চার কারণে বেড়েছে টাকা পাচার, কার্যকর পদক্ষেপ চান অর্থনীতিবিদরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

দেশ থেকে টাকা পাচার অর্থনীতিতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি এবং বেপরোয়া দুর্নীতি- এ চার কারণে মূলত এই পাচারের ঘটনা ঘটছে। যা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে।

প্রতি বছর দেশে যে হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তার কয়েকগুণ বেশি টাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে বিষয়টি বড় করে আসছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সঞ্চয় ৫ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশে কমলেও বাংলাদেশিদের জমা বেড়েছে।

এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্টে বলা হয়েছে, এক বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আর ১০ বছরে পাচার হয়েছে সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের তৈরি করা পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসেও টাকা পাচারের তথ্য আসছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শুক্রবার বলেন, টাকা পাচার হচ্ছে বলেই সুইস ব্যাংকে জমা হচ্ছে। এর অন্য কোনো ব্যাখা নেই।

তিনি বলেন, কোনো একটি হিসাবে দেখা গেছে দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ শতাংশই কালো টাকা। এই কালো টাকাই বিদেশে পাচার হয়।

তার মতে, পাচার রোধে সরকার কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে এর সঙ্গে জড়িতরা উৎসাহিত হয়।

তিনি আরও বলেন, টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণ করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা বিদেশিদের জমাকৃত অর্থের তথ্য বৃহস্পতিবার প্রকাশ করে সুইস ব্যাংক।

ওই রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে সুইস ব্যাংকে আনুপাতিক হারে যেসব দেশের সঞ্চয় বেড়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আলোচ্য সময়ে দেশটিতে সারা বিশ্বের আমানত কমেছে। এ সময় বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি ফ্র্যাংক।

আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে যা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। এ হিসাবে আমানত কমেছে ৮ হাজার কোটি ফ্র্যাংক।

এছাড়া প্রথম অবস্থানে যুক্তরাজ্যের আমানত ৩৯ হাজার থেকে কমে ৩৬ হাজার ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমানত ১৬ হাজার থেকে কমে ১৪ হাজার, চীন ১ হাজার ৫ থেকে কমে ১ হাজার ৩শ’ ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে।

পাশের দেশ ভারতে আমানত ৭ কোটি ফ্র্যাংক কমে ৯৩ কোটি, পাকিস্তান ৩৮ কোটি কমে ৭২ কোটি এবং নেপালে ৮ কোটি কমে ৩২ কোটি ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে।

আরও যেসব দেশের আমানত কমেছে এর মধ্যে রয়েছে- সিঙ্গাপুর, কানাডা, সৌদি আবর, কাতার, নরওয়ে, ওমান, মালয়েশিয়া, আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর।

এমনকি সম্মিলিতভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আমানত আগের বছরের চেয়ে ৫২৬ কোটি কমে ১৬ হাজার ৪৬০ কোটিতে নেমে এসেছে। কিন্তু সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৪৩ কোটি ১৩ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংকে উন্নীত হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ বা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, টাকা পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন রয়েছে, আমরা তা পুরোপুরি মেনে চলছি।

তবে তিনি বলেন, সুইস ব্যাংকের আমানতের বিভিন্ন ক্যাটাগরি রয়েছে। ঢালাওভাবে পাচারের তথ্য যেভাবে বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। কারণ সুইস ব্যাংকের টাকার মধ্যে বিদেশে অবস্থান করা বাংলাদেশি নাগরিকদের আমানতের তথ্যও এর মধ্যে রয়েছে।

এক প্রশ্নের উত্তরে রাজী হাসান বলেন, কোনো বাংলাদেশিকে টাকা রাখার অনুমতি দেয়া হয়নি।

বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে কয়েকটি মাধ্যমে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে ঋণের টাকা সরাসরি ডলার নিয়ে যায় প্রভাবশালী মহল।

এছাড়া আমদানির নামে এলসি খুলে বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। এছাড়া রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানি মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি।

সম্প্রতি টাকা পাচারের আরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিটেন্স। বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স একটি চক্র সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় এর দায় শোধ করা হয়।

একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। ওইগুলোও পাচার হয়ে বিদেশের কোনো ব্যাংকে রাখা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতার কারণে নির্বাচনকালীন টাকা পাচার বাড়ে। আর পাচার বন্ধের ব্যাপারে সরকারের কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত থাকলে পানামা পেপারস এবং প্যারাডাইস পেপারসে যাদের নাম আছে, তাদের ধরে এনে শাস্তি দেয়া হতো।

তার মতে, সরকারের আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) অন্যান্য সংস্থা যতই বাহ্যিক তৎপরতার কথা বলুক, তাতে কোনো লাভ হবে না।

অন্যদিকে চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। যা আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। একক বছর হিসেবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে চার প্রক্রিয়ায় ৫৯০ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে ২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

সূত্র বলছে, দুর্নীতি ও চোরাচালানের মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। ওইসব টাকায় দুর্নীতিবাজরা বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলছেন, জমা রাখছেন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে।

এর বাইরে আরও অনেক ব্যাংকে বাংলাদেশের পাচারকারীদের টাকা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে মালয়েশিয়ার সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশির জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী। দেশ থেকে বিদেশে কোনো টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। কিন্তু এ পর্যন্ত কাউকে ব্যাংক থেকে এই ধরনের কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- অনুমোদন না দেয়ার পরও মালয়েশিয়ায় কিভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হল বাংলাদেশ। এছাড়া কানাডায় রয়েছে বাংলাদেশি অধ্যুষিত একটি অঞ্চল ‘বেগমপাড়া’। পাশাপাশি ব্রিটেন, হংকং, সিঙ্গাপুরেও বাংলাদেশিদের টাকা রয়েছে বলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সহায়তায় তথ্যের আদান-প্রদান করতে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ১৪৭টি দেশ ওই গ্রুপের সদস্য। বাংলাদেশ এই গ্রুপের সদস্য হওয়ায় এখন সবগুলো দেশ থেকে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বা টাকা পাচারবিষয়ক যে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।