সাদা মনের মানুষ ছিলেন সুবীরদা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

আমাদের সাংস্কৃতিক জগৎটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক গুণী মানুষ চলে যাচ্ছেন। এটা সত্যিই মেনে নেয়ার মতো নয়। মাত্র দু’দিন আগেই শুনেছি তিনি চোখ মেলে তাকিয়েছেন।

 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও চলে গেলেন। আমরা একেবারেই শূন্য হয়ে যাচ্ছি। সুবীর দা’র (সুবীর নন্দী) সঙ্গে আমার বহু বছরের পরিচয়। অনেক সিনেমায় আমরা যেমন গান গেয়েছি, আবার অনেক রিয়েলিটি শো’তে একসঙ্গে বিচারকের ভূমিকায়ও কাজ করেছি।

খুব ভালো এবং সাদা মনের একজন মানুষ ছিলেন তিনি। আমাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও তিনি অংশগ্রহণ করতেন। প্রাণ খুলে কথা বলতেন। কিন্তু সেই প্রাণ খোলা হাসির মানুষটি চলে গেলেন! আমাদের আলো দেখিয়ে সামনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন একের পর এক। এটা আমাদের জন্য সত্যিই অনেক কষ্টের বিষয়।

সুবীর দা’র সঙ্গে সর্বশেষ চাষী নজরুল ইসলামের ‘দেবদাস’ সিনেমায় মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের কথায় ও খন্দকার নূরুল আলমের সুর সঙ্গীতে ‘বলো কে বা শুনেছে এমনও পীরিতের কথা’ গানে কণ্ঠ দিয়েছিলাম। খুব মজা করে গানটি গেয়েছিলাম সেদিন। শেষবার অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি আমার বাসায় এসেছিলেন। আমিই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তার সঙ্গে আরও অনেক শিল্পী এসেছিলেন সেদিন। আমার বাসায় আসার পর সেদিন তাকে দেখে মনে হয়নি এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ওই দিন অন্য শিল্পীরাসহ আমরা একসঙ্গে আড্ডা দিয়েছি।

সঙ্গীত নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনাও হয়েছিল। গান গেয়েও শুনিয়েছেন তিনি আমাদের। খাবারের প্রতি আগ্রহ ছিল তার। বিশেষ করে বিভিন্ন রকম ভর্তা, ভাজি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করতেন তিনি। সেদিনের দেখাই যে তার সঙ্গে শেষ দেখা হবে সেটা কল্পনাও করিনি।

বিভিন্ন সময় গান করতে গিয়ে সুবীর দা’র সঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি। অনেক রকম কথা হতো আড্ডায়। সঙ্গীত নিয়ে তিনি অনেক ভাবতেন। একটু চঞ্চল রকমের মানুষ ছিলেন, সবার সঙ্গেই মিশতে চাইতেন।

মনের মধ্যে কোনো অহংবোধ ছিল না তার। তাকে সাদা মনের মানুষ বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। কখনও যদি টিভিতে লাইভ প্রোগ্রামে থাকতেন তিনি আগেই আমাদের জানাতেন। দেখার কথা বলে মেসেজ দিতেন। এ বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগত।

সুবীর দা’ বিভিন্ন আয়োজনে ‘পাখিরে তুই দূরে থাকলে কিছুই আমার ভালো লাগে না’ গানটি প্রায়ই আমাদের গেয়ে শোনাতেন। তার প্রিয় একটি গান ছিল এটি। আড্ডায় প্রায়ই তার স্ত্রীর প্রশংসা করতেন। বছরজুড়েই তিনি তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রিয় স্থানে ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা করতেন। উপলদ্ধি তার এমনই ছিল যে, জীবন তো একটাই, কাজের ফাঁকে ফাঁকে জীবনটাও উপভোগ করতে হবে।

নবীন শিল্পীদের উদ্দেশে তিনি প্রায়ই বলতেন, একদিন বা অল্পদিন টিকে থাকার জন্য নয়, আজীবন টিকে থাকার জন্য তোমরা সঙ্গীতচর্চা করবে। এ জন্য একনিষ্ঠ সাধনার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। কারণ গান অনেক অনেক সাধনার বিষয়।

সুবীর দা’র এভাবে চলে যাওয়া সঙ্গীতের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। এক এক করে কয়েকজন চলে গেলেন। সঙ্গীতাঙ্গনে যে কি হবে বুঝতে পারছি না। নিজের কাছেও খারাপ লাগছে খুব। মানতে পারছি না সুবীর দা’ আমাদের সামনে আর গান করবেন না।

তবে তিনি যে সৃষ্টি রেখে গেছেন তাতে সারা জীবন মানুষ তাকে মনে রাখবে। কোটি কোটি শ্রোতা হৃদয়ে আসন পেতে থাকবেন তিনি। সুবীর দা’ বেঁচে থাকবেন তার অগণিত শ্রোতাপ্রিয় গানের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। দোয়া করি তার আত্মা যেন শান্তি পায়।