টানা পতনের পর হঠাৎ বড় উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

টানা পতনের পর মঙ্গলবার শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকে বড় উত্থান হয়েছে। মঙ্গলবার প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৯৩ শতাংশ শেয়ারের দর বেড়েছে। এতে প্রধান সূচক বেড়েছে ডিএসইএক্স ১১১ পয়েন্টেরও বেশি। সূচক বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ২৪ শতাংশ। সূচকের এ বৃদ্ধি পয়েন্টের দিক থেকে গত ৮ জানুয়ারি এবং বৃদ্ধির হার বিবেচনায় তা ২০১৮ সালের ১ এপ্রিলের সর্বোচ্চ। অবশ্য চলতি সপ্তাহের প্রথম দু'দিনের দরপতনে সূচকটি হারিয়েছিল ১৬৪ পয়েন্ট।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, লাগাতার পতনের পর বাজারের হঠাৎ এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার রাতে এবং মঙ্গলবার লেনদেনের শুরুর আগে অন্তত ১৮টি সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংককে শেয়ার কেনার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বাজার-সংশ্নিষ্টরা জানান, দরপতনের ভীতিতে যখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লোকসানের দিক না দেখে শেয়ার বিক্রি করছিলেন, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন পদক্ষেপ আশা জাগিয়েছে। এর আগে গত কয়েকদিনের দরপতনের সময় বিএসইসিসহ প্রভাবশালী বিভিন্ন সংস্থা ফোন করে ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে শেয়ার বিক্রি কমাতে বলেছিল। সংস্থাগুলো মনে করেছিল, এভাবেই দরপতন বন্ধ করা যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগকে প্রশংসা করে বাজার-সংশ্নিষ্টরা জানান, বাজারে তারল্য সংকট রয়েছে, বড় বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় নয়। এ অবস্থায় বড় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার প্রয়োজন ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক তাই করেছে। এ উদ্যোগের খবরে অনেকে শেয়ার বিক্রি বন্ধ করেছেন। যাদের কাছে টাকা আছে তারা কিনছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে বেশ তারল্য সংকট রয়েছে, এটা দৃশ্যমান। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেতে পারে। কিছুদিন আগে শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের দাবি এবং সরকারের পরামর্শে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ করে দিতে আইনি বিধানে কিছুটা ছাড় দিয়েছিল।

তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানিগুলোতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগকে শেয়ারবাজারে সংশ্নিষ্ট বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হবে না- এমন নিয়ম প্রবর্তনের কারণে অন্তত ১৮টি ব্যাংকের দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া বর্তমান বাজারদরে ব্যাংকগুলোর সাকল্যে বিনিয়োগ তাদের মূলধনের ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ব্যাংকগুলো মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে। ২০১০ সালের ধসের পর আইন দ্বারা বিনিয়োগ ক্ষমতা হ্রাস করার পরও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখনও পর্যন্ত শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। তবে নানা কারণে ব্যাংকগুলো গত কয়েক বছর ধরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে সক্রিয় নয়।

গত কয়েক মাসের দরপতনে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ করা শেয়ারের বাজারমূল্য কমার কারণেও পূর্বের তুলনায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, সুযোগ সৃষ্টির পরও ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে তেমন সক্রিয় হয়নি।

এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর স্বার্থেই বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক আমিনুর রহমান। তিনি সমকালকে বলেন, দরপতন হলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত শেয়ারের দরও কমে। আবার লোকসানে পড়লে প্রভিশনিং (মূলধন সংরক্ষণ) করতে হয়। এ অবস্থায় নিজেদের অবস্থা ভালো করতে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে কোন ব্যাংক কতটা শেয়ার কিনেছে, সে তথ্য জানা যায়নি। তবে সোমবারের তুলনায় ডিএসইর লেনদেন ১৪৭ কোটি টাকা কমে ৩১৭ কোটি টাকায় নেমেছে। বাজার লেনদেন বিশ্নেষণে দেখা গেছে, আগের দিনের তুলনায় গতকাল শুধু মিউচুয়াল ফান্ড খাতে লেনদেন বেড়েছে। অন্য সব খাতের লেনদেন কমেছে। লেনদেন কমার কারণ, গতকাল ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতা কম ছিল।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে জানান, ইতিপূর্বের বিনিয়োগ আইনি সীমার কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে তার ব্যাংকের নতুন করে বিনিয়োগ করার সুযোগ কম ছিল। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঢাকা ব্যাংক শেয়ার কেনার কোনো পরামর্শ পায়নি। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বললে ঢাকা ব্যাংক কিছু বিনিয়োগ করবে। তিনি অবশ্য বলেন, অল্প কিছু শেয়ার ছাড়া এখানে বিনিয়োগের জন্য ভালো শেয়ার খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এদিকে, শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্টরা জানান, শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগে ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচেষ্টার খবরে শেয়ার বিক্রির চাপ ছিল কম। উল্টো যাদের কাছে বিনিয়োগ করার মতো কিছু অর্থ ছিল, তারা শেয়ার কিনেছে। এটাই বাজারকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৫১ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ক্লোজিং প্রাইসের হিসাবে ৩২৭টিরই বাজারদর বেড়েছে। খাতওয়ারি হিসাবে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের গড় বাজারদর বেড়েছে ৫ শতাংশের ওপর। অন্য সব খাতের শেয়ারদর বাড়লেও বস্ত্র খাতের শেয়ারগুলোর বাজারদর বেড়েছে সবচেয়ে বেশি (৪.৬৩%)। বাকি খাতের ২ থেকে ৩ শতাংশ দর বেড়েছে।

দেখা গেছে, মঙ্গলবার অন্তত ৪৩ কোম্পানির শেয়ার দিনের সার্কিট ব্রেকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ দরে (নির্দিষ্ট দিনে কোনো শেয়ার সর্বোচ্চ যে দরে কেনাবেচা হতে পারে) লেনদেন হয়। এর মধ্যে লেনদেনের শেষ পর্যন্ত ওই দরে স্থির ছিল ৩৩টি এবং বিক্রেতাশূন্য ছিল। অবশ্য এসব শেয়ারের অধিকাংশই ছিল রুগ্‌ণ ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি।

মঙ্গলবার শেয়ারদর ও সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও বাজারের সব সংকট শেষ হয়ে গেছে এমনটা মনে করার কারণ নেই বলে জানান বাজার-বিশ্নেষকরা। তারা জানান, অতীতে দরপতনের সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। এ কারণে বাজার-সংশ্নিষ্টদের কোনো উদ্যোগে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পান না। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কার্যকর না হলে আস্থার সংকট আরও বাড়বে। বাজারকে দরপতনের ধারা থেকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতে ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করা প্রয়োজন বলে মত দেন তারা।

এদিকে, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি সূত্র জানিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে শেয়ারবাজারের জন্য সরকারের ঘূর্ণায়মান তহবিল থেকে বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকার ডিলার এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির জন্য ৮৫ কোটি টাকা ছাড় করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সোমবার টাকা ছাড়ের জন্য চিঠি দেওয়ার পরদিনই গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ টাকা ছাড় করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।