রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

সবাই ঘরে ফিরতে চায়, রোহিঙ্গারাও চায়। শরণার্থীর জীবন যত নিরাপদ হোক—সেখানে স্বস্তিও নেই, শান্তিও নেই। যত ভালো ব্যবস্থাই করা হোক, থাকা-খাওয়া আর চিকিত্সার জন্য শরণার্থীর মধ্যে ছিন্নমূল হওয়ার কারণে অস্থিরতা কাজ করে সর্বক্ষণ। তারা পুনর্বাসন নয়, প্রত্যাবর্তন করতে চায় নিজ দেশে, স্বগৃহে। সপরিবারে, পাড়াপ্রতিবেশী নিয়ে যে জীবন আর দয়ার সাহায্য নয়, নিজ শ্রমে উপার্জিত আয় দিয়ে জীবনযাপনে যে মর্যাদা আর সন্তুষ্টি তার আকর্ষণ দুর্নিবার। সব শরণার্থী সর্বকালে সব দেশে এভাবেই ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখে, তাদের কেউ ঘরে ফেরে, কেউ ফেরে না।

 

বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কতজন ফিরে যাবে স্বদেশে, স্বগৃহে তা ভবিষ্যতই বলতে পারে। কিন্তু এখন কিন্তু অনুমান করে বলা যায় কোন পরিস্থিতিতে তারা শরণার্থী শিবির ত্যাগ করে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। শরণার্থী হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে আগেও দলে দলে রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশুরা এসেছে। কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায় বলতে গেলে তাদের স্থায়ী শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছে নব্বইয়ের দশকে থেকে। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে সুনামির মতো একসঙ্গে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফে এসে পৌঁছায় তাদের সংখ্যা এর আগে আসা শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ছাপিয়ে যায় রাতারাতি। সেখানে আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে ৭ লাখ। আর কোনো দেশে একসঙ্গে এই বিপুল সংখ্যায় শরণার্থী উপস্থিত হয়নি। বাইরের বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে কীভাবে ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশ সরকার মানবিক বিবেচনায় এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নিজ দেশের মানুষ অনেক কষ্টে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর তার উদার দৃষ্টিতে সহানুভূতিশীল হয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ইতস্তত করেনি, এর জন্য অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক কোনো খাদ্যাভাব ও মহামারি ঘটতে না দিয়ে দুই বছরের ওপর নতুন ও পুরাতন শরণার্থী প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর থাকা-খাওয়া এবং চিকিত্সার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ শরণার্থী ব্যবস্থাপনার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা মিয়ানমার সরকারের বর্বরোচিত এবং অমানবিক আচরণের শিকার রোহিঙ্গাদের ওপর নজিরবিহীন নিপীড়নে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জেনোসাইড সংঘটিত করেছে সে দেশের সেনা-সমর্থিত সরকার। তিনি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রধান হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগে রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগের নীতিকে এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নির্মূলকরণ নীতি বলে অভিহিত করে এর তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা করেছে। মিয়ানমারের সেনা-সমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকার দীর্ঘকাল এইসব সমালোচনা ও নিন্দা উপেক্ষা করে বলে এসেছে যে এসব তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু যখন একটি দেশের ১০ লাখের ওপর নাগরিক প্রাণভয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয় তখন তার অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকে না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল নীতি আন্তর্জাতিক সব মহলে ও সংস্থার গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এর সংস্থা ইতোমধ্যে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দিয়ে ব্যবস্থা ও গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও মিয়ানমার সামরিক গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ব্যবস্থা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার আদালত থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবতার অধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটনের জন্য মামলা দায়েরের প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই সব আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখে মিয়ানমার সরকার বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু তাদের এই আগ্রহের সঙ্গে সরেজমিনে গৃহীত পদক্ষেপের কতটুকু মিল রয়েছে। তা এখনো বিষদভাবে জানা যায়নি। কেননা রাখাইনের প্রদেশে বাইরের কেউ এখনো প্রবেশ করতে পারে না। রাখাইনদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের ক্রেকডাউনের পর সে অঞ্চলের সঙ্গে বাইরের টেলিযোগাযোগ এবং যাতায়াত ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়নি। ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পূর্ব-ইউরোপে যে আয়রন কার্ডেন বা লৌহ যবনিকা ছিল তার মতো রাখাইন প্রদেশেও বহিরাগতদের জন্য দুর্ভেদ্য, দুর্গম এলাকা হয়ে গিয়েছে যার পরিবর্তন হয়নি আজ পর্যন্ত।

সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছিল। তাদের এই প্রস্তুত কোন ধরনের, সে সম্বন্ধে বিশদ কিছু তথ্য তারা দেয়নি। তবে সম্প্রতি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যেসব ছবি পাওয়া গিয়াছে তা থেকে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা যেসব গ্রামে বাস করত সেগুলো গুঁড়িয়ে মাটির সঙ্গে সমান করে দেওয়া হয়েছে। এ থেকে মনে হয় তাদেরকে নিজ গ্রামে না নিয়ে ক্যাম্পে রাখা হবে। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বলা হলেও এই সব ক্যাম্পে যে স্থায়ী হয়ে যাবে সে আশঙ্কা রয়েছে রোহিঙ্গাদের। ২০০৫ সালে জাতিগত দাঙ্গার পর মিয়ানমারে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বছরের পর বছর ক্যাম্পে বন্দির মতো বাস করছে। সেখানকার জীবন নািস জার্মানির কনসেন ক্যাম্পের চেয়ে কম নয়। তফাত শুধু এই যে, সে ক্যাম্প হত্যার জন্য গ্যাস চেম্বার নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহের অভাবে ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের তিলে তিলে মৃত্যুর ব্যবস্থা বেশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করেছে। শরণার্থী হয়ে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা মিয়ানমার সরকার পরিচালিত মৃত্যু শিবির এই ক্যাম্প সম্পর্কে অবহিত। জেনেশুনে তারা ঐ ধরনের ক্যাম্পে যাবে না, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তারা নিজ গ্রামে প্রত্যার্বতন করে পুরোনো জীবনের হাল আবার ধরতে চায়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের সিটিজেনশিপ বা নাগরিকত্বের প্রশ্ন। তারা পুরোনো নাগরিক হয়ে অন্যান্য নাগরিকের মতো অধিকার ভোগে নিরাপত্তা পেতে চায়। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার দ্ব্যর্থহীনভাবে এই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রী পর্যায়ে তাদের যে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসেছিল তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিদেশি বসবাসকারী হিসাবে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। এই অমর্যাদাকর এবং অনিশ্চিয়তাপূর্ণ পরিচিতি নিয়ে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন করবে বলে মনে হয় না। এটা জেনেও মিয়ানমার সরকার নাগরিত্ব সম্পর্কে এ কথা বলেছে তার অর্থ কি, এই যে তারা প্রকৃত পক্ষে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে খুব আগ্রহী নয়। রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বহিরাগত। এই যুক্তিতেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ, মিলিশিয়া এবং উগ্র বৌদ্ধ নেতারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে হত্যা করেছে এবং তাদেরকে নিজ বাসস্থান থেকে বিতাড়িত করেছে। পূর্ণ নাগরিকের অধিকার না পেয়ে প্রত্যাবর্তন করলে তারা শুধু নিকৃষ্ট শ্রেণির অধিবাসী হয়ে থাকবে না, ভবিষ্যতেও নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হবে। এই আশঙ্কা রোহিঙ্গাদের দূর করা না হলে তারা আগ্রহ নিয়ে দেশে ফিরে যাবে না। এ কথা বলা যায়।

গত বছর নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গাদেরও প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারকে দ্বিপাক্ষিক সম্মতির ভিত্তিতে একটা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। সে সময় কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চায়নি। এই কারণে যে, তাদের নাগরিকত্ব বিষয়টা নিষ্পত্তি করা হয়নি বলে। ২০১৮ সালের জুন মাসে মিয়ানমার সরকার জাতিসংঘের ইউএসডিপি এবং শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হয়। যার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরেজমিনে দেখার এবং পুনর্বাসনের অনুকূল কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা এখনো উপসংহারে আসতে পারেনি যে, রাখাইনে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে এবং সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ব্যবস্থার জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবারকে ইন্টারভিউ করে জেনে নেওয়া হবে তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক কি না। এখানে যে সমঝোতা হয়েছে তাহলো এই যে, জোর করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরত পাঠানো হবে না।

গত বছরের নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারের কাছে ৫০ হাজার শরণার্থীর নাম পাঠালেও তারা বর্তমানে মাত্র ৩ হাজার ৭৫০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছিল। এভাবে মিয়ানমার যদি বাংলাদেশের দেয়া শরণার্থীর তালিকা কাটছাঁট করে নিজেদের পছন্দমতো ক্ষুদ্র সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় তাহলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুধু বিলম্বিত হবে না, তাদের সবার ফিরে যাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়াবে। সে যা-ই হোক, যেসব শরণার্থীকে ফেরত দেওয়া হবে তাদের তালিকা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক প্রতিনিধিকে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী তারা শরণার্থীদের মত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সংস্থা প্রতিনিধি জানিয়েছেন যে, স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে ইচ্ছুক এমন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনে তারা সমর্থন জানাবে। এই পর্যন্ত কোনো শরণার্থী পরিবার স্বেচ্ছায় যেতে রাজি বলে মত প্রকাশ করেনি। তাদের নাগরিকত্ব প্রদানের মাধ্যমে নিজ গ্রামে পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না দিলে তারা যে ফিরে যেতে উত্সাহী হবে না তা তাদের কথায় প্রমাণ পাওয়া যায়।

শুধু নাগরিকত্ব আর নিজ গ্রামে ফেরত যাওয়ার নিশ্চয়তা নয়, প্রত্যাবর্তনের পর তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও রোহিঙ্গারা নিশ্চিত হতে চায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একসময় রাখাইন অঞ্চলে সেফটি জোন বা নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেখানে নিরাপত্তা বিধানের জন্য অন্তত কিছুকাল জাতিসংঘের শান্তিবাহিনী থাকা প্রয়োজন। নিরাপত্তা বিধানের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সংস্থা, মিডিয়া এবং সাহায্যকারী এনজিও সংস্থার প্রতিনিধিদের রাখাইনে অবাধে যাতায়াত নিশ্চিতকরণ নিরাপত্তা বিধানের অংশ হিসেবে দেখাতে হবে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব, নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তনসহ নিরাপত্তা বিধানের বিষয়ে নীরব। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ রাখাইনে প্রত্যাবর্তনে খুব আগ্রহ না দেখালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।