পাটে সংকট প্রকট

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

বড় দুর্দিনে পড়েছে পাট খাত। অভ্যন্তরীণভাবে পাটপণ্যের চাহিদা নামমাত্র। দুই বছর ধরে রফতানিতে চলছে মন্দা। পাটপণ্যের মজুদ বেড়ে এখন ৭০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। দেশে কেউ কিনছে না। রফতানিও হচ্ছে না। অবিক্রীত পণ্যের বড় এই মজুদ নিয়ে বিপদে আছেন অনেক উদ্যোক্তা। এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। বিক্রি না হওয়ায় সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে অনেক কারখানা। তারপরও মজুদ বাড়ছেই। বিক্রি বা রফতানি না হওয়ায় হাতে টাকা আসছে না। এদিকে গুদামে পণ্য সংরক্ষণের ব্যয়, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের তাগাদা তীব্র হচ্ছে। এসব কারণে চরম সংকট চলছে পাট খাতে।

বিশ্নেষকরা বলছেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, পাট খাতের এই সংকট উত্তরণে বাজেটেও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চার বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের মর্যাদা দেওয়ার জন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আজও তা কার্যকর হয়নি। এই মর্যাদা দেওয়া হলে অন্যান্য কৃষিপণ্যের মতো পাটপণ্য রফতানি করে উদ্যোক্তারা ২০ ভাগ প্রণোদনা পেতেন। এতে করে পাটচাষিরাও দাম বেশি পেতেন। চাষও বাড়ত। ফিরত পাটের সুদিন। কিন্তু সুদিন তো দূরে থাক, এ খাতে সংকট প্রকট হচ্ছে।

পাটের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ২০১০ সালে আইন করে সরকার। সেখানে বিভিন্ন পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহারে বাধ্যবাধকতার বিধান করা হয়। প্রথমে ছয়টি, পরে তেরোটি এবং সবশেষ মোট ১৯টি পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় এই আইনে। আইনে জেল-জরিমানাসহ কঠোর শাস্তির বিধানও রাখা হয়। তবে এ আইনের প্রয়োগ সাম্প্রতিককালে তেমন একটা চোখে পড়ে না। 

গত ২০১৭ সালে বন্যায় সিলেট অঞ্চলের হাওরের ধান তলিয়ে যায়। ধান-চালের মজুদ সংকট তীব্র হয়। বন্যার পর চাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক্ক কমানোসহ পাটের ব্যাগ ব্যবহারে শিথিলতার সুযোগ দেওয়া হয়। এতেই যেন পাটের পাঠ চুকে যায়। এরপর এ আইনের তোয়াক্কা করছেন না ব্যবসায়ীরা। বিগত বছরগুলোতে আইন বাস্তবায়নে বিচ্ছিন্ন এবং মৌসুমি অভিযান থেকে কিছু সুফল পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু অনেক দিন ধরে সেরকম কোনো অভিযানও আর চোখে পড়ছে না। পাটের মোড়কের ব্যবহারও কমে গেছে নিদারুণভাবে। পলিথিনসহ অন্যান্য ব্যাগই এখন পণ্যের অন্যতম মোড়ক। 

দেশের ভেতরে পাটপণ্যের বাজার ভালো না। এ পরিস্থিতির সঙ্গে রফতানি খরাও যুক্ত হয়েছে। ফলে পাটের সংকট এখন প্রকট। দুই বছরের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে পাটপণ্যের রফতানি আয়। পাটপণ্য বলতে হোসিয়ান (চট), সেকিং (বস্তা), সিবিসি (কার্পেট প্যাকিং) ও পাটের সুতাকে বোঝানো হয়। এর বাইরে বহুমুখী পাটপণ্য হিসেবে কিছু পণ্য রফতানি হয়ে থাকে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, সমাপ্ত (২০১৮-১৯) অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রফতানি কমেছে আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ। রফতানি হয়েছে ৮২ কোটি ডলারের পাট ও পাটপণ্য। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১০৩ কোটি ডলার। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে রফতানি কমেছে পাটের ব্যাগ এবং বস্তার। আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কমেছে রফতানি। পাটের সুতার রফতানি কমেছে ২১ শতাংশ। 

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রফতানিতে খরার প্রধান কারণ হচ্ছে, সবচেয়ে বড় বাজার ভারত সরকারের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক্কারোপ। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশি পাটপণ্যে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ৩৫২ ডলারসহ বিভিন্ন হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক্কারোপ করেছে দেশটি। এরপরই দেশটিতে পাটপণ্যের রফতানি কমছে ব্যাপক হারে। ভারতীয় উদ্যোক্তাদের অভিযোগ হলো- বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে ভারতে পাটপণ্য রফতানি করছেন। যদিও এ দাবি বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কারণ, লাভ ছাড়া লোকসানে কেউ রফতানি করবেন না, এটাই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারী প্রশ্ন তোলেন, উদ্যোক্তারা কোন যুক্তিতে লোকসান দিয়ে রফতানি করবেন। তিনি জানান, ভারতীয় উদ্যোক্তাদের এ দাবি মিথ্যা। এ বিষয়ে ভারত সরকারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে অ্যান্টিডাম্পিং এখনও বহাল আছে। 

পাটপণ্যের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারত ছাড়াও পাটপণ্যের প্রায় সব বাজারেই নানান সংকট চলছে। উল্লেখযোগ্য বাজারের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রফতানি কমছে। আফ্রিকান দেশগুলোতে ঘানা ছিল বাংলাদেশের পাটের প্রধান বাজার। বছর দুয়েক আগে দেশটিতে পাটকল চালু করেছে ভারত। এ কারণে সেখানেও এখন আর বাংলাদেশের পাটপণ্যের চাহিদা নেই। 

বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ হিসাব পর্যন্ত তাদের মিলগুলোর অবিক্রীত পাটপণ্যের পরিমাণ ৭০ হাজার টন। বর্তমান বাজার দরে মূল্য ৫৮০ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। প্রায় দুই বছর ধরে এসব পণ্য গুদামে পড়ে আছে। বিক্রি না হওয়ায় সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে অনেক কারখানা। তারপরও মজুদ বাড়ছে। গত বছরের জুলাইয়ে মজুদের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার টন। অর্থাৎ উৎপাদন কমিয়ে আনার পরও এক বছরে অতিরিক্ত মজুদ বেড়েছে ৩০ হাজার টন। এ বাস্তবতায় কয়েকটি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। একরম একটি মিল খুলনার আফিল জুট মিলস। মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আকরাম হোসেন সমকালকে বলেন, দুই বছর ধরে তার কারখানা বন্ধ। লোকসানজনিত অর্থ সংকটেই কারখানাটি বন্ধ করতে হয়েছে। 

তবে পাটের বাণিজ্য বাড়াতে এখনও আশাবাদী সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পাট খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। রফতানিপণ্যে বৈচিত্র্য আনার পদক্ষেপ হিসেবে পাটপণ্যসহ কিছু পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে বিভিন্ন ধরনের পাটপণ্যের চাহিদা এখন বাড়ছে। ফলে পাটপণ্যের রফতানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় সরকার। 

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণলায় সূত্রে জানা গেছে, পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার বাড়াতে ১৯ পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহারে বাধ্যবাধতামূলক আইন কার্যকরে আগামী মাসে রাজধানীসহ সারাদেশে অভিযান চালানো হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করবে। রাজধানীর প্রবেশপথ, সকল স্থল ও নৌবন্দর, সড়ক-মহাসড়কসহ সারাদেশে একসঙ্গে চালানো অভিযানে র‌্যাব-পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেবেন। এবারই প্রথম উপজেলা পর্যায়েও অভিযান চালানো হবে। এই ১৯ পণ্য হচ্ছে- ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি, মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, আটা, ময়দা ও তুষ-খুদ-কুঁড়া, পোলট্রি ফিড ও ফিস ফিড। আইনটি বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতি বছর ১০০ কোটি পাটের বস্তার চাহিদা তৈরি হবে। স্থানীয় বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, চাষিরাও পাটের ন্যায্য মূল্য পাবেন। 

বিজেএমএর সচিব আব্দুল বারিক খান সমকালকে বলেন, রফতানিতে মন্দা পরিস্থিতি মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ বাজার বাড়াতে সিমেন্ট প্যাকিংয়ে পলিথিন ব্যাগের পরিবর্তে পাটের মোড়ক বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন তারা। বছরে ৭০ কোটি সিমেন্টের ব্যাগের চাহিদা এখন। দুই বছর আগে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে এই অনুরোধে এ পর্যন্ত কোনো সাড়া পাননি তারা। এছাড়া পাটপণ্যের রফতানি বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোক্তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বিভিন্ন দেশে মিশন পাঠানোর অনুরোধ রক্ষা করা হয়নি। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে ভারতের একজন মন্ত্রী ঢাকায় আসবেন। তার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে অ্যান্টিডাম্পিং নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি জানান, উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে ভারতে রফতানির তথ্য যে সঠিক নয় সেসব তথ্য তুলে ধরে অ্যান্টিডাম্পিং প্রত্যাহারে ভারতীয় মন্ত্রীকে অনুরোধ করবেন তারা।