সর্বময় ক্ষমতা থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীও। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক বা সিইও অপসারণের কোনো ক্ষমতা নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকার যেকোনো ব্যাংক অধিগ্রহণ করতে পারে। আইএমএফ এ ক্ষমতাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছে। শুধু এই দুই সুপারিশই নয়, আইএমএফ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককেই সর্বময় ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে ওই সুপারিশে। পাশাপাশি ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থাটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় একটি ‘ফিন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের ফিন্যানশিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ (এফসিসিআর) মিশন গতকাল বাংলাদেশে তাদের ১২ দিনের সফর শুরু করেছে। সফরকালে প্রতিনিধিদলটি অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসবে। আর এ সফর শুরুর আগেই সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক খাত নিয়ে একগুচ্ছ সুপারিশ পাঠিয়েছে তারা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র এবং নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইএমএফ অনেক সুপারিশই করে। সরকার সেগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে। তবে এর বাস্তবায়ন করা বা না করা একান্তই সরকারের ব্যাপার।

সূত্র মতে, দেশের আর্থিক খাতের সার্বিক দিক নিয়ে আলোচনা এবং সর্বশেষ অবস্থা জানতেই এসেছে এফসিসিআর মিশনটি। সংস্থার পক্ষ থেকে গত মঙ্গলবার আর্থিক খাত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুপারিশ ও প্রশ্ন পাঠানো হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এবারের মিশনটির বিশেষ দৃষ্টি থাকবে সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার বিষয়টি। আইএমএফের সুপারিশে বলা হয়েছে, সরকারি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সর্বময় ক্ষমতা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৬ ধারা সংশোধন করতে হবে।

এ ধারা মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীকে অপসারণ করতে পারে। অপসারণের আদেশ জারির আগে অভিযুক্তকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে এ সুযোগ না দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে শুধু সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। ৪৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার কর্তৃক মনোনীত বা নিযুক্ত (কোন চেয়ারম্যান বা পরিচালক), যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, এর ক্ষেত্রে এই ধারার কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না।’ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু একটি প্রতিবেদন পাঠাতে পারবে সরকারের কাছে। সরকার সেটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে।

আইএমএফ মনে করছে, সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকের সংখ্যা অনেক। বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংকে এ সংখ্যা ২০। এ সংখ্যা কমিয়ে আনার কথা বলেছে সংস্থাটি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বর্তমানে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা ৩। এ সংখ্যা আরো বাড়াতে পরামর্শ দিয়েছে মুদ্রা তহবিল সংস্থার মিশন। এ ছাড়া অডিট কমিটি ও ঝুঁকি নিরূপণ কমিটির সদস্যরা যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সুপারিশে বলা হয়েছে।

আইএমএফ ব্যাংক কম্পানি আইনের ৫৮ ধারা সংশোধনের সুপারিশ করেছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের  রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার যদি সন্তুষ্ট হয় যে ব্যাংকনীতি সম্পর্কিত লিখিত নির্দেশনা পালন করতে কোনো ব্যাংক একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছে, অথবা আমানতকারীদের ক্ষতি হতে পারে এমন পদ্ধতিতে কোনো ব্যাংক কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে তাহলে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তা ‘অধিগ্রহণ’ করতে পারবে। এ ছাড়া ৫৯ ধারায় সরকারের স্কিম প্রণয়নের ক্ষমতা, ৭৭ ধারায় ব্যাংক কম্পানির ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধ ও অবসায়নে সরকারের ক্ষমতারও পরিবর্তন চায় আইএমএফ।

দেশের অর্থনীতির সার্বিক বিষয় দেখভালের জন্য একটি ‘ফিন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। আইএমএফের মতে, ব্যাংক কমিশনের পাশাপাশি ‘ফিন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল’ গঠন করলে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি, চড়াই-উতরাই এবং নানা সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যাবে এবং তা সমাধানে কাজ করা যাবে। এ ছাড়া নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নে সরকারের ক্ষমতা, সরকারের বেতন কাঠামো থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেতন কাঠামো পৃথককরণ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বিভিন্ন অনুশাসন বা আদেশের ক্ষমতা সংশোধনসহ একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে আইএমএফ। আইএমএফ প্রতিনিধিদলটি তাদের সফর শুরুর প্রথম দিনেই গতকাল ‘ফিন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল’ গঠন বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে।

আইএমএফের এসব সুপারিশের ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আইএমএফের সুপারিশগুলো ঠিক আছে। তবে শুধু আইন সংশোধন করলেই হবে না, বাস্তবায়ন করতে হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আছে। সেগুলোর বেশির ভাগই খেলাপি ঋণে জর্জরিত। এগুলো ভালো নেই। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্ব বাড়ালেই যে সরকারি ব্যাংকের সব পরিবর্তন হয়ে যাবে এমন ভাবার কারণ নেই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানো উচিত। আর আইএমএফ যে কাউন্সিল গঠনের কথা বলেছে তাতে কিছু হবে বলে আমার মনে হয় না।’