বার্সেলোনায় গ্রেফতারকৃত মানবপাচারকারী চক্রের অভিযুক্তরা বাংলাদেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

 স্পেনের ‘ন্যাশনাল পুলিশ’ ১১ সদস্যের মানবপাচারকারী একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছে। গত ২ মে গ্রেফতারকৃত এ চক্রের ১১ সদস্যই বাংলাদেশি বলে জানিয়েছে তারা।

স্পেন পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, চক্রটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অন্তত সাড়ে তিনশ’ মানুষকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্পেনে পাচার করেছে। মানব পাচারকারীরা ‘বাংলাদেশি’ উল্লেখ করলেও তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। 

নিজেদের ওয়েবসাইটে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারের একটি ভিডিও চিত্রও প্রকাশ করেছে তারা। এ ঘটনা প্রকাশিত হবার পর স্পেনে বাংলাদেশিদের সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে বলে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। স্পেন সরকার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য না পাওয়ায় দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সংক্রান্ত বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গ্রেফতারকৃত ১১ সদস্যের এ চক্রটি ১৪ হাজার থেকে ২০ হাজার ইউরোর বিনিময়ে এশিয়া থেকে স্পেনে মানবপাচার করে আসছিল। অভিবাসন প্রত্যাশী সেসব মানুষকে ভারত থেকে আলজেরিয়ার ভিসা নিয়ে বিমানযোগে প্রথমে আলজেরিয়ায় আনা হয়। আলজেরিয়ার আর্জেল, ওরান কিংবা মাঘনিয়া থেকে তাদেরকে মরক্কোর রবাত, কাসাব্লাঙ্কা, তেতুয়ান, ওজদা শহরে প্রবেশ করানো হয়। এরপর ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে জিব্রাল্টার প্রণালী ও তার আশপাশ দিয়ে ভ‚মধ্যসাগর হয়ে স্পেনে প্রবেশ করানো হয়।

স্পেন পুলিশের সংবাদ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মরক্কো ও আলজেরিয়ায় তাদের নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতে স্পেনে গ্রেফতারকৃতদের শনাক্ত করা হয়। গ্রেফতারের সময় মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে নগদ ১৮ হাজার ইউরো, বাংলাদেশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া স্ট্যাম্প, ৩২টি ভুয়া পাসপোর্ট, দুই শতাধিক ভুয়া সনদপত্রসহ চক্রটির বিভিন্ন তথ্যসমৃদ্ধ ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বার্তা সংস্থা এএফপির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্সেলোনায় আটক হওয়া চক্রটির অধীনে আরও সাতটি সেল কাজ করে। এরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে যায়। সেলগুলো মানবপাচার চলাকালীন বিভিন্ন দেশে এই অভিবাসীদের থাকার ব্যবস্থা করে এবং সীমান্ত পার হতে সহযোগিতা করে। আরেকটি সেল ভ‚মধ্যসাগর পার করিয়ে দেয়। শুরুতে অল্প টাকায় তাদের নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বকেয়া টাকা নেয় তারা।

একই প্রসঙ্গে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এসব অভিবাসী স্পেনে প্রবেশের পর তাদেরকে ভুয়া বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও বাংলাদেশ পুলিশের ভুয়া চারিত্রিক সনদ দেওয়া হয়। সেই ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে স্পেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারেন তারা।

এদিকে, গ্রেফতারকৃত মানবপাচার চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশি হওয়ায় দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। স্পেন বাংলা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, স্পেনে বাংলাদেশিদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। কিন্তু এমন কর্মকাণ্ডে স্পেনের প্রশাসনে আমাদের সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হবে।

বার্সেলোনার প্রবীন কমিউনিটি নেতা আব্দুল বাছিত কায়ছার বলেন, অবৈধ পথে দালালদের ফাঁদে পড়ে ইউরোপে যারা আসার চেষ্টা করছেন, তাদের অধিকাংশই সফল হচ্ছেন না। পথিমধ্যে সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণ করার খবর অহরহ শুনেও আমরা সচেতন হচ্ছি না। এসব দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা।

স্পেন পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী বার্সেলোনায় আটককৃত মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশি কী না- এ ব্যাপারে স্পেনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে দূতালয় প্রধান ও মিনিস্টার এম হারুণ আল রাশিদ বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেন সরকার থেকে এখনো কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি। তাই আটকৃতরা বাংলাদেশি কী না- এ ব্যাপারে আমরা কোন মন্তব্য করছি না। তবে চক্রটি দ্বারা কোন প্রবাসী বাংলাদেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।