পুঁজিবাজারে ৪ ঘন্টায় ৫ হাজার কোটি টাকা হাওয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

একদিনে চার ঘণ্টা লেনদেনের সময়। আর এ চার ঘণ্টায় কয়েক লাখ বিনিয়োগকারীর হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। রোববার একদিনেই দেশের দুই পুঁজিবাজারেই ৫ হাজার কোটি টাকা করে মূলধন অস্তিত্ব হারিয়েছে। হাওয়া হয়ে গেছে কয়েক লাখ বিনিয়োগকারীর কষ্টার্জিত এ মূলধন। ৩ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা মূলধন নিয়ে দিন শুরু করা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূলধন দিনশেষে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায়।

অন্য দিকে ৩ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা মূলধন নিয়ে যাত্রা করা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মূলধন দিনশেষে ৩ লাখ ৭ হাজার কোটিতে নেমে আসে। হাওয়া হয়ে যাওয়া সব টাকাই শিক্ষক, ছাত্র, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগী মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ। আবার কারো কারো জীবনের শেষ অবলম্বন।

 

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, কোন দিকে যাচ্ছে পুঁজিবাজার? সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ভাষ্য মতে, দেশের অর্থনীতি যেখানে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো পারফর্ম করছে, ফি-বছর বাড়ছে প্রবৃদ্ধি, সেখানে অর্থনীতির আয়না হিসেবে পরিচিত পুঁজিবাজরের এ দশা কেন?

আর যারা এ বাজারের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তারাইবা কোথায়? এই মাত্র সেদিন গত ১৫ জুলাই বড় ধরনের দরপতনের শিকার হয় পুঁজিাবাজার। ওই দিনই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন নেই হয়ে যায় ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মাত্র তিন দিনের মাথায় আবার এত বড় ধস। একদিনেই সূচকের ২ শতাংশ পতন। আর এ ধসে সরকার বা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কোনো ক্ষতি না হলেও বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকেই চলে গেল ৫ হাজার কোটি টাকা।

গতকাল বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে গিয়ে দেখা যায় বিনিয়োগকারীদের চরম অসহায়ত্ব। বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী মূলধনের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোকসান দিয়েই শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে এমন আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে যে, এখন বিক্রি না করলে মূলধনের যা টিকে আছে তারও অস্তিত্ব থাকবে না। আগে যেখানে ক’দিন বাজারের পতন ঘটলে সবার মধ্যে বিক্ষুব্ধ ভাব দেখা যেত গতকাল তারও অস্তিত্ব ছিল না।

লেনদেনের মাঝামাঝি সময়েও যখন বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ নেই তখন বিক্রয়চাপ আরো বেড়ে যায়। আর এভাবে দিনশেষে সূচকের প্রায় ১০০ পয়েন্ট হারায় ঢাকা স্টক। চট্টগ্রাম স্টক হারায় ৩০৯ পয়েন্ট। ব্রোকার হাউজগুলোতে বিনিয়োগকারীদের সাথে বিভিন্নভাবে কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ডিএসইর সামনে ফুটপাথে কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে বাজার নিয়ে কথা বললে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বারবার পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়ার কথা বলা হলে দুই দুইবার বিপর্যয়ের শিকার হওয়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না।

২০১৯-’২০ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য দেয়া কিছু কিছু প্রণোদনাকে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও দুঃখজনকভাবে বাজেট পাসের পর থেকেই টানা পতন ঘটছে পুঁজিবাজারের। এর অর্থ সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয় যা মনে করছে বাস্তবতা তা থেকে ভিন্ন।

তারা আরো বলেন, বিশ্বের কোনো পুঁজিবাজার আমাদের বাজারের সাথে মেলে না। আমাদের পুঁজিবাজারের কোনো মা-বাপ নেই। বাজার নিয়ে সবাই বড় বড় কথা বলেন। এই সেদিনও অর্থমন্ত্রী নতুন করে পুঁজিবাজারের জন্য ভালো কিছু করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেন। আর এর পরদিনই বড় পতনের মুখে পড়ল বাজার। এর অর্থ বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা এ মুহূর্তে শূন্যের কোটায়। কারণ তারা জানেন নীতিনির্ধারকদের এ ধরনের কথা এখন মুখের বুলি মাত্র।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে সময় লেগেছে এক যুগেরও বেশি। এর পর ২০১০ সালে আবার বিপর্যয় ঘটে। এ দুইবারের বিপর্যয় পুঁজিবাজারের ভিত্তিকে মজবুত করার ক্ষেত্রে নানা শিক্ষণীয় উপাদান রেখে গেলেও প্রকৃতপক্ষে তা থেকে কোনো কিছুই শিখতে পারেনি আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ।

২০১০ সালের বিপর্যয়ের পর নতুন গঠিত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তিন মাসের মধ্যে বাজার পরিস্থিতির উন্নতির ওয়াদা করে সংস্থাটির দায়িত্ব নিলেও গত আট বছরে এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাদের আশঙ্কা আগের বিপর্যয়গুলোর সময় পুঁজিবাজারের যে আকার ছিল এখন তার চেয়ে অনেক বড়। সুতরাং আবার যদি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুঁজিবাজার, তাতে লোকসান যেমন বাড়বে তেমনি বাড়বে লোকসানের শিকার বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও। আর ২০১০ সালের মতো এ ঘটনা আরো বেশি সংখ্যায় আত্মহননের মতো পথে নিয়ে যাবে বিনিয়োগকারীদের।