেয়া বেতন ও অবসর সুবিধা পাওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এরপর বাবা আরও ভেঙে পড়েন। ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাবা ব্রেন স্ট্রোক করেন। চিকিৎসায় সুস্থ হলেও পুরো স্বাভাবিক হননি। কখনও পুরো স্বাভাবিক মনে হয়, আবার কখনও মনে হয় অস্বাভাবিক। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে তার জীবনযাপন।’

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের দেওয়া তথ্য এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি আটলংকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষক আকবর হোসেন। আট বছর বিনা বেতনে চাকরি করার পর সরকারি বেতনভাতার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়ায় ষড়যন্ত্র করে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।