মানা হচ্ছে না হাইকোর্টের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

নানা ধরনের শব্দে অতিষ্ঠ নগরবাসী। বাড়ির বাহিরে পা দিলেই বিকট সব শব্দে মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে যানবাহনের হর্ন ও হাইড্রোলিক হর্ন নগরবাসীর জন্য বাড়তি বিরক্তির সৃষ্টি করে। হাইকোর্টের নির্দেশনা সত্ত্বেও যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ হয়নি। এখনও উচ্চ শব্দের এ হর্ন বাজিয়ে রাজধানীতে ছুটছে যানবাহন। এর বিরুদ্ধে চলছে পুলিশি অভিযান, চলছে মামলা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গেল ছয় মাসে ট্রাফিক পুলিশ ১৮ হাজার ৫২২টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। আর এ ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৩৩৮টি।

এ সম্পর্কে ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, আমরা প্রায়শই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ অভিযানের সময়ে হাইড্রোলিক হর্নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই। এ অভিযান অবশ্যই ইতিবাচক ফল নিয়ে আসে। রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার কমেছে।

হাইড্রোলিক হর্ন হচ্ছে উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী বিশেষ হর্ন। আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (আশা) ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানুষের জন্য শ্রবণযোগ্য শব্দের সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ ৪০ ডেসিবেল। কিন্তু হাইড্রোলিক হর্ন শব্দ ছড়ায় ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত। এর স্থিতি ৯ সেকেন্ডের বেশি হলে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। দেশের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুসারে রাজধানীর মিশ্র (আবাসিক ও বাণিজ্যিক) এলাকায় দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ৬০ ডেসিবেল। এর চেয়ে উচ্চ মাত্রার শব্দে শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদ?রোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, বিরক্তি সৃষ্টি ও শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘন ঘটতে পারে। হাইড্রোলিক হর্ন নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমের মধ্যেও ঢাকায় এখনও এ হর্ন বিক্রি হচ্ছে। দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। সরেজমিন গেল সোমবার মোহম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের প্রবেশ পথে নামহীন এক গ্যরাজে দেখা গেছে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে হর্ন।

দোকানির ভাষ্য এ হর্নগুলো তারা ধোলাইখাল ও নবাবপুর থেকে কিনেছেন। বসিলার বাবুল মোটর্সের এক কর্মী জানান, এ হর্ন আগে বেশি বিক্রি হতো, এখন কমেছে। চেনা ক্রেতা ছাড়া আমরা এখন আর সবার কাছে এসব হর্ন বিক্রি করি না। তবে ট্রাকের জন্য এ হর্ন বেশি নেওয়া হয়।

পরিবেশবিদ ড. আবু নাসের খান বলেন, ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় চলে গেছে। ঢাকার এ অধপতনের জন্য শব্দদূষণও দায়ী। বিভিন্ন ধরনের শব্দে মানুষ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাই এর বিরুদ্ধে প্রায়শই অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, উচ্চ মাত্রার হর্নে পথচারী ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এ হর্নের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে আমরা অভিনন্দ জানাই।

সার্বিক স্বাস্থ্য ও শ্রবণ প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর বলে উচ্চ আদালতে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন আদালত। তখন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয় পুলিশকে। পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে গাড়ির মালিক ও চালকদের থানায় হর্ন জমা দিতে এবং এ হর্ন ব্যবহার করা গাড়ি জব্দ করতেও পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মোহম্মদপুর প্রিপারেটরি বিদ্যালয়ে সন্তান ইলমাকে প্রতিদিন স্কুলে আনেন শান্তা ইসলাম। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ির হর্নে তো কান ঝালাপালা হয়ে যায়। আর ট্রাকগুলো হাইড্রোলিক হর্ন এখনও ব্যবহার করে।

যুক্তরাজ্যের একদল চিকিৎসক নতুন এক গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণা প্রতিবেদনটি ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নাল সাময়িকীতে জুন মাসে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, যেসব এলাকায় দিনের বেলা রাস্তায় শব্দের তীব্রতা ৬০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায়, ওইসব স্থানে মানুষের মৃত্যুর হার তুলনামূলক কোলাহলপূর্ণ (শব্দের তীব্রতা ৫৫ ডেসিবেলের কম) এলাকার চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি। ঢাকায় আবাসিক এলাকায় দিবাকালীন শব্দের মাত্রা ৮৪ থেকে ৯৩ ডেসিবল, যা মাত্রার চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক কর্মসূচি পরিচালক ফরিদ আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকায় মাত্রার চেয়ে দেড় গুণ বেশি শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে। ২৩ এপ্রিল ধানমন্ডির সরকারি বয়েজ স্কুলের সামনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক কর্মসূচির জরিপ কাজের সময় তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ এ জরিপ করে।

ফরিদ আহমেদ আরও বলেন, শব্দদূষণ জনস্বাস্থ্যর জন্য মারাত্মক হুমকি। শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, বধিরতা, হৃদরোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, বিরক্তি সৃষ্টি, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘিত হওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিদের আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে শব্দদূষণ প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ।