শ্রমিকবান্ধব পরিবেশে কাজ করছেন ক্রাউন ওয়্যারের কর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার শেষ সীমানায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ক্রাউন ওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেড। শতভাগ রফতানিমুখী গার্মেন্ট কারখানাটিতে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি কখনই। প্রতিষ্ঠানটিতে সাধারণ শ্রমিকদের পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ রয়েছে প্রতিবন্ধীদেরও। শ্রমিকদের বেতন-বোনাসও পরিশোধ করা হয় সময়মতো। পেশাগত স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভালো অনুশীলনের জন্য সরকারের কাছ থেকে শতভাগ শ্রমিকবান্ধব কারখানার স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ময়মনসিংহ জেলায় গত দুই দশকে গার্মেন্ট শিল্পের প্রসার হয়েছে ব্যাপক। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রচুর নারী শ্রমিকের। যদিও এসব গার্মেন্টের মধ্যে নারী ও শ্রমিকবান্ধব কারখানা হিসেবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হাতেগোনা। এমনই একটি স্বীকৃত শ্রমিকবান্ধব কারখানা ক্রাউন ওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেড।

২০১০ সালে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ী এলাকায় নয় একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রাউন ওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেড। উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকেই নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে কার্যাদেশ পেয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে প্রতি বছর এসব দেশে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করছে ক্রাউন ওয়্যার।

প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক নাঈম আহমেদ জানান, এখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা নয় হাজারের বেশি, যার মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী। এদের মধ্যে স্বামী পরিত্যক্তা ও প্রতিবন্ধীও রয়েছেন। নারী শ্রমিকদের জন্য রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি। শিশুদের জন্য ডে কেয়ার ও চাইল্ড কেয়ারসহ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য চিকিৎসকসহ মিনি হাসপাতালও রয়েছে এখানে। এখান থেকে শ্রমিকদের বিনামূল্যে ওষুধও দেয়া হয়। শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিটি ভবনেই রয়েছে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ একাধিক সিঁড়ি। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়।

বর্তমানে এখানে অন্যান্য শ্রমিকের সমপরিমাণ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করছেন আরো ২৫ জন প্রতিবন্ধী শ্রমিক। যেসব শ্রমিককে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কাজ দিতে অনীহা প্রকাশ করে, তাদের কাজ করার সুযোগ দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

জন্মগত প্রতিবন্ধী পীযূষ কুমার সরকার জানান, আমি জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী। আমার একটি পা নেই। ডান হাতে একটি আঙুল কম। মাস্টার্স পাস করার পরও আমার চাকরি জোটেনি। এ প্রতিষ্ঠান আমাকে চাকরির সুযোগ করে দিয়েছে। আমি স্টোরে কাজ করি। প্রতিবন্ধী বলে আমাকে কেউ অবমূল্যায়ন করেন না।

সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো জোসনা আরা খাতুন নামের এক শ্রমিক কারখানাটিতে কাজ করছেন সুইং অপারেটর হিসেবে। তিনি বলেন, সিআরপির মাধ্যমে আমি এ গার্মেন্টে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আগে মনে হতো, আমার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব না। কিন্তু এ চাকরি আমাকে অন্যের বোঝা হতে দেয়নি। এখন আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ।

কারখানার কাজের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও সন্তুষ্ট শ্রমিকরা। তানজিলা আক্তার নামে কারখানার এক সুইং অপারেটর বলেন, এখানকার কাজের পরিবেশ অনেক ভালো। কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বেতন-বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা যথাসময়েই পরিশোধ করা হয়। আমি আগে অন্য গার্মেন্টে কাজ করতাম। কিন্তু সেখানে এখানকার মতো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। আমার সন্তানকে এখানে রেখেই আমি নিশ্চিন্তে কাজ করছি।

শ্রমিকদের জন্য কারখানার পক্ষ থেকে দেয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্রাউন ওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. জাকারিয়া সোহেল জানান, এখানে শ্রমিকদের ঈদ বোনাসসহ বেতন যথাসময়ে পরিশোধ করা হয়। এছাড়া হাজিরার ওপরও বোনাস রয়েছে। শ্রমিকদের জন্য রয়েছে টার্গেট বোনাস। প্রত্যেক শ্রমিককেই উৎসব পালন করার জন্য বছরে ১৩টি ছুটি দেয়া হয়। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি দুগ্ধদানকারী প্রত্যেক নারী কর্মীকে বিনা মূল্যে খাবার দেয়া হয়। কারখানার পক্ষ থেকে ডে-কেয়ারে থাকা প্রতিটি শিশুর জন্মদিন পালন করা হয়। এছাড়া সাভারের সিআরপির মাধ্যমে প্রতি দুই মাস পর দুজন করে প্রতিবন্ধী শ্রমিককে প্রশিক্ষিত করে নিয়োগ দেয়া হয়।

সার্বিক বিষয়ে ক্রাউন ওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, এখানে আমাদের প্রত্যেক কর্মীকে মূল্যায়ন করা হয়। তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথা মাথায় রেখেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। এখানে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ বাস্তবায়ন করা হয় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী। বিজিএমইএ ও আইএলওর নির্দেশনা অনুযায়ী কারখানায় সব রকমের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য বীমা ব্যবস্থা আছে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও প্রতি মাসে ফায়ার ড্রিল করানো হয়। এ কারখানায় বর্জ্য শোধনাগারসহ রয়েছে ইটিপি ব্যবস্থা। সোলারের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ কারখানার তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখা ও শ্রমিকদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা রয়েছে। কারখানায় নারী কর্মীদের উচ্চপদে নিয়োগ ও পদোন্নতিও দেয়া হয়। শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি হিসেবে গত বছর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওএসএইচ গুড প্র্যাকটিস (পেশাগত স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভালো অনুশীলনের জন্য) অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠান।